আমি তাহার কথার প্রতিবাদে সৌজন্যমূলক কিছু একটা বলিতে মুখ খুলিতেই বিশ্বনাথবাবু বাধা দিলেন, বিব্রত হওয়ার কিছু নেই, সমীরবাবু। যা সত্যি, তাই বলছি। একটু আগেই চাঁদু বলছিল, আমি নাকি এক মহাপুরুষ– বিশ্বনাথবাবু হাসিলেন, পুনরায় কহিতে লাগিলেন, তা মহাপুরুষ আমি না হতে পারি, কিন্তু ভারতবর্ষের আনাচেকানাচে ঘুরে বহু মহাপুরুষের সাক্ষাৎ আমি পেয়েছি।
বর্তমানে আমি লোহার ব্যাবসা করলেও বছর কয়েক আগে পর্যন্ত কাঠ নিয়েই ছিল আমার কারবার। তখন আমি চাকরি করতাম–আধা-সরকারি চাকরি বলতে পারেন। সরকারের ইজারা নেওয়া বিভিন্ন জঙ্গলে যখন গাছ কাটা হত, তখন আমি তদারকিতে থাকতাম। আর এই কাজেই আমাকে দেশের আনাচেকানাচে গিয়ে ডেরা বাঁধতে হয়েছে।
বছর তিনেক আগে ঝাড়গ্রামে আমাকে যেতে হয় অফিসের কাজে। সেখানে তখন শালগাছ কাটার মরশুম চলছে। ফলে অফিসের কাজ শেষ হতেই আমার কাঁধে তুলে দেওয়া হল পুরোনো দায়িত্ব। অর্থাৎ, জঙ্গলে গিয়ে গাছ কাটার সময় তদারকির কাজ করতে হবে। কর্তার ইচ্ছা, অতএব কর্ম না করে উপায় নেই। উপস্থিত হলাম গিয়ে জঙ্গলের তাঁবুতে। যে-অফিসারটি সরেজমিনে ছিলেন, আমাকে দেখেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। সব দায়-দায়িত্ব আমার কাঁধে তুলে দিয়ে সোজা রওনা হলেন দেশে। কালই নাকি চিঠি এসেছে, তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী হাসপাতালে ভরতি হয়েছেন। ফলে আমি পড়লাম ফ্যাসাদে। তখনও বুঝিনি, কী ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আমার জন্যে অপেক্ষা করে রয়েছে।
তাঁবুতে ক্যাম্বিসের খাট, বিছানা, ছোট টেবিল, হ্যারিকেন, পথ-ভুলে-চলে-আসা শেয়াল বা হায়েনার জন্যে শক্তপোক্ত লাঠি–সবকিছুরই ব্যবস্থা রয়েছে দেখলাম। আমি বাউণ্ডুলে ব্যাচিলার মানুষ–কোনও অবস্থাকেই আর ভয় পাই না। সুতরাং তাঁবু আমার কাছে রাজবাড়ি বলে মনে হল। দেখলাম, ঝাড়গ্রামের প্রচণ্ড মশাকে প্রতিরোধ করার জন্যে একটা মশারির ব্যবস্থাও রয়েছে। আর কী চাই!
বিশ্বনাথবাবু এক মুহূর্ত থামিলেন। ঘড়ি দেখিলাম, রাত দেড়টা। চন্দ্রমোহন তাঁহার নিকট অনুমতি লইয়া একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করিল। দেখাদেখি অবিনাশও তাহার অনুসরণ করিল। বিশ্বনাথবাবু ধূমপানের প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখান করিয়া পুনরায় বলিতে শুরু করিলেন, যে-ছেলেটা তাঁবুতে আমার ফাইফরমাশ খাটত, সে ছিল স্থানীয় আদিবাসী। নাম ঝুমনা। বয়েস বছর ষোলো। কালো তেলতেলে রোগা চেহারা। কর্মঠ এবং চটপটে। জঙ্গলে যারা গাছ কাটে তারাও ওই আদিবাসী দলেরই, এবং তাদেরই একজনের–পরে জেনেছি, তার নাম রমেশকীরকম যেন আত্মীয় হয় ছেলেটা। সুতরাং ঝুমনা আমার কাছে যেন দেবদূত হয়ে দেখা দিল। ওপরওয়ালার অযাচিত আশীর্বাদ।
এহেন কর্মে সুপটু ছেলেটার একটা খারাপ অভ্যেস ক্রমে ক্রমে ধরা পড়তে শুরু করল। আমার গলায় একটা বিছেহার সব সময় পরা থাকত–শুধু রাতে ওটা আমি খুলে রাখতাম গলায় ফুটত বলে। একদিন সকালে বিছানা ছেড়ে রোজকার অভ্যেসমতো হাত বাড়িয়েছি পাশের ছোট টেবিলটার দিকে–এবং বিছেহারটা না পেয়ে চমকে উঠেছি। চমকে ওঠার দুটো কারণ আছে : এক, হারটা সোনার। দুই, ঝাড়গ্রামের মতো এই সঙ্গীবর্জিত নির্জন গ্রামে এসে কলকাতার মতো শহুরে চোরের উৎপাত পাব, আশা করিনি। অবাক হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়টা কেটে যেতেই মনে স্বাভাবিক প্রশ্নটা জেগেছে : কে চুরি করল হারটা? ঝুমনা? বিশ্বাস হতে চায় না, কিন্তু পরিস্থিতি নিরুপায়। সুতরাং ওকে ডেকে সরাসরি হারটার কথা জিগ্যেস করলাম, এবং ও যথারীতি উচ্চস্বরে জটিল ভাষায় জানাল, হারটার কথা ও কিছুই জানে না। আমাকে তখন চুপ করে যেতে হল। কারণ, কোনও প্রমাণ আমার হাতে নেই।
সেইদিনই গাছ ফেলার সময় রমেশের কানে আমি কথাটা তুললাম। ও কিন্তু আমার প্রত্যাশা অনুযায়ী বিস্মিত হল না, বরং বিড়বিড় করে বলল, ও কি চুরি করছ্যা? কু-দেবতা ভর করছ্যা বটে!… এরপর ব্যাপারটা চাপা পড়ে গেল।
দ্বিতীয় চুরিটা হল দিন চারেক পরেই। এবারের শিকার পাঞ্জাবির সোনার গিলটি করা বোতাম। ঘটনা ও পরিণতি প্রথমবারের পুনরাবৃত্তি–এতটুকু তফাত নেই। কিন্তু এরপর থেকে আমি সতর্ক হলাম। ছেলেটাকে যথাসম্ভব চোখে-চোখে রাখতে শুরু করলাম। রসুল নামে যে আরদালিটি কাগজপত্র নিয়ে প্রতিদিন জঙ্গল-আপিস করত, সে একদিন আমাকে জানাল যে, আগের যে-বাবু ছিলেন, তারও নাকি একটা আংটি চুরি গিয়েছিল–কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। রসুল আরও বলল, বাবু, জেনে রাখবেন, এ ওই ঝুমনা ছোকরারই কাজ।…দ্বিধাগ্রস্তভাবে আমাকে মনে-মনে রসুলের কথায় সায় দিতে হল। এমনিতে এই আদিবাসী লোকগুলো খুব সৎ, সাদামাঠা আর সরল। শিক্ষাদীক্ষা ও সভ্যতার বিষ এখনও ওদের ছোবল দিতে পারেনি। কিন্তু তারই মাঝে আশ্চর্য ব্যতিক্রম এই কিশোর।
তৃতীয় চুরির সময় ঝুমনা হাতেনাতে ধরা পড়ল। আমিই ধরলাম। সকালে উঠে হাত-মুখ ধুতে তাঁবুর বাইরে বেরিয়েছিলাম। ফিরে গিয়ে দেখি আচমকা আমার সামনাসামনি পড়ে গিয়ে ঝুমনা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে। যেন এক পাথরের মূর্তি। ওর একটা হাত তখনও আমার বালিশের তলায় ঢোকানো। অর্থাৎ, কীভাবে ও জানতে পেরেছে আমার হাতঘড়িটা বালিশের তলায় রেখেই আমি শুয়ে থাকি, এবং সেটা সরানোর সুযোগ পেয়ে বিন্দুমাত্রও দেরি করেনি।
