মল্লিকা প্রাণপণে বাধা দিল। হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ‘কী ছেলেমানুষি করছেন! আপনি বুঝতে পারছেন না, আমরা দুজনে কেউই আর ঠিকমতো বেঁচে নেই। আপনি আমাকে খুন করতে চান করুন, কিন্তু তাতে কোনও লাভ নেই। একটা মড়া আর একটা মড়াকে খুন করলে কার কী আসে যায়—’ ধস্তাধস্তি করতে-করতেই হাসি পেয়ে গেল মল্লিকার। ও হেসে উঠল শব্দ করে।
মোহনদাস কেমন যেন হতভম্ব হয়ে ছেড়ে দিল মল্লিকাকে। লোকটার ফরসা মুখ নীলচে দেখাচ্ছে। আচ্ছা, প্রথম সুযোগেই কি এইচ. আই. ভি. বাসা বাঁধে শরীরে? মল্লিকার মুখের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজল মোহনদাস। ওর শরীরের সব শক্তি কে যেন শুষে নিয়েছে। ও সম্মোহিতের মতো প্রাইভেট অফিসের দরজা খুলে দিল। ভয়ঙ্কর সুন্দরী মেয়েটা সহজ পা ফেলে বেরিয়ে গেল বাইরে। মোহনদাসকে রেখে গেল শূন্যে—হাওড়া ব্রিজ আর গঙ্গার মাঝখানে।
তুমুল বৃষ্টিতে ভিজতে-ভিজতে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল মল্লিকা। মায়ের কথা মনে পড়ল ওর। মনে পড়ল, মোহনদাসের হাতে হেনস্থা হওয়া চারটে মেয়ের কথা। ওদের কথা ভাবতে-ভাবতে মল্লিকা নিজের ভেসে থাকা জীবনের একটা মানে খুঁজছিল।
সমস্যা গুরুতর
নার্সের এগিয়ে দেওয়া পোশাকের গায়ে মনোযোগ দিয়ে আঙুল চালাল বিপুল শর্মা। বুঝল, পোশাকের কাপড়টা রেয়ন। অর্থাৎ, পোশাকটা ওর নিজের নয়।
নার্স, আপনার হয়তো ভুল হয়েছে।—বিরক্ত স্বরে বলল বিপুল, এ-ড্রেস আমার নয়।
ঠিকই ধরেছেন।—সুরেলা গলায় নার্স জবাব দিল, কারণ, আপনার জামাকাপড় ওই অ্যাকসিডেন্টে বিশ্রীভাবে ছিঁড়ে যাওয়ার জন্যে নতুন ড্রেস দিতে হয়েছে। আপাতত এগুলো পরেই আপনাকে কাজ চালাতে হবে।
ও।—বিপুল শর্মার স্বর কিছুটা শান্ত হল: কিন্তু আমার চোখের এই ব্যান্ডেজটা কবে খোলা হবে?
আজ। মেজর দত্ত এলেই। উনি এখুনি এসে পড়বেন।
যাক—বাঁচা গেল।—হাঁপ ছাড়ল বিপুল, বলল, তা হলে ড্রেসগুলো এখন থাক। চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হলে পর ওগুলো দেখেশুনে পরে ফেলব, কী বলেন?
সে আপনার খুশি।—নার্স হেসে বলল।
সুতরাং আবার বিছানায় হেলান দিয়ে শরীর এলিয়ে দিল বিপুল।
দুর্ঘটনার ব্যাপারটা ওর এখনও স্পষ্ট মনে আছে। আজ সকালে, একটু বেলার দিকে ইরাদের বাড়ির পিছনের খোলা মাঠ ধরে সে যাচ্ছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটা, কিন্তু অসহ্য গরম, আর একটু আগেই গলায় ঢেলে দেওয়া আট পেগ জিন, এই দুইয়ের ধকল বিপুল শর্মার শরীর সামলে উঠতে পারেনি। তা ছাড়া ওর স্বাস্থ্যের যা তিন অবস্থা!
মাঠ থেকে বহুদূরে, জঙ্গলের ঠিক শুরুতেই, ছিল একটা পুরোনো কুয়ো। বিপুল কুয়োর দিকেই যাচ্ছিল। বহুদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ায় কুয়োটা শুকিয়ে হেজে গেছে। সুতরাং নিরাপদ জায়গা ভেবে ওই কুয়োতেই ও সব টাকা লুকিয়ে রেখেছিল—আজ থেকে প্রায় মাসতিনেক আগে। একটা টিনের বাক্সে টাকাটা ভরে ও রেখে দিয়েছিল কুয়োর নীচে, শুকনো খটখটে আগাছায় ভরা জমিতে। এই গোপন জায়গাটার কথা ও ইরাকে পর্যন্ত বলেনি।
বিপুলের হাতে তখন ছিল একটা তারের হ্যাঙার। সেটাকেই টেনে লম্বা করে ও একটা হুকের মতো করেছিল। তারপর তার একপ্রান্তে দড়ি বেঁধে বাঁকানো মুখটা সরসর করে নামিয়ে দিয়েছিল কুয়োর ভেতরে। ঠিক যেমন করে লোকে ছিপ ফেলে বঁড়শিতে মাছ গাঁথে।
ওর উদ্দেশ্য ছিল দড়িটা ঠিকমতো দুলিয়ে কুয়োর নীচে পড়ে থাকা টিনের বাক্সের হাতলে হুকটাকে আটকানো। তারপর টেনে তুললেই হুকের সঙ্গে সহজেই উঠে আসত বাক্স—সেইসঙ্গে তিরিশহাজার টাকা।
কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। তার আগেই ঘটে গেছে এই হতচ্ছাড়া দুর্ঘটনা। তাই বিপুল শর্মা এখন নার্সিং হোমে।
কুয়োর পাড়ে পৌঁছনোর পরই বিপুলের মাথাটা হঠাৎ কেমন ঘুরে গেছে। বোধহয় আট পেগ জিনের পর এই প্রখর রোদে খোলা মাঠে পথ হাঁটাটা ওর দুর্বল শরীর সইতে পারেনি। জ্ঞান হারানোর আগে ওর আবছা-আবছা যেটুকু মনে আছে তা হল কুয়োর বাঁধানো পাড়ে ওর মাথাটা বিশ্রীভাবে ঠুকে গিয়েছিল। তারপর আর কিছু মনে নেই।
নার্সিং হোমের দরজার ওপরে টাঙানো সুদৃশ্য দেওয়াল-ঘড়িতে ঢং-ঢং করে পাঁচবার ঘণ্টা বাজল। পাঁচটা বাজে। অর্থাৎ, এরই মধ্যেও প্রায় ছ’ঘণ্টা সময় নষ্ট করে ফেলেছে। ইরাকে ও বলেছিল, বেলা বারোটা নাগাদ হাওড়া স্টেশনে বড় ঘড়িটার নীচে অপেক্ষা করতে। ও হয়তো এখনও অধৈর্যভাবে পায়চারি করছে। হয়তো ভাবছে বিপুল প্রেমিকাকে ফাঁকি দিয়ে সমস্ত টাকা একাই নিয়ে কেটে পড়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত ও ভেবে বসে বিপুল ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তা হলে ও নির্ঘাত পুলিশে খবর দেবে, ফোন করে বলে দেবে বিপুল কোথায় আছে—ব্যস।
না, এখান থেকে ওকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরোতে হবে। টাকাটা নিয়েই ও সোজা রওনা দেবে হাওড়া স্টেশনের দিকে। তারপর ইরাকে সঙ্গে নিয়ে…।
কিন্তু ততক্ষণ ইরার ধৈর্য করে থাকবে তো?
নার্সকে উদ্দেশ করে বিপুল বলল, আমি এই নার্সিং হোমে কী করে এলাম বলতে পারেন?
একজন পাখি শিকারি আপনাকে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দ্যাখে। সে-ই আপনাকে টেনেটুনে গাড়িতে তোলে। ওই করেই তো আপনার জামা-কাপড়গুলো সব ছিঁড়েছে! তারপর গাড়ি করে সে আপনাকে এই নার্সিং হোমে নিয়ে আসে।
ও, লবণ হ্রদে লোকে তা হলে এখনও পাখি শিকার করতে যায়? ভাবল বিপুল। শিকারি বাবাজীবনকে ধন্যবাদ দিতে হয়—একইসঙ্গে সে বিপুল শর্মা এবং তিরিশহাজার টাকাকে বাঁচিয়েছে বলে। আর ভাগ্যিস ওর পকেটে হাজারখানেক টাকা ছিল। ওটা থেকে নিশ্চয়ই নার্সিং হোমের খরচ মেটানো যাবে।
