সতেরো শব্দের ম্যাজিক
খুন করলে শাস্তি পেতে হয়। সেটাই নিয়ম। আর আমি তো নিয়মের বাইরে নই! এখন যে এই জেলে বসে ফাঁসির জন্যে অপেক্ষা শুরু করেছি সেটাও নিয়মের মধ্যেই পড়ে।
কিন্তু কারও প্রতি আমার কোনও অভিযোগ নেই। কারণ, খুন করলে যে ফাঁসি হতে পারে সেটা আমার জানাই ছিল। তার ওপর নিজের দোস্তকে খুন করেছি, আর সেই খুনের কথা পুলিশের কাছে কবুলও করেছি।
একটু আগে টেলিফোন করে আমি নিজেই পুলিশে খবর দিয়েছি।
আমার পায়ের কাছে শুভঙ্করের দেহটা চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে। ওর গলার ফুটো দিয়ে এখনও রক্ত বেরিয়ে আসছে—ঠিক কর্পোরেশনের ফুটো হয়ে যাওয়া জলের পাইপের মতো। হ্যাঁ, শুভঙ্করের হাত-পা তখনও সামান্য নড়ছিল। ঝাপসাভাবে একটু-আধটু চিন্তাও বোধহয় করতে পারছিল। ও কী ভাবছিল আমি জানি। আমিও একই কথা ভাবছিলাম। সতেরোটা শব্দের জন্যে ওকে মরতে হল। আমাকে মারতে হল ওই ক’টা শব্দের জন্যে। ওই সতেরোটা শব্দ দুনিয়ার আর কেউ জানে না। শুধু আমি জানি। আর শুভঙ্কর জানত।
এও জানি, সবাই অবাক হয়ে ভাববে বহুদিনের পুরোনো বন্ধু শুভঙ্কর মিত্রকে কেন আমি খুন করলাম। বিশেষ করে যে-শুভঙ্কর দিনকয়েক আগেই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে একরকম অলৌকিকভাবে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে!
যদি আপনারা বিরক্ত না হন তা হলে শুরু থেকে সব খুলে বলি—শুধু ওই সতেরোটা শব্দ ছাড়া।
শুভঙ্কর আর আমি একসঙ্গে স্কুলে পড়েছি, কলেজে পড়েছি। তবে ওই একসঙ্গে পড়েছি পর্যন্তই। পড়াশোনায় কখনও ওর ধারেকাছেও আমি আসতে পারিনি। পড়াশোনায় ও যদি জিরাফ হয়, আমি তা হলে ছারপোকা—এতটাই উচ্চতার ফারাক ছিল। কিন্তু আশ্চর্য মানুষ ছিল শুভঙ্কর। কী সহজভাবেই না আমার সঙ্গে মিশত! পরের উপকার করার জন্যে সবসময় এক-পা বাড়িয়েই থাকত। পরের দুঃখে দুঃখ পেত, পরের সুখে সুখ। আমাকে পড়াশোনায় ভালো করে তোলার ব্যাপারেও ও কম মেহনত করেনি। কিন্তু ধন্য আমার অপদার্থ মেধা! সে তার জায়গা থেকে একচুলও নড়েনি।
সুতরাং শুভঙ্কর সব পরীক্ষায় পাশ করত লাফিয়ে-লাফিয়ে, আর আমি গড়িয়ে-গড়িয়ে। কিন্তু একদিনের জন্যেও ওকে আমি ঈর্ষা করিনি। ও ছিল এমন মানুষ যাকে ঈর্ষা করা যায় না, শুধু ভালোবাসা যায়।
শুভঙ্কর বইয়ের পোকা ছিল। নানান ধরনের বই পড়ত ও। বেদ, উপনিষদ, গীতা থেকে শুরু করে চীনা আর তিব্বতি পুঁথির কপিও ওর প্রিয় ছিল। সবসময় দেখতাম চিন্তায় কেমন বিভোর হয়ে আছে। কিছু জিগ্যেস করলেই বলত, আত্মার শক্তির মূল রহস্যে পৌঁছনো দরকার। তা হলেই হাতে পাওয়া যাবে চরম শক্তি।
আমি যে ওর কথাবার্তার একটি বর্ণরও মানে বুঝতাম না, সেটা নিশ্চয়ই আর বলার প্রয়োজন নেই!
দুর্দান্ত রেজাল্ট করে রীতিমতো দার্শনিক হয়ে শুভঙ্কর কলেজের পড়াশোনা শেষ করে ইউনিভার্সিটির দিকে এগোল। আর আমি সেই গড়িয়ে-গড়িয়ে গ্র্যাজুয়েট হয়ে পড়াশোনার চাকা থামালাম। এবং চাকরি পেলাম পুলিশে।
শুভঙ্করের সঙ্গে যোগাযোগ আর ছিল না। কী করে যেন দশ-দশটা বছর কেটে গেল। তারপর হঠাৎই একদিন শুভঙ্করের সঙ্গে রাস্তায় দেখা।
ওর বয়েস যেন দশের জায়গায় পনেরো বছর বেড়ে গেছে। মাথায় অনেকটা টাক পড়েছে। আর জ্ঞানও নিশ্চয়ই বহু-বহুগুণ বেড়েছে এই সময়ে। কারণ, এখনও ওর চোখে সেই কলেজজীবনের ভাবুক দৃষ্টি। আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এক অদ্ভুত উজ্জ্বল দীপ্তি। চশমার কাচদুটোও যেন সেই দীপ্তিতে চকচক করছে। একেই কি বলে জ্ঞানের আলো?
‘আরে, প্রদীপ না!’
‘শুভঙ্কর, তুই!’
এরপর রাস্তায় দাঁড়িয়েই হাত ঝাঁকানো, পিঠ চাপড়ানো, আর পুরোনো দিন নিয়ে নানা কথা।
‘কী করছিস এখন তুই?’ শুভঙ্কর জিগ্যেস করল।
‘আমি এখন চিফ মিনিস্টারের বডিগার্ড।’ আমি একটু গর্বের সঙ্গে বললাম। রাজ্যের হর্তাকর্তা বিধাতার প্রাণরক্ষী হওয়াটা নিশ্চয়ই খুব ফেলনা নয়!
খেলাধুলো বরাবরই আমার প্রিয়। ঝুঁকি নিতেও খারাপ লাগে না। তাই এই পাহারাদারির কাজটা বেশ মেজাজি ঢঙে করতে পারি। এই কাজের কতকগুলো ইন্টারেস্টিং দিক আছে। উঁচুমহলের কিছু-কিছু গোপন খবর আগেভাগেই জানা যায়। সেজন্যে বাঁকা-পথে কমবেশি কু-প্রস্তাব যে আসেনি এমন নয়। কিন্তু আমি অনায়াসে সেগুলো খারিজ করে দিয়েছি। বিশ্বাসঘাতকতা আমার ভৌত বা রাসায়নিক ধর্মে নেই। তা ছাড়া দেশের জন্যে আমি প্রাণ দিতেও রাজি, নিতেও।
অনেক সময় মুখ্যমন্ত্রীর কোনও অনুষ্ঠানে পাশ পাওয়ার জন্যে কেউ-কেউ আমাকে ধরে। আমি এরকম পাশ অনেককেই জোগাড় করে দিয়েছি। শুভঙ্করও আমাকে হঠাৎ একই অনুরোধ করল।
নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামে সামনের শনিবার চিফ মিনিস্টার একটা আলোচনা-চক্র ডেকেছেন। তাতে পশ্চিমবঙ্গের প্রাকৃতিক বিপর্যয়, খরা, বন্যা ইত্যাদি নিয়ে বিশিষ্ট বক্তারা তাঁদের বক্তব্য পেশ করবেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হিসেবে হাজির থাকবেন নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন। তিনি বলবেন, এইসব বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে কীভাবে উন্নত করা যায়।
শুভঙ্কর একেবারে নাছোড়বান্দার মতো আমাকে চেপে ধরল।
আমি ওর ফোন-নাম্বার নিলাম। বললাম, দেখছি, কী করা যায়। যদি একটা পাশ জোগাড় করতে পারি তা হলে ওকে ফোন করে দেব।
