সেই অবস্থাতেই কলকাতায় ফিরে এসেছে বিপুল শর্মা। ইরাও সঙ্গে এসেছে—তবে ওই স্টেশন পর্যন্তই। বিপুল ওকে বলেছে হাওড়া স্টেশনের বড় ঘড়ির নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে। ও একা গিয়ে ইরার বাড়ির পিছনের সেই মাঠের কুয়ো থেকে টাকাটা তুলে আনবে।
কিন্তু কঙ্কালসার বিপুল কয়েকটা ভুল করেছিল। প্রথমত ওই শীর্ণ শরীরে ঝোঁকের মাথায় আট পেগ জিন টেনে ফেলেছিল। আর দ্বিতীয়ত, দুপুরের রোদ মাথায় করে মাঠ ভেঙে হেঁটে গিয়েছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। মাথা ঘুরে কুয়োর পাড়ে পড়ে গিয়ে ও এক দুর্ঘটনা বাধিয়ে বসেছে। তারপর জ্ঞান ফিরতেই এই নার্সিং হোম।
খাটের ওপর পাশ ফিরল বিপুল শর্মা। রুগ্ন শরীরে জিন খাওয়া তার উচিত হয়নি। তার ওপর আট পেগ, আর ওদিকে ইরা ওর জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করছে। হয়তো শেষ পর্যন্ত অধৈর্য হয়ে ও পুলিশেই—।
নার্সকে লক্ষ করে বলল, আচ্ছা, এখান থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় আমাকে কি কোনও কাগজপত্রে সই করতে হবে?
না, তার কোনও দরকার নেই।—নার্স জবাব দিল, আপনার শরীর এখন সুস্থ। আশা করি, আপনার মাথার চোটটাও সেরে গেছে—ও, এই তো মেজর দত্ত এসে গেছেন।
উঠে এসে খাটের কিনারায় বসল বিপুল। পা দুটো ঝুলিয়ে দিল মেঝেতে। একটা আশ্বাসের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে-সঙ্গে ও কাঁধের ওপর অভিভাবকের স্পর্শ অনুভব করল: কেমন আছেন এখন?
বিপুল তখন রেয়নের পোশাকটাকে দু-হাতে নেড়েচেড়ে দেখছে।
ডক্টর, ও বলে উঠল, ড্রেসটা দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ। কিন্তু আর একটু মাপমতো ড্রেস তো দিতে পারতেন—
খুব একটা বেঠিক মাপের হবে বলে তো মনে হয় না।—মেজর দত্ত হেসে জবাব দিলেন।
আপনি কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন, ডক্টর?—বিপুলের গলা একটু রাগী এবং কঠিন নাকি এই পোশাকটা আপনার পোষা হাতির গা থেকে খুলে এনেছেন?
মানে—ব্যাপারটা কী জানেন, জ্ঞান হারালেও খাওয়া-দাওয়াটা কিন্তু আপনি একটুও কমাননি—।
তার মানে? আমি তো মাত্র আজ সকালেই অজ্ঞান হয়ে—।
বিপুল অনুভব করল মেজর দত্ত ওর চোখ থেকে ব্যান্ডেজ খুলে দিচ্ছেন এবং একইসঙ্গে বলে চলেছেন, এবার আপনি যে আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন না, সেটা আমার প্রশ্ন করার পালা।—হাসলেন মেজর দত্ত, বললেন, আজ মে মাসের কুড়ি তারিখ। আর আপনাকে এই নার্সিং হোমে ভরতি করা হয়েছে গত মার্চ মাসে। সেই অ্যাক্সিডেন্টের পর আপনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন। সেই সময়ে একজন মহিলা ছাড়া আর কেউ আপনাকে দেখতে আসেনি।
নিশ্চয়ই ইরা! ভাবল বিপুল।
সমস্ত ব্যান্ডেজ খোলা হয়ে গেলে মেজর দত্ত উঠে দাঁড়ালেন। বিপুল শর্মাও ধীরে-ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর সামনে চোখ রেখে সাবধানী পায়ে এগিয়ে চলল ঘরের অন্যপ্রান্তে রাখা একটা লম্বা আয়নার দিকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ খুলে পরিপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকাল নিজের শরীরের দিকে। তাকিয়েই রইল।
ও শুনতে পেল পিছন থেকে মেজর দত্ত বলছেন, আপনি এখন স্বাধীন। যেখানে খুশি যেতে পারেন আপনি। আপনাকে এখুনি ডিসচার্জ করে দেওয়া হবে।…আপনি শুধু বিলটা সেটল করার ব্যবস্থা করুন।
প্রচণ্ড খোঁজাখুঁজি করেও নিজের গলার স্বর খুঁজে পেল না বিপুল। ওর শরীরের বিপুল মেদভার এক অজানা উত্তেজনায় অথবা আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। পাঁচ ফুট ব্যাসের ফুটবলমার্কা জলহস্তী চেহারার চর্বির থাকে ওর জলে ভেজা চোখ দুটো বুঝি হারিয়ে গেল। বিপুলের মনে হল, দুলিচাঁদ আগরওয়ালা যেন বাঁধানো দাঁত বের করে ওর দিকে চেয়ে হাসছে।
ও আয়নার সামনে থেকে কয়েক পা পিছিয়ে আসতে চেষ্টা করল। কিন্তু নিষ্ফল আক্ষেপে ওর হাত-পা কাঁপতে লাগল। নিঃশব্দ চিৎকারে ও বলতে চাইল, না—না—না…।
অত্যন্ত শান্ত মুখে মেজর দত্তের দিকে ফিরে তাকাল বিপুল। বলল, ডক্টর, আমাকে একটু বিষ দিতে পারেন?
সাবধান! সাপ আছে (১)
‘চোখ বুজে ঘুরে দাঁড়াও, বিশ্বাস,’ অনন্ত কর মিঠে সুরে বললেন, সুতরাং আমি চোখ বুঝলাম, ঘুরে দাঁড়ালাম, অনেকটা ঘুমিয়ে-চলা মানুষের মতো। শুনলাম, অনন্ত কর সিন্দুক খোলার কম্বিনেশান ডায়াল ঘোরাচ্ছেন।
ক্লিক—ক্লিক—ক্লিক—ক্লিক।
ডানদিকে ষোলো ঘর। মনে-মনে হিসেব করলাম।
ক্লিক—ক্লিক—ক্লিক—ক্লিক।
বাঁদিকে এগারো ঘর। শয়তানি হাসি হাসলাম।
ক্লিক—ক্লিক—ক্লিক—ক্লিক।
‘ডানদিকে ছাব্বিশ,’ জোরে বলে উঠলাম আমি। কিন্তু সৌভাগ্যবশত অনন্ত কর কানে কম শোনেন।
‘ঠিক আছে, বিশ্বাস,’ বললেন অনন্ত কর, ‘এবার ফিরে দাঁড়াতে পারো’।
ফিরে দাঁড়ালাম। লুব্ধ চোখে দেখলাম দশ আর একশোর নোটের বান্ডিলগুলো: দু-লক্ষ চল্লিশহাজার টাকা। আমার শোওয়ার ঘরের তাকে রাখা তাসের প্যাকেটের মতো সুবোধ শিশু হয়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে বান্ডিলগুলো।
অনন্ত কর আরও একটা একশোর বান্ডিল সযত্নে আগেরগুলোর সঙ্গে যোগ করলেন।
দু-লাখ পঞ্চাশ হাজার।
জলতরঙ্গের শব্দ করে সিন্দুকের ভারি দরজাটা বন্ধ করলেন তিনি।
‘আজকের মতো কাজ শেষ,’ অনন্ত বললেন, ‘সাড়ে পাঁচটা বাজে। তুমি এবার যেতে পারো। আমাকে আরও ঘণ্টাখানেক কাজ করতে হবে।’
‘আচ্ছা, স্যার,’ বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকালাম সিন্দুকটার দিকে—যেন একটা কালো কোলাব্যাঙ বসে আছে। আর অনন্ত কর—তিনিও কোলাব্যাঙ, তবে সাদা—সোজা হয়ে দাঁড়ালেন নিজের পায়ে। লোকটা সত্যিই দয়ালু, যাকে দেখলে আমার ঠাকুরদার কথা মনে পড়ে যায়। তা না হলে হয়তো সেই মুহূর্তেই তাঁর দয়ালু মস্তকে এক ঘা বসিয়ে, সিন্দুকের ডায়াল নম্বর অনুযায়ী (আমার জন্মতারিখের চেয়েও যেটা আমার বেশি মুখস্থ) ঘুরিয়ে নোটের বান্ডিলগুলো আমার টেবিলের ড্রয়ারে লুকোনো পলিথিনের ব্যাগে ভরে (দীর্ঘ কয়েকবছরের চাকরি-জীবনে তেতাল্লিশটা ব্যাগ আমি জমিয়ে ফেলেছি টিফিন নিয়ে আসার অছিলায়—) সোজা রাস্তায় নেমে চম্পট দিতাম। লোকে ভাবত ‘জনৈক নিরপরাধ, নিরীহ, কলিকাতাবাসী কৈকেয়ী-ঘরনির আদেশে ক্রয়-কর্ম সমাপনান্তে স্বগৃহে প্র্যাবর্তন করিতেছেন। অহো, উহার প্রতি আমাদিগের সমবেদনা রহিল।’ সুতরাং কাজ শেষ।
