পুরোনো ঘটনা বিপুলের মনের পরদায় ছায়া ফেলে যায়। ও এখন বেশ বুঝতে পারছে, কীভাবে শুরু থেকেই ও মারাত্মক সব ভুল করে চলেছে। অবশ্য সে-ভুল শোধরানোর সময় এখনও আছে। তিরিশহাজার টাকা এখনও অপেক্ষা করছে ওই কুয়োর গর্তে—ওরই জন্য। ওই টাকার খোঁজ বিপুল ছাড়া আর কেউ জানে না।
ইরার সঙ্গে বিপুল শর্মার পরিচয় একটু অদ্ভুতভাবেই। ভি.আই.পি রোডে একটা অ্যাক্সিডেন্টে পড়েছিল বিপুল। তেমন বিপজ্জনক কিছু নয়—ছোটখাটো দুর্ঘটনা। তখন সেখানে হাজির দর্শকদের গায়ে-পড়া উপদেশ হজম করে ও চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু তখন ইরা ওকে পিছু ডেকেছে। ওর পরনের সাদা শাড়ি জানিয়ে দিচ্ছিল ইরা বিধবা। কিন্তু তারপরই ইরা যে-প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে বিপুল অবাক না হয়ে পারেনি। ও ওকে প্রথমে ওর বাড়িতে যাওয়ার জন্য—পরে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকার প্রস্তাব দিয়েছে।
কথাবার্তায় বিপুল আগেই জানিয়েছিল কলকাতায় ও নতুন। সেইজন্যই ওই পেয়িং গেস্ট হওয়ার প্রস্তাব। কেন জানি না, রাজি হয়ে গেছে বিপুল। তারপর যতই দিন গেছে ততই ও ইরার মতলব টের পেয়েছে।
ক্রমে-ক্রমে একদিন মতলবটা খুলেই বলল ইরা। সব শোনার পর বিপুলের মনে আর কোনও সন্দেহ থাকেনি। ইরা যে একজন সহকর্মীর আশাতেই সেদিন ওইরকম উপযাচক হয়ে ওকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, সেটা বুঝতে আর বাকি থাকেনি।
ইরার কথা অনুযায়ী জনৈক হোঁদলকুতকুত ব্যবসায়ী প্রতি শনিবার ভোর ছ’টায় এই ভি.আই. পি রোড ধরে অ্যামবাসাডার হাঁকিয়ে যায়। সঙ্গে থাকে প্রায় পঁচিশ-তিরিশ হাজার টাকা। তার কোম্পানির লেবারদের সাপ্তাহিক মাইনে। এই টাকাটা বরাবর সে নিজেই নিয়ে যায় ফ্যাক্টরিতে। ব্যবসায়ীর নাম দুলিচাঁদ আগরওয়ালা। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি কোথায় যেন তার লোহালক্কড়ের কারখানা আছে।
সব শুনে কাজটা তেমন কঠিন মনে হয়নি বিপুলের। এই কাজের সাফল্যের পক্ষে কতকগুলো জোরদার পয়েন্ট রয়েছে। প্রথমত দুলিচাঁদের বয়েস প্রায় ষাট। অর্থাৎ, কোনও আক্রমরকারীকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। আর দ্বিতীয়ত, সে অ্যামবাসাডারে একাই যাতায়াত করে—অর্থাৎ, নিজেই গাড়ি চালায়। আর সর্বশেষ পয়েন্ট, ভোর ছ’টা নাগাদ ভি.আই.পি রোড একেবারে নির্জন থাকে—তার ওপর সময়টা শীতকাল।
পরিকল্পনার সঙ্গে-সঙ্গে একটা পুরোনো বন্দুক বের করে বিপুলের হাতে দিয়েছিল ইরা। বিপুল অবাক হয়ে গিয়েছিল। তারপর সামান্য খোঁজখবর করে জেনেছিল ইরার ইতিহাস। ওর স্বামী ছিল এক দাগি আসামি। বছরখানেক আগে সে এনকাউন্টারে মারা গেছে। হয়তো স্বামীর কাছ থেকেই অস্ত্রটা একসময় ইরার হাতে এসেছে।
কিন্তু সব জেনেও বিপুলের কিছু করার ছিল না। কারণ, তখন ইরার সঙ্গে ও মনে-মনে জড়িয়ে গেছে।
কাজের প্ল্যানটা ভাবতে শুরু করেছিল বিপুল। ইরার মত অনুযায়ী এ-কাজে পরিশ্রম খুব সামান্যই। দূর থেকে যখনই সেই অ্যামবাসাডারটাকে বিপুল আসতে দেখবে তখনই ও বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে রাস্তার মাঝখানে মড়ার মতো শুয়ে পড়বে। বুড়ো আগরওয়ালা গাড়ি থামাবেই। এবং যেই সে গাড়ি থেকে নেমে বিপুলের কাছে এগিয়ে আসবে তখনই বিপুল বন্দুকটা তার কোমরে চেপে ধরবে। তার পরের কাজ অতি সামান্যই…।
টাকার ব্যাগটা নেওয়া হয়ে গেলে বিপুল সোজা গিয়ে উঠবে ইরার ঝরঝরে অস্টিনটায় (যেটা শতখানেক গজ দূরে আগে থেকে পার্ক করা থাকবে)। সোজা গাড়ি ছোটাবে হাওড়া স্টেশেন লক্ষ্য করে। ইরাও সময়মতো সেখানে গিয়ে বড় ঘড়ির তলায় অপেক্ষা করবে। বিপুল পৌঁছলেই ওরা দুজনে ট্রেনে চেপে চম্পট দেবে।
কিন্তু আসল কাজের সময় হিসেবের বাইরে একটা ব্যাপার ঘটে যাওয়ায় বিপুলের সমস্ত প্ল্যান বানচাল হয়ে গেল। ওরা জানত না, বুড়ো আগরওয়ালা নিরাপত্তার খাতিরে নিজের সঙ্গে রিভলভার রাখত। সুতরাং সেই বিশেষ মুহূর্তে বিপুল ও দুলিচাঁদ, দুজনেই রিভলভার ব্যবহার করল। ফল দাঁড়াল, দুলিচাঁদ প্রায়-নিহত এবং বিপুল আহত। তাই টাকা নিয়ে বিপুল আর হাওড়া যেতে পারেনি। সোজা ফিরে গেছে ইরার ডেরায়। ইরা ফেরার আগেই টাকাটা সে পরিত্যক্ত কুয়োর ভেতরে লুকিয়ে ফেলেছে।
ও ভেবেছিল, দুলিচাঁদ বোধহয় মরেই গেছে। তাই আঘাতটা পেল অনেক দেরিতে। ইরা আহত বিপুলের সেবায় মগ্ন। হঠাৎই রেডিওতে শোনা গেল বিশেষ ঘোষণা।
হ্যাঁ, দুলিচাঁদ মারা গেছে ঠিকই, তবে বিপুলের চেহারার একটা বিবরণ না দিয়ে নয়। সে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বেঁটে এবং মোটা লোক। এক কোটি লোকের মধ্যেও সে জলহস্তীর মতো চোখে পড়বে। কারণ, তার চেহারা ঠিক একটা নাদুসনুদুস, গোল বেলুনের মতো। এককথায় জীবন্ত ফুটবল!
বিবরণ শুনে ভীষণ ভয় পেয়েছে বিপুল। কারণ ও জানে, ওর ফুটবলমার্কা চেহারায় যে-কেউই ওকে একপলকে চিনে ফেলবে। তাই ও ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তখন লবণ হ্রদ ছেড়ে শহরতলির কোথাও সরে পড়তে ইরাই পরামর্শ দিয়েছে।
শেষে ওরা ঠিক করেছে, না, শহরতলি নয়, একেবারে দেশান্তরী হবে বিপুল। তারপর দিনের-পর-দিন উপোস করে নিজেকে রোগা করবে। যাতে লোকে ওকে আর চিনতেই না পারে। তাই ইরাকে নিয়ে বর্ধমান চলে গিয়েছিল ও। দীর্ঘ চারমাস ও প্রায় অনশন করে কাটিয়েছে। বাড়ির কোটর ছেড়ে দিনের আলোয় একটিবারের জন্যও বেরোয়নি। অবশেষে যখন ওর দেখা মিলেছে, তখন ওকে চেনে কার সাধ্যি? কে বলবে, এ ফুটবল বিপুল? তার বদলে হাড়জিরজিরে হাড়ের ওপর চামড়া জড়ানো চেহারা। যেন কবর থেকে সদ্য কোনও কঙ্কালকে তুলে আনা হয়েছে।
