ভদ্রলোক তাঁর হাতের বইটা ব্রিফকেসের ওপরে নামিয়ে রাখলেন। চুরুটে আয়েস করে ঘনঘন দুটো টান দিলেন। হাত নেড়ে চোখের সামনে থেকে ধোঁয়া সরিয়ে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে নিছকই ট্রেনে আলাপ। এ বিষয়ে বেশি কথা বলা ঠিক হবে কি না জানি না। তবে আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে খুব মানসিক চাপের মধ্যে আছেন…তাই বলছি…।’
আমি দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
রাতের ট্রেন কোনও একটা স্টেশনকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ট্রেনের খটাখট শব্দ হঠাৎ যেন কয়েক ধাপ বেড়ে গেল। বন্ধ কাচের জানলার ফাঁক দিয়ে শীতের ঠান্ডা বাতাস ঢুকছিল। কিন্তু আমি শীত গ্রাহ্য না-করে ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওঁর চশমার ডান-কাচে কেবিনের একটা আলোর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু ওঁর বাঁ-চোখ লেন্সের ভেতর দিয়ে আমাকেই দেখছিল।
ভদ্রলোক সামান্য কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ”সুনন্দা”-র বিক্রি আড়াই লাখেরও বেশি। শুধুমাত্র ভালো লেখা, ছাপা, রংচঙ বা দামি কাগজ দিয়ে এই সারকুলেশানে পৌঁছনো যায় না। এর অন্য একটা সিক্রেট আছে…।’
‘কী সিক্রেট?’ আমি চাপা গলায় প্রশ্ন করার সঙ্গে-সঙ্গে ভদ্রলোকের দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়লাম।
ভদ্রলোক চুরুটটা আশট্রেতে গুঁজে দিয়ে সামান্য হাসলেন: ‘সিক্রেটটা হল হিউম্যান কেমিস্ট্রি। আমি জানি, আপনি এর নাম শোনেননি—শোনার কথাও নয়। কারণ ব্যাপারটা সতেরো শতকের অ্যালকেমির মতোই খুব গোপনে চর্চা করা হয়…।’
হিউম্যান কেমিস্ট্রি! কেমিস্ট্রির এরকম কোনও শাখা আছে বলে কখনও শুনিনি। তা ছাড়া সেই ছোটবেলা থেকেই কেমিস্ট্রিকে ভয় পেয়ে বড় হয়েছি। প্রায় রোজই করুণাময় ঈশ্বরকে প্রাণপণে ডেকেছি, কবে কেমিস্ট্রি আমার নগণ্য জীবন থেকে অদৃশ্য হবে। আর শেষকালে ম্যাগাজিনের রেকর্ড সারকুলেশানের সিক্রেট কিনা ‘ইয়ে’ কেমিস্ট্রি!
‘বুঝতে পারছি, রসায়নশাস্ত্র ব্যাপারটার প্রতি আপনার খুব একটা শ্রদ্ধা-ভক্তি নেই। অ্যালকেমি সম্পর্কেও বেশিরভাগ মানুষের এইরকম ধারণা ছিল। অ্যালকেমি শব্দটার বাংলা নাম দেওয়া হয়েছে অপরসায়ন। কিন্তু যাঁরা জানার তাঁরা ঠিকই জানেন কোন-কোন ধাতু থেকে কীভাবে সোনা তৈরি করা যায়। সুতরাং, অ্যালকেমি একেবারে অলীক ব্যাপার নয়।’
প্রসঙ্গ পালটে যাচ্ছে দেখে আমি অধৈর্য হয়ে ভদ্রলোককে খেই ধরিয়ে দিতে চাইলাম: ‘কিন্তু সারকুলেশানের সঙ্গে হিউম্যান কেমিস্ট্রির কী সম্পর্ক?’
‘সম্পর্ক আছে—খুব গভীর সম্পর্ক। অ্যালকেমির মতো হিউম্যান কেমিস্ট্রিও খুব গোপনে চর্চা করা হয়। সারা পৃথিবীতে এই বিষয় নিয়ে এখন গবেষণা করছে বড়জোর শ-দুয়েক বিজ্ঞানী। আমি এই লাইনে গবেষণা করছি প্রায় ৪০ বছর…।’
‘আপনি যে বললেন, ‘আপনি…ইয়ে…মানে, কনসালট্যান্ট?’
ভদ্রলোক ভরাট গলায় নীচু পরদায় হাসলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, ম্যাগাজিনের সারকুলেশান কনসালট্যান্ট—যদিও আসলে ব্যাপারটা পুরোপুরি হিউম্যান কেমিস্ট্রি।’
আমি আর থাকতে না পেরে একটু খোঁচা দিয়েই বললাম, ‘আপনার ওই হিউম্যান কেমিস্ট্রি দিয়ে সারকুলেশান বাড়ানো যায় না কি?’
ভদ্রলোক বিন্দুমাত্রও আহত না-হয়ে জবাব দিলেন, ‘একমাত্র হিউম্যান কেমিস্ট্রি দিয়েই কোনও ম্যাগাজিনের সারকুলেশান ফিনোমিনাল জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব—ঠিক যেমনটা ”সুনন্দা” করেছে। দাঁড়ান, ব্যাপারটা আপনাকে একটু বুঝিয়ে বলি…।
‘আপনি বোধহয় জানেন না, আমাদের প্রত্যেকটা অ্যাকশন বা রিঅ্যাকশনের জন্যে আমাদের শরীরের ভেতরে নানারকম জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে যায়। যেমন ধরুন, আপনি হঠাৎ রেগে গেলেন, কিংবা ভয় পেলেন, অথবা উত্তেজিত হলেন—এইরকম প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপনার শরীরের ভেতরে ভিন্ন-ভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া হবে। এই বিক্রিয়াগুলো এতই জটিল যে, এর অনেকটাই এখনও বিজ্ঞানীদের ধরা-ছোঁওয়ার বাইরে থেকে গেছে। আমাদের শরীরে কতরকম অ্যামিনো অ্যাসিড আর প্রোটিন মলিকিউল রয়েছে। এরা আবার নানারকম কেমিক্যাল চেইন তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে সে এক মিরাকিউলাস ব্যাপার। সেইজন্যেই এর বেশিরভাগটাই রহস্য থেকে গেছে।’ একটু থেমে নতুন একটা চুরুট ধরালেন ভদ্রলোক। তারপর চুরুটে বারকয়েক টান দিয়ে জড়ানো গলায় বললেন, ‘তবে আমি এই মিস্ট্রির কিছুটা সলভ করেছি। কার্বন, হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিলে যে আমাদের শরীরের ভেতর কী করতে পারে তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।’ হেসে কথা শেষ করলেন তিনি। ধোঁয়া ছাড়লেন আয়েস করে।
ভদ্রলোকের কেমিস্ট্রির কচকচি আর চুরুটের ধোঁয়ার কটু গন্ধে আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
কনসালট্যান্ট ভদ্রলোক কয়েকবার কেশে উঠলেন। তারপর মাথা নেড়ে ঠোঁটের কোণে হেসে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এবারে আসি ট্যাকটাইল ফিডব্যাকের কথায়…।’
‘ট্যাকটাইল ফিডব্যাক?’ নিজের অজান্তেই উচ্চারণ করে ফেললাম শব্দ দুটো।
‘হ্যাঁ, ট্যাকটাইল ফিডব্যাক। মানে, আমাদের স্পর্শ অনুভূতির যে-খবর মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় তাকেই বলে ট্যাকটাইল ফিডব্যাক। এই খবর পৌঁছনোমাত্রই আমাদের শরীরের ভেতরে জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়…।’
