আমাকে এসব কথা বলতে নিশ্চয়ই ওর ভালো লাগছিল। নিজের নিষ্ঠা, পরিশ্রম আর কৃতিত্বের কথা কার না বলতে ইচ্ছে করে!
‘কিছু একটা করে দেখাব?’ শুভঙ্কর যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলল, ‘দাঁড়া—’ ঘরের চারপাশে চোখ বোলাল ও: ‘ওই জানলাটা দেখছিস?’
ঘরের একটা বন্ধ জানলার দিকে তাকালাম। খট করে শব্দ করে জানলাটা খুলে গেল। পরমুহূর্তেই আবার বন্ধ হয়ে গেল।
‘টিভিটা দেখ!’ বলল শুভঙ্কর।
সঙ্গে-সঙ্গে টিভি-টা অন হয়ে গেল।
‘ওটার দিকে তাকিয়ে থাক।’
টিভি-টা অদৃশ্য হয়ে গেল। পরক্ষণেই আবার ফিরে এল। কিন্তু দেখলাম টিভি-টার সারা গায়ে মিহি বরফকুচি লেগে আছে।
‘ওটাকে হিমালয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম।’ হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল শুভঙ্কর।
এবার ও তীব্র চোখে টিভি-র মেইনস কর্ডটার দিকে তাকাল।
আমার হতভম্ব দৃষ্টির সামনে কর্ডটা শূন্যে ভেসে উঠল সাপের মতো—তার শেষ প্রান্তে প্লাগটা যেন সাপের ফণা। ওটা এগিয়ে যাচ্ছিল দেওয়ালে বসানো সকেটের দিকে।
কিন্তু সকেটের কাছে পৌঁছনোর আগেই প্লাগটা আচমকা খসে পড়ে গেল মেঝেতে।
শুভঙ্কর কেমন একটা বিরক্তির শব্দ করে উঠল, বলল, ‘নাঃ! দাঁড়া, তোকে আরও কঠিন কিছু দেখাই।’
ওর শরীর থরথর করে কাঁপছিল। কাঁপা গলায় ও বলল, ‘টিভি-টার দিকে লক্ষ কর, প্রদীপ। সকেটে প্লাগ না গুঁজেই ওটা তোকে চালিয়ে দেখাব। স্রেফ বাতাস থেকে ইলেকট্রন নিয়ে…।’
রঙিন টিভি সেটটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল শুভঙ্কর।
হঠাৎই পাওয়ার অন হওয়ার ছোট্ট লাল বাতিটা জ্বলে উঠল। বারকয়েক দপদপ করে জ্বলল-নিভল। তারপর জ্বলেই রইল। টিভির স্পিকার থেকে শব্দ বেরোতে শুরু করল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। আলতো পায়ে পৌঁছে গেলাম ওর পেছনে। কোমর থেকে সার্ভিস রিভলভারটা বের করে নিলাম।
বেশ বুঝতে পারছিলাম, একটা বিরাট জুয়া খেলছি—কিন্তু এ ছাড়া আর তো কোনও উপায় নেই।
রিভলভারের বাঁট দিয়ে ওর বাঁ-কানের পেছনে প্রচণ্ড ঘা বসিয়ে দিলাম। টুঁ শব্দ না- করে শুভঙ্করের দেহটা ভাঁজ খেয়ে উলটে পড়ল মেঝেতে। আরও একটা ঘা বসিয়ে দিলাম ওর মাথায়। পরখ করে নিশ্চিন্ত হলাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ওর জ্ঞান আর ফিরছে না। সুতরাং আমার কাজ শুরু করলাম।
পেশাদারি ঢঙে ওর ফ্ল্যাট তন্নতন্ন করে সার্চ করতে লাগলাম। একটু পরেই একটা ড্রয়ারে ওর গবেষণার কাগজপত্রগুলো পেলাম। যা চাই সবই রয়েছে সেখানে। লেখা রয়েছে ওর অলৌকিক ক্ষমতার গোপন রহস্য। জুয়ায় আমি জিতেছি।
টেলিফোন তুলে নিয়ে পুলিশে ফোন করলাম।
তারপর মেঝেতে কাত হয়ে পড়ে থাকা শুভঙ্করের গলায় রিভলভার ঠেকিয়ে ফায়ার করলাম। পুলিশ এসে পৌঁছতে-পৌঁছতে শুভঙ্কর মিত্র মরে কাঠ।
শুভঙ্কর আমার বন্ধু ছিল। এমন বন্ধু যাকে বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু ওই গোপন রহস্য জানার পরেও বিশ্বাস করা যায় কি না সেটাই প্রশ্ন।
মাত্র সতেরোটা শব্দে শুভঙ্করের অলৌকিক ক্ষমতা পাওয়ার রহস্য ফাঁস করা আছে গবেষণার কাগজে। এই মন্ত্রটা একবার কেউ পড়ে নিলেই হল! চোর-ডাকাত-খুনি-পাগল—যে-কেউ এটা পড়ে নিয়ে কাজে লাগাতে পারে, এতই সহজ সেই সূত্র।
শুভঙ্কর এমনিতে খুব সৎ, আদর্শবাদী। কিন্তু এই ক্ষমতা হাতে নিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই ও নিজেকে ভগবান ভাবতে শুরু করবে। তখন?
ধরা যাক, আপনি ওই সতেরোটা শব্দ জেনে গেছেন। তখন আপনি অনায়াসে যে-কোনও ব্যাঙ্কের ভল্টে ঢুকে পড়তে পারবেন, যে-কোনও বন্ধ ঘরে উঁকি মারতে পারবেন, দেওয়াল ভেদ করে ইচ্ছেমতো যাতায়াত করতে পারবেন। পিস্তল বা রিভলভারের গুলি আপনাকে খতম করতে পারবে না। গ্রেনেড কিংবা অ্যাটম বোমার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়েও আপনার বিন্দুমাত্র ভয় করবে না। কারণ চোখের পলকে—শুধু ইচ্ছে করলেই—আপনি হাজার-হাজার মাইল দূরে চলে যেতে পারবেন।
এরকম ক্ষমতা যদি পান, তখন?
লোকে বলে, ক্ষমতা থেকে দুর্নীতির জন্ম হয়। সুতরাং চূড়ান্ত ক্ষমতা হাতে পেলে জন্ম নেবে চূড়ান্ত দুর্নীতি। ওই সতেরোটা শব্দই চূড়ান্ত ক্ষমতার শেষ কথা। সুতরাং, শুভঙ্কর আমার বন্ধু হলেও আমি ওকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছি। ওই সতেরোটা শব্দের ক্ষমতা হাতে দিয়ে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না—শুভঙ্করকেও না।
তবে নিজেকে বিশ্বাস করতে আমার আপত্তি নেই।
আপনার কোনও আপত্তি আছে নাকি?
সন্ধের পর, একা
মল্লিকা বেশ বুঝতে পারছিল চেঁচিয়ে কোনও লাভ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটা বিকৃত চিৎকার ওর ঠোঁট চিরে বেরিয়ে আসতে চাইল। আজকের এই মুহূর্তটার জন্য ও মনে-মনে বহুবার তৈরি হয়েছে। তাতে ওর মনে হয়েছিল, বেশ শান্তভাবে ঠান্ডা মাথায় ও ব্যাপারটার মোকাবিলা করতে পারবে। কিন্তু এখন, নির্জন ঘরে, ভয়ঙ্কর মানুষটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মল্লিকার সব হিসেব গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল।
মোহনদাস জোয়ারদার তখন ঘরের একমাত্র দরজাটা লক করে মল্লিকার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। মেয়েটার মুখের অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে, ভয় পেয়েছে। আজ পর্যন্ত মোহনদাস এমন কাউকে দেখেনি যে ভয় পায়নি। আচ্ছা-আচ্ছা সাহসী মেয়েও এই অবস্থায় ভয় পেয়েছে। অনেকে তো আবার কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। মেয়েগুলো ছিঁচকাদুনে হলে মোহনদাস তেমন মজা পায় না। বরং বিরক্ত লাগে।
‘কী, দিদিমণি, ভয় করছে? চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে?’ রীতিমতো স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন দুটো করল মোহনদাস।
