কীসের সুবিধে?
হাত নেড়ে ঘরের আধুনিক সব যন্ত্রগুলোর দিকে ইশারা করে জোয়ারদার বলল, সুবিধে হবে এটাই যে, এইসব খারাপ-খারাপ যন্ত্রগুলো আপনার ওপরে আমাকে ব্যবহার করতে হবে না।
আমি চেয়ারে বসে পড়লাম আবার। হাত-পায়ের জোর যেন হঠাৎই কমে গেছে বলে মনে হল।
জোয়ারদার বিশ্বাসকে লক্ষ্য করে বলল, বিশ্বাস, আমাদের তৈরি কমপ্যাক্ট ডিস্কটা মজুমদারবাবুকে দেখাও।
ওর কথার নিষ্ঠুর ব্যঙ্গের ছুরি যেন আমার শরীরে সত্যি-সত্যিই কেটে বসল।
বিশ্বাস ঘরের একটা যন্ত্রের কাছে গেল। সেখানে কয়েকটা বোতাম টিপতেই ঘরের সামনের দেওয়ালের একটা চৌকো মাপের অংশ আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তারপর আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়ে শুরু হল এগারো এপিসোডের টিভি সিরিয়াল। রত্না, মাধুরী, সুজাতাকে দিয়ে শুরু হয়ে শেষ হল শ্রাবন্তীকে দিয়ে। জীবন্ত ছবির সঙ্গে সেখানে তাল মিলিয়ে চলল পেশাদারি হাতে তোলা সাউন্ডট্র্যাক।
সিডি-তে জীবন্ত ছায়াছবি দেখতে-দেখতে আমার ভেতরে একটা কষ্ট টের পাচ্ছিলাম। এগারোজন তরুণীকে খুন করেছি আমি! এ আমি কী সাংঘাতিক পাপ করেছি। ছিঃ ছিঃ!
আমি রুমাল বের করে চোখের কোণ মুছে নিলাম। দেওয়ালের পরদায় তখন শ্রাবন্তীকে দেখা যাচ্ছে। ওর গলায় আঙুলের দাগ : ফরসা ত্বকে কালচে ছোপ।
সিনেমা চলার সময় জোয়ারদার নিজের মতো করে বাড়তি ধারাবিবরণী দিচ্ছিল। আর একইসঙ্গে অদ্ভুত-অদ্ভুত নজরে আমাকে লক্ষ করছিল।
প্রায় ঘণ্টাদেড়েক পর সিরিয়াল শেষ হলে জোয়ারদার বিশ্বাসকে সিডি প্লেয়ারের সুইচ অফ করে দিতে বলল। তারপর আমার চোখে সরাসরি তাকিয়ে গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, বলুন, মিস্টার মজুমদার…কী ঠিক করলেন?
আপনি আসল খুনিকে ধরতে না পেরে শুধু-শুধু আমার মতো একজন ইনোসেন্ট সিটিজেনকে হ্যারাস করছেন। আমি হোমিসাইড স্কোয়াডের চিফের কাছে ব্যাপারটা রিপোর্ট করব।
কথা বলতে বলতে আমি উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। হাত তুলে জোয়ারদারকে কী একটা বলতে যাচ্ছিলাম, বর্ধন আমার বুকে সপাটে এক ধাক্কা দিয়ে আমাকে ছিটকে চেয়ারে ফেলে দিল।
অসহ্য ব্যথা, তার সঙ্গে দম আটকানো অবস্থা টের পেলাম। যন্ত্রণায় আমার মুখ কুঁচকে গেল। কাত হয়ে চেয়ারে পড়ে রইলাম আমি।
জোয়ারদার মিহি শব্দ করে হেসে বলল, আপনি আমাকে রূঢ় ব্যবহার করতে বাধ্য করছেন, মিস্টার মজুমদার। আমি নরমালি পেশেন্ট অনুযায়ী মেডিসিন দিই। ডোন্ট ফোর্স মি টু অ্যাডমিনিস্টার রাফ মেডিসিন। এখনও বলছি, আমার কথামতো কাজ করুন। তাতে আপনারই ভালো হবে…।
আমি দ্রুত ভাবতে শুরু করলাম। কী অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে ওরা? কী করে ওরা বুঝতে পারল আমিই সেই সিরিয়াল কিলার?
মিস্টার মজুমদার, লুকোচুরি করে আর লাভ নেই। এতদিন ধরে তদন্ত করেও আমরা এই খুনগুলোর কোনও কিনারা করতে পারিনি। কারণ সেরকম সলিড কোনও প্রমাণ আমাদের হাতে আসেনি। এই সিরিয়াল কিলিং নিয়ে আমাদের ডিপার্টমেন্ট একেবারে জেরবার হয়ে যাচ্ছিল। তারপর…ফরচুনেটলি…শ্রাবন্তী সেনের মার্ডারের ইনভেস্টিগেশানের সময় আমরা এই প্রথম আলো দেখতে পেলাম। আর সে-আলো গিয়ে পড়েছে আপনার দিকে…। কথা বলতে-বলতে মুচকি মুচকি হাসছিল জোয়ারদার।
আমি জোয়ারদারের কথা খুব একটা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম না। বাঁ-হাতে মাথার ঝাঁকড়া চুলের ভেতরে আঙুল চালাচ্ছিলাম। একটু পরেই আঙুলের ডগায় লুকোনো ধাতব প্লেটটা খুঁজে পেলাম। সামান্য চাপ দিয়ে প্লেটটা একপাশে সরাতেই ইলেকট্রনিক্স প্রকোষ্ঠের দরজা খুলে গেল। এর ভেতরে আছে বেশ কয়েকটা মাইক্রোচিপ। এই চিপগুলো আমার মস্তিষ্কের একটা অংশ। সতেরো বছর বয়েসে আমার মাথার গোলমাল দেখা দেয়–হয়তো ওই স্পার্ম ব্যাঙ্কের ইনফেকশানের জন্যে। তখন ডাক্তার বলেছিল, আমার মাথার গোলমালের ব্যাপারটা ভারী অদ্ভুত। ওটা সরীসৃপের মতো শীতঘুম দেয়। তারপর হঠাৎ করে জেগে উঠে বিনা নোটিশে মাথাচাড়া দেয়। সেটা ঠিকঠাক করতেই আমার ব্রেনে অপারেশন হয়েছিল। বসাতে হয়েছিল একমুঠো মাইক্রোচিপ।
তখন আমি ইলেকট্রনিক্স জানতাম না।
কিন্তু পরে ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পর, হার্ডওয়্যারে ডক্টরেট করার পর, নিজের মাথা নিয়ে আমি নিজেই মাথা ঘামিয়েছি। মাইক্রোচিপগুলোয় কিছু রদবদল করেছি। কিন্তু তাতেও যে আমি পুরোপুরি সুস্থ হইনি তার প্রমাণ শ্রাবন্তীরা।
কিন্তু শ্রাবন্তীর ব্যাপারে কী প্রমাণ পেয়েছে জোয়ারদার?
অনেক ভেবেও কোনও কূল পাচ্ছিলাম না আমি। মাঝে-মাঝে অনেক ব্যাপার আমি ভুলে যাই। তারপর হঠাৎ করেই সেগুলো আবার মনে পড়ে যায়। শ্রাবন্তীর বেলায়ও হয়তো তাই হয়েছে।
কিন্তু আমাকে কষ্ট করে সেটা আর মনে করতে হল না। জোয়ারদার আমাকে সাহায্য করল। ও ইশারা করতেই বিশ্বাস কোথা থেকে একটা পলিথিনের প্যাকেট বের করে ছুঁড়ে দিল আমার সামনে।
আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। মাথার ধাতব দরজাটা আবার বন্ধ করে দিলাম।
এই হল সেই প্রমাণ। মন্তব্য করল জোয়ারদার, অ্যাবসোলিউট প্রুফ। নিন, প্যাকেটটা খুলুন–খুলে দেখুন।
আমি কাঁপা হাতে প্যাকেটটা টেবিল থেকে তুলে নিলাম। ওটা ধীরে-ধীরে খুলতে শুরু করলাম। কী আছে এর ভেতরে? আমার হাত এত কঁপছে কেন?
