নভেম্বরের শেষ। এ-সময়ে কলকাতায় শীত তেমন জাঁকিয়ে না-বসলেও এদিকটায় ঠান্ডা আছে।
আমার ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে দূরপাল্লার যাত্রী কেউ ছিল না। তাই কারও সঙ্গেই তেমন করে আলাপ জমেনি। কিন্তু সন্ধের পর একটা বড়সড় ব্রিফকেস হাতে এমন একজন যাত্রী কেবিনে ঢুকলেন, যাঁর চেহারা রীতিমতো নজর কেড়ে নেয়।
ভদ্রলোকের বয়েস ষাট-বাষট্টি হবে। ফরসা স্বাস্থ্যবান শরীর। পরনে গাঢ় রঙের সুট, টাই। মাথার সামনেটা টাক পড়লেও পিছন দিকে ঘন কাঁচাপাকা বাবরি চুল। কপালে সমান্তরাল কয়েকটা ভাঁজ। চোখে কালো চওড়া ফ্রেমের চশমা। চশমার কাচ এতই পুরু যে, কয়েকটা সাদা রিঙের মতো দাগ চোখে পড়ছে।
ভদ্রলোকের পুরুষ্টু গোঁফ আর জুলপি দেখে মনে হয় এককালে মিলিটারিতে ছিলেন। মুখেও সেই ধাঁচের একটা রাশভারী ভাব। আর তীব্র চোখের নজর যেন তির বেঁধানো।
কামরায় উঠেই ভদ্রলোক একটা চুরুট ধরালেন। তারপর ব্রিফকেস খুলে একটা বই বের করে নিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলেন। বইটার নামটা অদ্ভুত বলেই আমার মনে আছে: ‘হেটেরোসাইক্লিক কেমিস্ট্রি।’
আমি ‘সুনন্দা’-র নতুন সংখ্যাটা নিয়ে চোখ বোলাচ্ছিলাম। আজই নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে ওটা কিনেছি। পত্রিকাটা কী ম্যাজিক জানে আমি বলতে পারব না। তবে লক্ষ করেছি, ম্যাগাজিনটা হাতে নিলে আমার আর ছাড়তে ইচ্ছে করে না।
ঘণ্টাখানেক পরেই কেবিনের অন্য দুজন যাত্রী নেমে গেল। ফলে কামরায় শুধু আমরা দুজন। আমার সহযাত্রী এইবার বোধহয় আমার সঙ্গে আলাপ জমাতে চাইলেন।
‘হাওড়া পর্যন্ত যাবেন বুঝি?’ ওঁর গলার স্বর বেশ ভারী। ঠোঁটের কোণে সামান্য একচিলতে হাসি।
এইভাবেই আলাপ শুরু।
কথায়-কথায় আমার ম্যাগাজিনের কথা বললাম। ব্যাগ থেকে এককপি ‘চারুলতা’ দেখিয়ে বললাম, ‘আমি এই ম্যাগানিজের সারকুলেশান ডিভিশনের চিফ।’
ভদ্রলোক কৌতুকের হাসি হেসে বললেন, ‘ম্যাগাজিনটা খুব একটা বিক্রি হচ্ছে না তো—।’
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এই ভেতরের খবরটা উনি কী করে জানতে পারলেন?
ভদ্রলোক সবজান্তা হাসি হাসলেন চাপা গলায়। তারপর বললেন, ‘না, না, অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপনি ‘চারুলতা’-র লোক হয়ে ‘সুনন্দা’ পড়ছেন, তাই বললাম—’চুরুটের ঘন ধোঁয়ায় নিজেকে ঝাপসা করে দিয়ে বললেন, ‘তা ছাড়া ম্যাগাজিন লাইনে আমারও একটু-আধটু ইন্টারেস্ট আছে।’
আমি আর কথা বাড়ালাম না। হাউসের সিক্রেট যাকে-তাকে বলা ঠিক নয়। তবে ভদ্রলোকের কথায় একটা ঠান্ডা অস্বস্তি আমার শিরদাঁড়ায় কাঁকড়াবিছের মতো হেঁটে বেড়াতে লাগল।
প্রশ্ন করে জানলাম, ভদ্রলোক পেশায় কনসালট্যান্ট। তবে ঠিক কীসের কনসালট্যান্ট তা উনি স্পষ্ট করে বললেন না। ওঁর কথায়, আচরণে, আর হাসিতে কোথায় যেন একটা রহস্য জড়িয়ে রইল। উনি আবার ওঁর কেমিস্ট্রি বইটায় মন দিলেন। আমিও ‘সুনন্দা’-র পাতায় ফিরে গেলাম।
‘সুনন্দা’-র পাতা ওলটাতে-ওলটাতে একটা গল্পে আমার চোখ আটকে গেল। আমি ভুল দেখছি না তো! গল্পের নামটা একটু রহস্যময়। কিন্তু তার প্রথম লাইন দুটো আমাকে পাথর করে দিল।
রাতের ট্রেনে দেখা হয়েছিল
সোমদত্ত সেনচৌধুরী
আপনি ‘সুনন্দা’ পত্রিকার নিয়মিত পাঠক। তাই আপনাকেই শোনাব এই বিচিত্র কাহিনি। তারপর আপনাকে একটা…
গল্পটা পড়তে-পড়তে আমি অন্য কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিলাম। হুবহু আমার কথা লিখেছেন লেখক। আমাদের হাউসের গোপন খবর কেউ কি বেনামে গল্প লিখে ফাঁস করে দিচ্ছে? সোমদত্ত সেনচৌধুরী নামটা বেশ অদ্ভুত। চারটে পদবি নিয়ে তৈরি নাম। নিশ্চয়ই কারও ছদ্মনাম। কিন্তু এই ছদ্মনামের আড়ালে কে লুকিয়ে রয়েছে?
গল্পটায় ঘটনা হুবহু একইভাবে এগিয়েছে। অন্তত সহযাত্রী ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হওয়া পর্যন্ত। তবে লেখকের পত্রিকার নাম ‘চারুলতা’ নয়, ‘কাজললতা’। এ ছাড়া সবকিছুতেই আশ্চর্য মিল। এমনকী ‘হেটেরোসাইক্লিক কেমিস্ট্রি’ পর্যন্ত।
আমি নিশি-পাওয়া মানুষের মতো গল্পটা পড়তে শুরু করলাম:
…’সুনন্দা’-র পাতা ওলটাতে-ওলটাতে কী মনে হওয়ায় ব্যাগ থেকে ‘কাজললতা’-র নতুন সংখ্যাটা বের করলাম। ‘সুনন্দা’-য় এমন কী আছে যা আমার পত্রিকায় নেই? এবারের টুরে পরের মাস থেকে সারকুলেশান কতটা বাড়বে কে জানে! যে করে হোক, আগামী ছ-মাসের মধ্যে সারকুলেশান আমাকে বাড়াতেই হবে। তা না-হলে মালিকের কাছ থেকে ‘হে বন্ধু বিদায়।’
‘সারকুলেশান কিছুতেই বাড়াতে পারছেন না, তাই না?’ ভদ্রলোকের গম্ভীর গলা মোক্ষম প্রশ্ন ছুড়ে দিল আমার দিকে।
আমি চমকে ওঁর মুখের দিকে তাকালাম।
মিলিটারি গোঁফের কোণে দুর্জ্ঞেয় হাসি। হাতের চুরুট মাপে ছোট হয়ে এলেও তার ধোঁয়ায় তেজ কমেনি।
ভদ্রলোক আমার হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে যেন বেশ মজা পেলেন। বারকয়েক মাথা নেড়ে বাবরি চুলে হাত চালিয়ে বললেন, ‘ওপর-ওপর দেখলে মনে হবে ‘সুনন্দা’-য় যা-যা আছে সবই আপনার ম্যাগাজিনে আছে। নামী-দামি লেখক, সুন্দর-সুন্দর ছবি, দামি কাগজ, ভালো ছাপা—বলতে গেলে তেমন কোনও তফাত নেই।’
আমি চটপট বারতিনেক ঘাড় নাড়লাম। কনসালট্যান্ট ভদ্রলোক ঠিক আমার মনের কথাটি বলেছেন। কিন্তু কিছু বলতে গিয়ে টের পেলাম, আমার মুখের ভেতরে জিভটা যেন গিরগিটির খসখসে লেজ। একই সঙ্গে গলা শুকিয়ে কাঠ।
