শুভঙ্কর তা সত্ত্বেও চেষ্টা করল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চোখ থেকে চশমা খুলে চোখ মুছল। তারপর: ‘তুই কি ভালো করে কাগজ পড়িসনি! গ্রেনেডটা অনেকটা দূরে ফেটেছে…।’
‘শুভঙ্কর, আমি কিন্তু তোর কাছেই ছিলাম।’ অনেকটা গার্জেনি সুরে বললাম আমি।
শুভঙ্করের মুখ হঠাৎই কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ও চোখ বুজে চেয়ারে গা এলিয়ে বসল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ মেলল আবার। মেপে নেওয়ার চোখে তাকাল আমার দিকে। কিন্তু ওর দৃষ্টিতে কোনও তীব্র ভাব ছিল না—বরং কেমন যেন বিষণ্ণ, শান্ত। ওকে দেখে আমার মায়া হচ্ছিল।
শুভঙ্কর একচিলতে হাসল। অদ্ভুত এক দুর্জ্ঞেয় হাসি। তারপর হঠাৎই চাঙ্গা হয়ে উঠে টান-টান হয়ে বসল চেয়ারে, বলল, ‘নাঃ, আর গোপন করার কোনও মানে হয় না। একদিন তো কাউকে বলতেই হবে! তা তোকেই বলি।’
এরপর ও সব খুলে বলল আমাকে।
না, ওর সব কথা আমি আপনাদের বলতে পারব না। অন্তত সতেরোটা শব্দ— হ্যাঁ, সতেরোই তো—আমাকে বাদ দিতে হবে। এই সতেরোটা শব্দ কোনওদিন কাউকে বলা যাবে না।
বাকিটা আপনাদের বলছি।
‘তুই দেখছি কলেজ-লাইফের ব্যাপারগুলো মনে রেখেছিস—’ শুভঙ্কর বলল, হাসল পুরোনো কথা ভেবে: ‘সেই যে ক্যান্টিনে বসে ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা তর্ক। কথা বলতে-বলতে নির্জন পথে উদ্দেশহীন হেঁটে যাওয়া। আত্মা নিয়ে কত কী বকবক করে গেছি আমি। আর তুই একটুও বিরক্ত না হয়ে চুপচাপ শুনে গেছিস—মনে পড়ে?’
‘হ্যাঁ, মনে পড়ে। সেদিন ইনডোর স্টেডিয়ামের ওই ব্যাপারটার পর আরও বেশি করে সব মনে পড়ে গেছে। তুই বলতি, আত্মার অলৌকিক ক্ষমতা আছে। চিন্তার গভীরতা আর তীব্রতা দিয়ে সেটা প্রমাণ করা যায়। শুধুমাত্র আত্মার শক্তি দিয়ে এক-পা-ও না হেঁটে, কোনও যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই কোনও মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে। তুই বলতি, আত্মার কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই।’
এসব পুরোনো কথা বলতে গিয়ে নিজেকে কেমন বোকা-বোকা লাগছিল। এসব অবাস্তব উদ্ভট চিন্তার কোনও মানে হয়! শুধুমাত্র চিন্তার জোরে এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় যাওয়া! রাবিশ!
কিন্তু সেদিন ইনডোর স্টেডিয়ামের ওই ব্যাপারটা! আমি তো সেখানে হাজির ছিলাম, সব দেখেওছি!
কেমন যেন হতবুদ্ধিভাবে ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে নিয়ে আমি তাকিয়ে রইলাম শুভঙ্করের দিকে। কী বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
হেসে ফেলল শুভঙ্কর। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চলে এল আমার পাশে। পিঠে আলতো চাপড় মেরে বলল, ‘প্রদীপ, তুই যা-যা বললি সেগুলো একদিক থেকে ভুল, আবার একদিক থেকে ঠিকও বটে। যখন এসব কথা বিশ্বাস করতাম তখন আমার বয়েস কম ছিল, জ্ঞানও। শুধু আত্মার পক্ষে এসব করা সম্ভব নয়। কিন্তু…’ ওর চোখ উত্তেজনায় চকচক করে উঠল, ওর কথা বলার গতিও বাড়ছিল একইসঙ্গে: ‘কিন্তু এমন কিছু স্পেশাল টেকনিক আছে যা মনের সঙ্গে আমাদের জগতের সবরকম ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার যোগাযোগ তৈরি করে দেয়। মানে, মাইন্ড আর ফিজিক্যাল ফোর্সের একটা স্পেশাল লিঙ্ক। ফলে, শুধুমাত্র মন দিয়ে, আত্মার শক্তি দিয়ে সবকিছু—যা খুশি করা যায়। যেমন ধর, সমুদ্রের ওপর দিয়ে যেতে চাস? চোখের পলকে সেটা সম্ভব, প্রদীপ। একটা গ্রেনেডের এক্সপ্লোশানকে সামাল দিতে হবে? কোনও ব্যাপারটা নয়! তুই তো নিজের চোখেই দেখেছিস! তবে এ-কাজেও বহু শক্তি খরচ করতে হয়। শক্তির নিত্যতা সূত্রকে তুই তো আর এড়াতে পারিস না! দেখলি তো, ওই ব্যাপারটার পর আমার কী সাঙঘাতিক অবস্থা হয়েছিল! অবশ্য ওই কাজটা অনেক টাফ ছিল। সেই তুলনায় একটা বুলেটের নিশানা ঘুরিয়ে দেওয়ার কাজ মোটামুটি জলভাত। আর তার চেয়েও সহজ হল ফায়ার করার আগেই বুলেটগুলো নিজের পকেটে নিয়ে আসা। তা হলে ফায়ার করার ব্যাপারটাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। কোহিনূর দেখবি? নিয়ে আসব?’
‘কোহিনূর!’ ওর আচমকা প্রশ্নে আমি হাঁ হয়ে গেলাম।
হাসল শুভঙ্কর: ‘হ্যাঁ রে, হিরে কোহিনূর।’
‘তুই ভবিষ্যৎ দেখতে পাস?’ আমি প্রসঙ্গ পালটে জিগ্যেস করলাম।
‘না। ওসব ভবিষ্যৎ-টবিষ্যৎ দেখার ব্যাপারটা…।’
‘তুই মনের কথা টের পাস? টেলিপ্যাথি?’
‘ওঃ, ক্যান্টিনের আড্ডার টপিকগুলো তুই ভুলিসনি দেখছি! না, ভাই, টেলিপ্যাথি জানি না—অন্তত এখনও। দু-চারবছর লেগে থাকলে হয়তো কোনও রেজাল্ট পেলেও পেতে পারি। তবে এখনই আমি অনেক কিছু পারি যেগুলো টেলিপ্যাথির চেয়ে কম ইন্টারেস্টিং নয়। ইচ্ছে করলেই আমি যে-কোনও শব্দ, যে-কোনও কথা শুনতে পারি। যা ইচ্ছে তা-ই দেখতে পাই। যেমন ধর, অ্যাস্টারয়েড বেল্টের গ্রহাণুগুলোর চেহারা আমি দেখেছি—এবড়োখেবড়ো পাথর…।’
আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে চাপা স্বরে বললাম, ‘আমাকে কিছু একটা করে দেখা তো!’
হাসল শুভঙ্কর। ভারি অদ্ভুত সে-হাসি। যেন অঙ্কে ডক্টরেট কোনও পণ্ডিতকে ক্লাস ওয়ানের অঙ্ক করতে বলা হয়েছে।
আমি অবাক চোখে শুভঙ্করকে দেখছিলাম। বিশ্বাস হতে চায় না, অথচ বিশ্বাস না করেও তো উপায় নেই। এই মানুষটা সব পারে! এই মানুষটা এখন ভগবান!
দিনের-পর-দিন, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ও একই স্বপ্ন নিয়ে কাটিয়েছে। নানারকম জটিল তত্ত্ব, পুঁথিপত্র নাড়াচাড়া করেছে। বহুরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। সফল হতে পারেনি। কিন্তু তিলতিল করে ও এগিয়ে গেছে সাফল্যের দিকে—থামেনি একলহমার জন্যেও। শেষ পর্যন্ত হাতের নাগালে এসেছে অমৃতের পাত্র…।
