ও বলল, ‘স্টেজের একটু কাছাকাছি দিতে চেষ্টা করিস।’
তাই দিলাম। এবং অনুষ্ঠানের দিন দেখি শুভঙ্কর তৃতীয় সারিতে বসে আছে। ওর টানা-টানা ভাবুক চোখ বিশিষ্ট মানুষদের আলোচনা শুনতে মগ্ন। অবশ্য আমার কানে ওসব কথাবার্তা ঢুকছিল না। আমি দর্শকদের ওপরে তীক্ষ্ন নজর রেখেছিলাম। কারও এতটুকু বেচাল দেখলেই আমার ক্ষিপ্র ডানহাত পৌঁছে যাবে কোমরে আঁটা সার্ভিস রিভলভারে।
শেষ পর্যন্ত রিভলভারে হাত আমাকে দিতেই হল।
হলের চতুর্থ সারি থেকে তিনজন লোক হঠাৎই প্যাসেজে বেরিয়ে এল। তারপর আচমকা চিৎকার করে ওদের দুজন রিভলভার বের করে গুলি ছুড়তে শুরু করল।
এসব ঘটনা তো আপনারা কাগজে পড়েছেন! তবে আমি আপনাদের যেসব খুঁটিনাটি তথ্য দেব সেগুলো কাগজে বেরোয়নি।
অসমের একটা জঙ্গি দল—নাম, বিটা ফ্রিডম—গত কয়েকমাস ধরেই কলকাতায় নানারকম উৎপাত করছিল। এরা গুলি ছোড়ার আগে চেঁচিয়ে সেই নামটাই বলেছে। আর এদের সুইসাইড স্কোয়াড কখনও বেঁচে ফেরার কথা ভাবে না।
এসব জঙ্গি-ফঙ্গির কেসে আমিও ওদের সঙ্গে একমত। ওদের বাঁচিয়ে অ্যারেস্ট করার কোনও সিন নেই। অন্তত আমার কাছে। তাই স্টেজের একপাশ থেকে চিতাবাঘের মতো লাফ দিয়ে নেমে এলাম নীচে—প্রথম সারির দর্শকদের সামনে। রিভলভারসমেত ডানহাত তৈরি।
ওদের গুলিতে একটা ফুলদানি ঠিকরে পড়ল। স্টেজের দুজন আহত হয়ে বসে পড়েছে। সবাই দুদ্দাড় করে ছুটে পালাচ্ছে।
দর্শকরাও চিৎকার করে উদভ্রান্তভাবে ছোটাছুটি শুরু করেছে। তারই মধ্যে দেখি শুভঙ্করও ছুটে আসছে আমার কাছে।
আমি নিখুঁত নিশানায় গুলি করলাম। এজনের কপালে, আর-একজনের বুকে। ওরা জমার খাতা থেকে পলকে ঢুকে পড়ল খরচের খাতায়।
তিন নম্বরকে গুলি করতে গিয়েই আমি থমকে গেলাম।
লোকটা পিন টেনে একটা হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ে দিয়েছে প্যাসেজে—আমার কাছাকাছি। তারপর ভিড়ের মধ্যে মিশে গেছে।
ওকে গুলি করার কথা ভুলে গিয়ে আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম গ্রেনেডটার ওপরে—যদি ফেটে যাওয়ার আগে ওটাকে দরজার বাইরে ফাঁকা জায়গায় ছুড়ে দেওয়া যায়।
কিন্তু আমাকে হারিয়ে দিয়ে এক অলৌকিক প্রক্রিয়ায় শুভঙ্কর মিত্র গ্রেনেডটার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
পরদিনের কাগজে আমাদের দুজনকেই হিরো বানিয়ে দেওয়া হল। পঞ্চাশ হাজার টাকা করে সরকারি পুরস্কারও ঘোষণা করা হল। কাগজের রিপোর্ট অনুযায়ী, শুভঙ্কর মিত্র একেবারে গ্রেনেডটার ওপরে গিয়ে পড়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কী-এক আশ্চর্য কায়দায় ও প্রেনেডটাকে এমনভাবে দরজা দিয়ে ছুড়ে দিয়েছিল যে, গ্রেনেডটা ফেটে গেলেও কেউই মারাত্মকরকম জখম হয়নি।
গ্রেনেডের বিস্ফোরণে কাঠ, লোহা, কাচ তিরবেগে ছিটকে গেছে নানা দিকে। কিন্তু সবাই বেঁচে গেছে। বিস্ফোরণের ধাক্কায় শুভঙ্কর অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়ার ছ’ঘণ্টা পর ওর জ্ঞান ফিরেছিল। তারপর প্রায় তিরিশ ঘণ্টা ও একেবারে শয্যাশায়ী ছিল।
সব মিলিয়ে বিশ্বাস-হতে-চায়-না এমন একটা ঘটনা শুভঙ্কর ঘটিয়ে দিয়েছে।
দু-দিন পর সন্ধেবেলা ওর বাড়িতে গেলাম।
ও আমাকে দেখে খুশি হয়ে হাসল। হাসিটা কলেজজীবন থেকে নেওয়া। দেখে ভালো লাগল। আমাদের দুজনের বয়েস কমতে লাগল।
‘বোস, প্রদীপ। একেবারে কান ঘেঁষে বেঁচে গেছি, কী বলিস! বছরচারেক আগে তিব্বতে একবার এরকম সিচুয়েশন হয়েছিল।’
‘ওসব তিব্বত-টিব্বতের ব্যাপার জানি না। তুই সেদিন আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিস।’
‘আরে না, না। আমি শুধু সাহস করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম…তারপর সব কপাল। লাক, বুঝলি, লাক!’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘তুই বলছিস লাক। কিন্তু কাগজে তোর কথা যা লিখেছে…ফ্যান্ট্যাসটিক। লিখেছে, তুই চোখের পলকে যে-অ্যাকশান নিয়েছিস তা এক-কথায় অকল্পনীয়। কেউ দেখেশুনে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাজ শেষ।’
শুভঙ্কর লজ্জা পেয়ে গেল। চোখ নামিয়ে বিনয়ের সুরে আমতা-আমতা করে বলল, ‘ওরা সবকিছু ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে লেখে। আসলে আমার দিকে কেউ অতটা খেয়াল করেনি…।’
আমি অল্প হাসলাম: ‘আমি কিন্তু খেয়াল করেছি। কারণ, খেয়াল করাটাই আমার কাজ।’
শুভঙ্কর চোখ তুলে তাকাল আমার দিকে। ওর চোখে কেমন যেন একটা ধরা-পড়ে-যাওয়ার ভয়।
আমি বলতে লাগলাম, ‘শুভঙ্কর, তোর আর গ্রেনেডটার মাঝে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। তুই আমাকে পেরিয়ে কী-করে ওটার কাছে গেলি সেটাই আমার মাথায় ঢুকছে না। এই দেখলাম তুই দূরে দাঁড়িয়ে—তারপরই দেখি তুই একেবারে গ্রেনেডটার ওপরে। তা ছাড়া…।’
শুভঙ্কর আপত্তির ঢঙে মাথা নেড়ে আমাকে থামাতে চাইল। কিন্তু আমি থামলাম না। বলার নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল।
‘তা ছাড়া তুই পড়েছিলি গ্রেনেডটার একেবারে ওপরে। ওটা ফেটেছে তোর বডির নীচে। উহুঁ—আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না, কারণ, আমি বলতে গেলে তোর ওপরে গিয়ে পড়েছিলাম। গ্রেনেডের এক্সপ্লোশানের ধাক্কায় তুই ছিটকে শূন্যে উড়ে গিয়েছিস। তারপর—তুই কি বুলেটপ্রূফ জ্যাকেট পরেছিলি?’
শুভঙ্কর গলাখাঁকারি দিয়ে সময় নিল। তারপর বলল, না, আসলে ঠিক তা নয়….’
আমি ঠান্ডা চোখে শুভঙ্করের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘শুভঙ্কর, তুই হয়তো ব্যাপক বুদ্ধিমান। কিন্তু তাই বলে এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, আমি এক ব্যাপক মূর্খ।’
