আমাকে দেখেই ও সরাসরি ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার পায়ে। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। চিৎকার করে বলতে লাগল, হাই বাবু, গড় করি, মোকে ছেঁড়া দে! ই কাজ আর হবেক লাই! আর হবেক লাই! বিশ্বাস কর, এ মোর দোষ লয়! কু-দেবতা আছে বটে!.. কিন্তু আমি ওকে আর ক্ষমা করতে পারি না। বিশেষ করে হাতেনাতে ধরা পড়ার পরে। তা ছাড়া ওর কু-দেবতার কথা আমার বিশ্বাস হয় না। নির্ঘাত নিজেকে বাঁচানোর জন্যেই ছেলেটা ওই কু-দেবতার ধুয়ো ধরেছে। সুতরাং যা করণীয় তাই করলাম…।
বিশ্বনাথবাবু থামিলেন। লক্ষ করিলাম, ইত্যবসরে মাধবীর জনপ্রিয়তা যথেষ্টই ক্ষুণ্ণ হইয়াছে। তাহার গুণমুগ্ধ সকলেই, বয়সের সীমারেখা নির্বিচারে, বিশ্বনাথবাবু, অথবা তাঁহার কাহিনির প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছে। ইহাতে নববধূ মাধবীকেও বিশেষ বিচলিত বলিয়া বোধ হইল না, কারণ সেও বর্তমানে একই কাহিনি-স্রোতে অতি-মনোযোগে সন্তরণশীল।
আমি বিশ্বনাথবাবুকে লক্ষ্য করিয়া কহিলাম, ছেলেটাকে কী করলেন? পুলিশে দিলেন?
না, পুলিশে নয়–দিলাম ওদের সর্দারের হাতে। বিশ্বনাথবাবু উত্তর দিলেন, জঙ্গলে যেসব আদিবাসীরা গাছ কাটে, ওদের টাকাপয়সা কাজিয়া সব কিছুর সমাধান করে দেয় ওদের সর্দার বিজয় কাহার। বিজয় কাহারের বয়েস পঞ্চান্ন-ষাট হবে। মাথায় যেকটা চুল আছে সবই সাদা। পেটানেনা সমর্থ চেহারা বয়েস অনুমানে ভুল করিয়ে দিতে চায়। ঝুমনাকে নিয়ে আমি তার হাতেই তুলে দিলাম। একে-একে বললাম, হার, বোতাম ও ঘড়ি চুরির চেষ্টার কথা। বিজয় আমাকে তাঁবুতে ফিরে যেতে বলল। বলল, ছেলেটার ঘাড় থেকে ও ভূত নামিয়ে ছাড়বে। আমি তাবুতে ফিরে এলাম। মনে-মনে ঝুমনার জন্যে একটু যে কষ্ট হল না, তা নয়। কে জানে, ওরা বেচারা ছেলেটাকে কী শাস্তি দেবে!
তাঁবুতে ফিরে এসে বালিশের তলা থেকে ঘড়িটা বের করলাম। আমার অনেক সাধের ঘড়ি। ম্যাট্রিক পাশ করার পর বাবা কিনে দিয়েছিলেন। রোল্ডগোল্ডের কেস, সঙ্গে সুদৃশ্য বাদামি চামড়ার ব্যান্ড। সুইজারল্যান্ডে তৈরি বিদেশি ঘড়ি। পনেরো মিনিট অন্তর অন্তর ইচ্ছে করলে ওটাতে অ্যালার্ম বাজানোর ব্যবস্থা করা যায়। এমনি দামের চেয়েও স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ওটার দাম আমার কাছে অনেক বেশি। কারণ, ঘড়িটা আমাকে উপহার দেওয়ার মাস তিনেক পরেই থ্রম্বসিসে বাবা মারা যান। ঘড়ি নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে করতেই বাতাস কেটে আছড়ে পড়া চাবুকের প্রথম সপাং শব্দটা আমার কানে এল।
ঝুমনার শাস্তি শুরু হয়েছে। পরপর শোনা যাচ্ছে চাবুকের শব্দ ও পরক্ষণেই ঝুমনার কিশোর কণ্ঠের তীক্ষ্ণ চিৎকার। সে-চিৎকার অমানুষিক। শত হলেও বিজয় সর্দারের এই শাস্তি বরদাস্ত করা যায় না। ঘড়িটা হাতে পরে নিয়ে বেরিয়ে এলাম তাঁবুর বাইরে। শব্দ ও চিৎকার লক্ষ করে তাড়াতাড়ি এগিয়ে চললাম। পায়ের তলায় শুকনো শালপাতার পাঁজর ভাঙার শব্দ আমাকে এতটুকু অমনোযোগী করতে পারল না। অসংখ্য শালগাছের গোলকধাঁধা পার হয়ে অবশেষে ঘটনাস্থলে পৌঁছোলাম।
সম্প্রতি গাছ কাটার ফলে পরিষ্কার হয়েছে এমন একটা জায়গায় সব আদিবাসীরা জটলা করে দাঁড়িয়ে। ওরা পরস্পরের সঙ্গে নিজেদের ভাষায় চাপা গলায় কীসব বলাবলি করছে। একজন আদিবাসী একটা শালগাছের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তার হাতে লম্বা সরু একটা কাঁচা বাঁশের কঞ্চি। এটাকেই আমি চাবুক ভেবেছিলাম। আর সেই শালগাছের গোড়ায় গাছের গুঁড়িকে বেড় দিয়ে ঝুমনার দু-হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা। কাছেই দাঁড়িয়ে বিজয় কাহার। সে চিৎকার করে এক-একটা সংখ্যা গুনছে আর সপাং করে কঞ্চির বাড়ি গিয়ে পড়ছে ছেলেটার হাতে–যে-হাত দিয়ে ও চুরি করেছে। ঝুমনার হাত কেটে রক্ত পড়তে শুরু করেছে। মনে হল, হাত দুটো যেন বেশ ফুলেও উঠেছে।
আমি চিৎকার করে বিজয়কে থামতে বললাম। ও চমকে ফিরে তাকাল আমার দিকে। যে আদিবাসীটি বিজয়ের নির্দেশে কঞ্চির আঘাত করছিল, সে-ও থেমে গেল। একবার আমার দিকে একবার বিজয়ের দিকে দেখতে লাগল । অর্থাৎ, সে এখন কী করবে? কার কথা শুনবে? পরক্ষণেই বিজয় ইশারায় তাকে থামতে বলল। তারপর আমাকে লক্ষ্য করে যা বলল তার সরল বাংলা করলে দাঁড়ায় ও বাবু, একে আমি একশো বেত মারার শাস্তি দিয়েছিলাম, সবে আঠেরোটা হয়েছে– তাও আস্তে-আস্তে মেরেছে। আর আপনিই এখন শাস্তি দিতে বারণ করছেন? তা হলে ছেলেটার চুরির ব্যারাম সারাব কী করে?…তবুও আমার অনুরোধে বিজয় সর্দার গজগজ করতে করতে ঝুমনাকে ছেড়ে দিল। ওর হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হল। রক্তাক্ত হাত নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে কোথায় যেন চলে গেল ছেলেটা।
এখানেই এ-কাহিনির শেষ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু হল না। কারণ সেইদিনই সন্ধ্যায় সারাদিনের কাজ শেষ করে হিসেবপত্রের পাট চুকিয়ে ক্যাম্পখাটে শরীর এলিয়ে একটা গল্পের বইয়ের পাতায় চোখ বুলোচ্ছি, তাঁবুর দরজায় একটা খসখস শব্দ পেয়ে চমকে তাকালাম। কষ্ট হলেও হ্যারিকেনের আলোয় ঠাহর করতে অসুবিধে হল না। ঝুমনা। সকালের ঘটনার পর এই ওকে প্রথম দেখলাম। ও দ্বিধাভরা কণ্ঠে জানতে চাইল, ও ভিতরে আসতে পারে কি না। তারপর অনুমতি পেয়েই ভিতরে এসে সটান আমার পা জড়িয়ে ধরল। কৃতজ্ঞতা জানাল সকালে শাস্তির হাত থেকে ওকে বাঁচিয়েছি বলে। আমার পায়ের কাছে মেঝেতে বসে ও যা বলল, তাতে বুঝলাম, এর মধ্যেই ওর হাত দুটো ভীষণ ছটফটে অস্থির হয়ে উঠেছে। তার ওপর যদি হাত দুটোকে মারধোর করা হয়, কাটা-ছেঁড়া করা হয়, তা হলে মরিয়া হয়ে ওরা যে কী করবে বলা মুশকিল।…ওর দু-গাল বেয়ে অঝোরে নেমে এল অশ্রুর ধারা।
