প্যাকেট থেকে বেরিয়ে এল একগোছা চিঠি।
সেগুলো হাতে নিয়ে হতভম্বভাবে আমি জোয়ারদারের দিকে তাকালাম। হোঁচট খাওয়া গলায় কোনওরকমে বললাম, এ…এগুলো..কী?
জোয়ারদার হেসে বলল, প্রেমপত্র। শ্রাবন্তীকে লেখা আপনার প্রেমপত্র। অথচ আপনি বারবার বলছেন শ্রাবন্তী সেনকে আপনি চেনেন না।
মনে পড়েছে।
শ্রাবন্তীকে আমি বহু চিঠি লিখেছি। এর আগে কাউকে আমি কোনও প্রেমপত্র লিখিনি। কারণ আমি চাইনি পুলিশের হাতে কোনও সূত্র পৌঁছে যাক। তবে শ্রাবন্তীর বেলা আমার ভেতরে কী একটা যেন হয়ে গিয়েছিল। ওকে চিঠি না লিখে আমি পারিনি। ওকে একদিন না দেখলেই আমি চোখে অন্ধকার দেখতাম। ওকে আমি পাগলের মতো ভালোবেসে ফেলেছিলাম। কিন্তু…।
কিন্তু একদিন আমার ভেতরের অসুখটা শীতঘুম ভেঙে বেরিয়ে এল। শ্রাবন্তীর দিন ফুরোল। বেশ মনে আছে, অন্ধকার মাঠে ওর মৃতদেহ সামনে নিয়ে আমি পাগলের মতো কেঁদেছিলাম। আমার অসুখটাকে অভিশাপ দিয়েছিলাম বারবার। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি।
চিঠিগুলো আমি একে-একে দেখতে শুরু করলাম। আমার সুন্দর হাতের লেখায় আঁকা এক একটি চিঠি–ভালোবাসার চিঠি। চিঠির শেষে আমার নাম লেখা। চিঠিগুলোর কথা আমি একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম।
ওরা তা হলে শুরু থেকেই এগুলোর কথা বলতে চাইছিল। মারাত্মক প্রমাণ! অকাট্য প্রমাণ। অ্যাবসোলিউট প্রুফ!
হাসি পেয়ে গেল আমার। হোমিসাইড স্কোয়াড এখনও আমাকে ততটা চিনতে পারেনি। চিনতে পারলে জোয়ারদারবাবু একেবারে তাজ্জব হয়ে যাবে।
আমার ঠোঁটের এক চিলতে হাসি বোধহয় জোয়ারদারের নজরে পড়েছিল। ও খানিকটা বাঁকা সুরে জিগ্যেস করল, কী, এবার শ্রাবন্তী সেনকে মনে পড়েছে তো! নাকি এখনও বলবেন এই চিঠিগুলো আপনার লেখা নয়?
অতিচালাক গোয়েন্দার চোখে সরাসরি তাকিয়ে আমি হেসে বললাম, ঠিকই ধরেছেন। শ্রাবন্তী সেনকে আমি চিনি না। আর এই চিঠিগুলোও আমার লেখা নয়।
চিঠির শেষে আপনার নাম আছে।
কলকাতা শহরে আমি একাই অমিত নই। ভালো করে খোঁজ নিন, শ্রাবন্তী কোন্ অমিতের সঙ্গে প্রেম করত।
আমার আত্মবিশ্বাস জোয়ারদারকে একটা ধাক্কা দিল। কিন্তু পেশাদার হওয়ার জন্যেই কয়েক লহমায় সেটা সামলে নিয়ে ও বলল, ঠিক আছে, সোজা আঙুলে যখন ঘি উঠবে না তখন আঙুল একটু-আধটু বাঁকাতেই হবে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল জোয়ারদার ও এর মধ্যে যে-কোনও একটা চিঠি আপনি বেছে নিন, মিস্টার মজুমদার।
আমি কথা না বাড়িয়ে দু-পৃষ্ঠার একটা চিঠি বেছে নিলাম। বাকি চিঠিগুলো রেখে দিলাম টেবিলের ওপরে।
সামনে আঙুল তুলে আমার পিছনে দাঁড়ানো বর্ধনকে নির্দেশ দিল জোয়ারদার, বর্ধন, ওঁকে কাগজ-কলম দাও।
বর্ধন যন্ত্রের মতো নিঃশব্দে এবং ক্ষিপ্রতায় কাগজ-কলম আমার সামনে এনে দিল।
টেবিলের ওপাশে পায়চারি করতে করতে জোয়ারদার বলল, মিস্টার মজুমদার, ওই চিঠিটা আপনি চারমিনিটের মধ্যে কপি করে দিন। তারপর প্যাটার্ন কমপেয়ারেটরে চিঠি দুটো দিয়ে আমরা দেখে নেব দুটো হাতের লেখায় শতকরা কতটা মিল, আর কতটাই বা গরমিল।
আমি ভয় পেলাম। এখনই এখানে বসে চিঠিটা কপি করতে হবে এটা আঁচ করতে পারিনি। আমার ধারণা ছিল, ওরা পরে কোনওসময় আমার ফ্ল্যাট সার্চ করে আমার হাতের লেখার স্যাল নিয়ে এসে এই চিঠির সঙ্গে তুলনা করে দেখবে।
জোয়ারদারকে বললাম, আমার আঙুলে ব্যথা আছে। এখন লিখতে আমার অসুবিধে আছে।
পায়চারি করতে করতে থমকে দাঁড়াল জোয়ারদার, হিসহিস করে হেসে উঠে বলল, আই গট য়ু, ম্যান। আমাকে চালাকিতে ফঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। এখনও বলছি, মিস্টার মজুমদার, আপনি কনফেস করুন, তা হলে শুধু-শুধু আপনাকে আর টরচার করব না। নাউ, কাম অন–।
আপনি আমার কথা বুঝতে পারেননি, মিস্টার জোয়ারদার– আমি একরোখা গলায় জবাব দিলাম, আমি বলেছি, আজ এখন আমার লিখতে অসুবিধে আছে। আশা করি কাল-পরশুর মধ্যে আমার আঙুলের ব্যথা সেরে যাবে–তখন আপনি যা বলবেন তা-ই লিখে দেব–নো প্রবলেম।
জোয়ারদার গুম হয়ে গেল। একটু আগেই ওর চোখে-মুখে যে-হিংস্র উল্লাস ফুটে উঠেছিল তা স্তিমিত হয়ে গেল পলকে।
আমি জানি, আমার জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিটি মুহূর্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিয়ো রেকর্ডিং করে নেওয়া হচ্ছে। হাতের লেখা মিলিয়ে দেখার বর্তমান আইন অনুসারে জোয়ারদার আমাকে এখনই লেখার জন্যে বাধ্য করতে পারে না। আমি লিখতে গররাজি হলে অন্য কথা। কিন্তু আমি শুধু দু একদিন সময় চেয়েছি।
আসলে দু-একদিন নয়, আড়ালে দশমিনিট সময় পেলেই আমার কাজ হয়ে যাবে। আমারই ভুল। চিঠিগুলোর কথা আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। অবশ্য বিকল্প পথ জানা আছে বলেই বোধহয় ব্যাপারটা আমি তেমন গুরুত্ব দিইনি।
আপনি তা হলে এখন লিখবেন না?
না–আমার আঙুলে ব্যথা।
কাল সন্ধেবেলা কি আপনার অসুবিধে হবে?
মোটেই না। কখন আসতে হবে বলুন।
রাত আটটার সময় বিশ্বাস আর বর্ধন আপনাকে নিয়ে আসবে। বাট ডোন্ট ট্রাই এনি মাঙ্কি ট্রিক। চালাকি ধরে ফেলা আমার হবি, মিস্টার মজুমদার।
আমি হাসলাম, বললাম, আপনি মিছিমিছি আমাকে সন্দেহ করছেন, জোয়ারদারবাবু। তা ছাড়া আমি জানি, চালাকি করে আপনার সঙ্গে পারব না।
জোয়ারদারের চোখ ছোট হল, চোয়ালের রেখা স্পষ্ট হল। বুঝতে পারলাম, আমার জোয়ারদারবাবু বলার ঢঙটা ওর পছন্দ হয়নি।
