আমি উৎসাহ নিয়ে বলে উঠলাম, ‘হিউম্যান কেমিস্ট্রি!’
ভদ্রলোক বেশ জোরে হেসে উঠলেন। তারপর বললেন, ‘ঠিকই ধরেছেন। আচ্ছা, বলুন তো, কোনও কিছু টাচ করলে কী করে আপনি সেটা টের পান?’
‘কেন, চোখে দেখে।’ সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিলাম আমি।
‘উহুঁ, হল না। চোখ বুজে টাচ করলে বুঝি টের পান না?’
একটু ইতস্তত করে বললাম, ‘হ্যাঁ, পাই।’
‘শুধু তাই নয়, চোখ বুজে কোনও জিনিস ছুঁয়ে আপনি অনেক সময় এটাও বলে দিতে পারেন, জিনিসটা কী। যেমন, লোহা ছুঁলে যেরকম অনুভূতি হবে কাঠ ছুঁলে সেরকম হবে না। তেমনই কাচ, কাপড়, কিংবা কোনও মেয়ের নগ্ন শরীর—এসবের স্পর্শ অনুভূতিও একরকম নয়। এক-একরকম স্পর্শ অনুভূতির জন্যে আমাদের শরীরের ভেতরে এক-একরকম বিক্রিয়া হয়। একটা বিক্রিয়ার সঙ্গে আর একটা বিক্রিয়ার কোনও মিল নেই। দাঁড়ান, আপনাকে ব্যাপারটা একটু দেখাই…’ বলে ভদ্রলোক চুরুটে জোরালো টান দিয়ে বাঁ-হাতে নিজের ব্রিফকেসটা খুলে ফেললেন। একটা মোটাসোটা ডায়েরি বের করলেন ভেতর থেকে। অতি ব্যবহারে পাতাগুলো সেলাই কেটে খানিকটা করে বেরিয়ে এসেছে। ভদ্রলোক ডায়েরিটা খুলে সাবধানে তার পাতা ওলটাতে লাগলেন।
আমি অদ্ভুত মানুষটিকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, শেষ পর্যন্ত পাগলের পাল্লায় পড়লাম না কি! হিউম্যান কেমিস্ট্রি, ট্যাকটাইল ফিডব্যাক…আমার কপালের পাশটা দপদপ করছিল।
‘এই দেখুন—’ বলে ভদ্রলোক খোলা ডায়েরিটা আমার সামনে এগিয়ে দিলেন।
ডায়েরির দুটো পৃষ্ঠা জুড়েই নানারকম রাসায়নিক সংকেত আর সমীকরণ। তবে একটা ব্যাপার ভারি অদ্ভুত মনে হল। কেমিস্ট্রিতে আমার যেটুকু জ্ঞান, তাতে দেখেছি সবরকম রাসায়নিক সমীকরণেই শুধুমাত্র যোগচিহ্ন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভদ্রলোকের ডায়েরির খোলা পাতায় যে-সব সমীকরণ লেখা রয়েছে সে-গুলোতে উনি অকাতরে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ চিহ্ন ব্যবহার করেছেন—ঠিক সরল অঙ্কের মতো। এ-আবার কী ধরনের রাসায়নিক সমীকরণ!
ভদ্রলোক শব্দ করে ডায়েরিটা বন্ধ করে রেখে দিলেন ব্রিফকেসের ভেতরে। চুরুটে টান দিয়ে কেবিনের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এসব কেমিক্যাল ইকুয়েশন আপনি কিছুই বুঝবেন না। কারণ প্রথাগত বিজ্ঞান এখনও এই বিচিত্র বিজ্ঞানের খবর পায়নি। হিউম্যান কেমিস্ট্রির এই বিক্রিয়াগুলো আমার গত ১৮ বছরের গবেষণার ফল।
‘যাই হোক, যা বলছিলাম—’ ভদ্রলোক নড়েচড়ে বসে আমার দিকে সরাসরি তাকালেন, ‘একটা বিশেষ ধরনের ট্যাকটাইল ফিডব্যাকের জন্যে শরীরের ভেতরে একটা বিশেষ ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়। এবার যদি এমন করা যায়, আপনি ছোঁবেন একটা জিনিস অথচ আপনার শরীরের ভেতরে তার জন্যে নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিক্রিয়াটি হবে না—হবে অন্য কোনও বিক্রিয়া। যার ফলে আপনার ব্রেন আপনাকে অন্যরকম অনুভূতির খবর দেবে। তা হলে কী হবে বলুন তো?’
‘স্পর্শ অনুভূতির ব্যাপারটা তালগোল পাকিয়ে যাবে।’
‘ঠিক তাই। এবার ধরুন, আপনি একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছেন—বা ম্যাগাজিনটা স্রেফ ছুঁয়ে আছেন। অথচ যে-স্পর্শ অনুভূতি আপনার মস্তিষ্কে পৌঁছচ্ছে সেটা কাগজ ছোঁওয়ার নয়—আপনার যেন মনে হচ্ছে, আপনি আপনার প্রিয়তম নারীর নগ্ন শরীর ছুঁয়ে আছেন। তখন কী হবে?’
সারকুলেশান বাড়ানোর সঙ্গে হিউম্যান কেমিস্ট্রির সম্পর্কটা এবারে যেন আমি আঁচ করতে পারছি। তাই ভেতরে-ভেতরে উত্তেজিত হয়ে পড়লাম।
ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তরে বললাম, ‘কিন্তু আমার চোখ তো দেখবে আমি একটা ম্যাগাজিন ছুঁয়ে আছি! তা হলে—।’
আমাকে বাধা দিয়ে ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘ঠিকই বলেছেন। চোখ যে-ইনফরমেশান ব্রেনে পাঠাবে তার সঙ্গে ট্যাকটাইল ফিডব্যাকের ইনফরমেশান মিলবে না। তখন এই দুটো পরস্পরবিরোধী খবরের মধ্যে যেটা আপনার প্রিয় সেটাই আপনি মেনে নেবেন। এই কারণেই ”সুনন্দা” পত্রিকাটা আপনি কখনও কাছ-ছাড়া করতে চান না। ওটা সবসময় আপনার হাতের কাছে রাখতে ইচ্ছে করে।’
আমি হতবাক হয়ে গেলাম। বিমূঢ় চোখে আমার কোলের ওপর রাখা ‘সুনন্দা’ পত্রিকাটার দিকে তাকালাম। এটাই তা হলে ম্যাগাজিনটার গোপন ম্যাজিক!
‘ ”সুনন্দা”-র ব্যাপারটা আমি ভালো করেই জানি,’ ভদ্রলোক তখনও বলে যাচ্ছেন, ‘আমি ওদের কনসালট্যান্ট। অবশ্য এটা ওরা সিক্রেট রেখেছে। ”সুনন্দা”-র ট্যাকটাইল ফিডব্যাকের রাসায়নিক বিক্রিয়া পালটে দেওয়ার ব্যাপারটা আমার ওই হিউম্যান কেমিস্ট্রির কারিকুরি। জানি, আপনার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু যা সত্যি তাই আপনাকে বললাম…বিশ্বাস করা-না-করাটা আপনার ব্যাপার।’
‘একটা ব্যাপারে একটু খটকা লাগছে…’ একটু ইতস্তত করে আমি বললাম, ‘ট্যাকটাইল ফিডব্যাকের ইনফরমেশানটা আপনি পালটাচ্ছেন কেমন করে?’
ভদ্রলোক আমার দিকে সরাসরি চোখ রেখে মুচকি হাসলেন। চুরুটে গভীর টান দিলেন। চুরুটের ডগার আগুনটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একটু সময় নিয়ে তিনি বললেন, ‘ট্যাকটাইল ফিডব্যাক আমি চেঞ্জ করেছি পাইরোনিকিঅ্যামিনোথিলিন দিয়ে—।’
‘পাইরোনিকি…।’
আমাকে থামিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, পাইরোনিকি-অ্যামিনোথিলিন। প্রথাগত রসায়নশাস্ত্র কখনও এই কেমিক্যালটার নাম শোনেনি। এটা হিউম্যান কেমিস্ট্রির ব্যাপার…আমার ল্যাবরেটরিতে অনেক ঝঞ্ঝাট করে তৈরি। ”সুনন্দা” যে-কাগজে ছাপা হয় তার মধ্যে এই কেমিক্যাল নির্দিষ্ট পরিমাণে মিশিয়ে দেওয়া আছে। এ-ব্যাপারে পেপার মিলের সঙ্গে ব্যবস্থা করা আছে। আর যে-কালিটা ওরা ছাপার জন্যে ব্যবহার করে তার মধ্যেও মেশানো আছে ওই পাইরোনিকিঅ্যামিনোথিলিন। এটাই হল ”সুনন্দা”-র গোপন ম্যাজিক। তাই আপনাকে বলছিলাম, শুধুমাত্র ভালো লেখা, ছাপা, রংচঙ বা দামি কাগজ দিয়ে আড়াই লাখ প্লাস সারকুলেশানে পৌঁছনো যায় না—এর অন্য একটা সিক্রেট আছে। এবার তো সেই সিক্রেট আপনি জেনে গেলেন।’
