কিন্তু কেন, কুন্তলা?
সামনের খাটো টেবিল থেকে এক গ্লাস জল নিল কুন্তলা। মাথাটা সামান্য তুলে কিছুটা ঠান্ডা জল খাইয়ে দিল আমাকে। শরীরে যেন প্রাণ এল। জ্বালাও জুড়োল কিছুটা। আমি এখনও বেঁচে আছি। সত্যি, বেঁচে থাকার স্বাদ এত সুন্দর!
রাজীব, ভেবেছিলাম একদিন-না-একদিন তুমি বুঝতে পারবে আমার কষ্ট। কী যন্ত্রণার মধ্যে আমাকে রেখেছ তুমি। আমার আশা ছিল, কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু তোমার কাছে সে-ভালোবাসার কোনও দাম নেই। তুমি মেতে আছ নিজের লেখা নিয়ে, নিজেকে নিয়ে। এটা বুঝতে আমার বেশ সময় লেগেছে। সীমা, সীমার মতো আরও কত মেয়ে, তোমার স্বার্থপরতার শিকার হয়েছে। ওদের নিয়ে তুমি লিখেছ—লোকে তোমার লেখা জীবন্ত বলে প্রশংসা করেছে। তারপর…তারপর নিজের জীবন-মরণকে তুমি ঠেলে দিয়েছ আমার হাতে। ব্যাপারটা তোমার কাছে হয়তো খুব সহজ, কিন্তু আমার কাছে, রাজীব? যদি কাঁকড়াবিছের বিষ তাড়ানোর ওষুধ ঠিকমতো কাজ না করে? যদি ঘুমের ওষুধের ধক কাটানোর ইনজেকশান সময়মতো দিতে না পারি? কখনও কি তুমি ভেবেছ আমার মনের অবস্থাটা কী হয়? তোমার মৃত্যু-যন্ত্রণা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখি, তারপর প্রতিটি খুঁটিনাটি তোমাকে শোনাই, যাতে তুমি লিখতে পারো তোমার উপন্যাস। এ যে কী কষ্ট তুমি বুঝবে না।
ও রেগে গেছে। হালকা মনেই ভাবলাম।
‘…ওর দু-গাল ক্রোধে রক্তিম। চোখে জ্বলছে জোনাকি। ওর সপ্রাণ স্তন উত্তেজনায় উঠছে, নামছে। পোশাকের বাঁধন ছিঁড়ে বিদ্রোহ জানাবে এখুনি…।’
মন্দ নয়। একটু ঘষামাজা করে নিলে নেহাত মন্দ হবে না। জীবন্ত ছবি।
হঠাৎই একটা তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম পেটে। পরক্ষণেই সেটা কমে গেল। গভীর শ্বাস নিয়ে বললাম, তুমি ছুরি দিয়ে দড়িটা কেটে দিয়েছিলে, তাই না, কুন্তলা? তা হলে তুমি নিশ্চয়ই এখনও ভালোবাসো আমাকে, ভালোবাসো না?
সত্যিই কি বাসি?—ওর চোখে শীতল বিদ্যুৎ। কণ্ঠস্বরেও। যদি এই মুহূর্তে ওকে স্পর্শ করি তা হলে শরীরেও পাব শীতল স্পর্শ—আমি জানি।
কুন্তলা আবার বলল, ভালোবাসা! ভালোবাসা কতরকম হয় জানো? কিংবা ঘৃণা? কিংবা দুটোই? মাথার যন্ত্রণা, মনের যন্ত্রণা, শরীরে লক্ষ-লক্ষ বিস্ফোরণ, বুকের ভেতর কান্না সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়—।
আবার সেই যন্ত্রণার ছুরিটা বিদ্ধ হল পেটে। রোমকূপ থেকে কুলকুল করে বেরিয়ে এল শীতল ঘামের ধারা। জিভটা কেমন বিস্বাদ ঠেকছে…হঠাৎ চমকে উঠলাম।
ওই জলের মধ্যে…।
হ্যাঁ, রাজীব, ওই জলের মধ্যে অ্যাকোনাইট মোশানো ছিল।
অ্যাকোনাইট!—হাত বাড়িয়ে কুন্তলার নাগাল পেতে চাইলাম, কিন্তু যন্ত্রণায় অবশ হয়ে আসা শরীর শক্তি খুঁজে পেল না। অ্যাকোনাইট বিষটা আমার খুব চেনা। শেষ দুটো বইয়ের আগের বইটায় এই বিষটা আমি ব্যবহার করেছি। মরতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। চেতনা কখনও আচ্ছন্ন হয় না। বড় যন্ত্রণাময় মৃত্যু।
ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
কুন্তলা হাঁটুগেড়ে বসে আছে। সুডৌল হাত দুটি বুকের কাছে ভাঁজ করা। মুখে রাগ নেই। শুধু আমাকে লক্ষ করছে, ওর সুন্দর সুকুমার মুখে শুধু শূন্যতা।
মৃত্যু—এক রহস্যময়ী রূপসী রমণী।…আমার চোখ জ্বালা করছে। ঠোঁটের কোণে নোনা অশ্রুর স্বাদ। আতঙ্ক, যন্ত্রণা, সবকিছুর মধ্যেও বুঝতে পারছি, সাদা কাগজে আর লেখা হবে না চমৎকার শব্দগুলো: মৃত্যু—এক রহস্যময়ী রূপসী রমণী।
আমার জন্যে এই নৃশংস নিয়তি কেন বেছে নিল কুন্তলা? ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে কেন শেষ প্রশ্বাস নিতে দিল না আমাকে?
কুন্তলা উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল আমার টেবিলের দিকে। লেখা পৃষ্ঠাগুলো তুলে নিল। ও কি পড়েছে লেখাটা? আমি ভেবেছিলাম পড়েনি। ভুল ভেবেছি…।
অন্যমনস্ক হাতে পাতা উলটে একটা বিশেষ পৃষ্ঠায় এসে থামল কুন্তলা। তারপর আবেগহীন শুকনো গলায় পড়তে শুরু করল। আমার দিকে একটিবারের জন্যেও তাকায়নি ও। পড়তে লাগল। জীবন নিংড়ে লেখা আমার শেষ উপন্যাসের একটা অংশ।
‘…কী সহজ, ভাবল অনিকেত। ছায়াময় ঘরে ছোট খাটটার পাশে দাঁড়িয়ে ওর শরীরে ভয়ের কাঁপুনি খেলে গেল পলকে। ও একা, ওর মুখে কথা নেই। কত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে গেল। এখন আর কোনও প্রতিবাদ নেই। বাচ্চাটার ছোট্ট শরীর এখন স্পন্দনহীন। ঘুম নয়, কালঘুম। ওর সন্তান, ওর আদরের মেয়ে—শরীরে সাড়া নেই, কারণ, অনিকেত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি সংকটের মুহূর্তে। ও জানত, কোন বিপদ ওত পেতে রয়েছে মেয়েটার মাথার কাছে। অনিকেতের কৌতূহলই কি এই মৃত্যুর কারণ? জীবনের সবরকম অনুভূতিকে ও তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করতে চায়—সে-অনুভূতি যত ভয়ংকর হোক, যত নৃশংস হোক—এটা অনিকেতের একটা খেলা। এ সেই পুরনো পাপ—জানার কৌতূহল। আদম আর ইভ থেকে যার শুরু। এখন…এখন ও অন্য সবার থেকে আলাদা। এই বীভৎস অভিজ্ঞতা বুকের ভেতরে নিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে হবে ওকে। এ-অভিজ্ঞতার কথা কেউ জানবে না, কেউ না। কেউ জানবে না, অনিকেত পাপী। কারণ, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটা ও ইচ্ছে করলে রুখতে পারত। কিন্তু তা ও করেনি। অজানাকে জানার তীব্র কৌতূহল ওকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিল…।’
কুন্তলা আমার অসমাপ্ত শেষ উপন্যাসের পৃষ্ঠা থেকে চোখ তুলল। ওর গলার স্বর অস্ফুট, নির্লিপ্ত—রুক্ষতা সেখানে নেই। ও বলল, ফাঁসিতে মরলে তোমার শাস্তি অনেক কম হত, রাজীব।
