রাত বেড়েছে, তাই লোকজন কম চোখে পড়ল। আমি বর্ধনের দিকে তাকাতেই সে বলল, আমাদের সঙ্গে আসুন।
বিশ্বাস ওর বাঁ কানের সোনার রিংটা নাড়াচড়া করছিল, আমার চোখে চোখ পড়তেই বাঁকা হাসল।
আমরা তিনজনে দ্বিতীয় বাড়িটার দিকে এগোলাম। শানবাঁধানো চাতালে আমাদের জুতোর শব্দ ফোয়ারার বাজনার সঙ্গে মিশে গেল।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে দুটো ভয়েস লক দরজা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম অটোমেটিক এলিভেটরের কাছে। এলিভেটর আমাদের নিয়ে গেল এগারোতলায়। সেখানে আধুনিক ছাঁদে তৈরি গোলকধাঁধার মতো গোটাপাঁচেক অলিন্দ পেরিয়ে পৌঁছোলাম একটা ঘরে। ঘরের দরজায় লাগানো লাল রঙের ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে জানিয়ে দিচ্ছে ঘরটার নাম : ইন্টারোগেশান রুম।
ঘরের চারদিকে অসংখ্য অচেনা যন্ত্রপাতি। তার মাঝে ন্যাড়া মাথা, পরনে কালো চামড়ার জ্যাকেট, কুতকুতে চোখ, আর ফরসা চেহারার যে-মানুষটি বসে আছে, তাকেও প্রথমটায় যন্ত্র বলে ভুল হল আমার।
আসুন, মিস্টার মজুমদার…বেশিক্ষণ আপনাকে আটকে রাখব না। শঙ্খচূড় সাপ যদি কথা বলতে পারত তা হলে সে বোধহয় এইভাবেই কথা বলত। কথাটা বলে যন্ত্রের চেহারার মানুষটি হাসল। হাসি মানে তার ঠোঁটের রেখা সামান্য চওড়া হল, দু-একটা ভাঁজ পড়ল ঠোঁটের কোণে।
বিশ্বাস আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে চাপা গলায় বলল, এখন আপনি জোয়ারদারসাহেবের প্রপার্টি। এ-ঘরে ঢোকার আগে আর পরে মানুষ একরকম থাকে না। আমরা দুজন স্রেফ সাক্ষীগোপাল হয়ে ওঁর গান অনুযায়ী তাল দেব।
ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উষ্ণতাকে বোধহয় দশ-বারো ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছে দিয়ে থাকবে, কারণ আমার বেশ শীত করছিল।
জোয়ারদার তীক্ষ্ণ চোখে আমাকে জরিপ করতে করতে বলল, বসুন।
একটা আধুনিক টেবিলকে মাঝখানে রেখে আমি জোয়ারদারের মুখোমুখি বসলাম। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে টের পেলাম, বিশ্বাস আর বর্ধন আমার ঠিক পেছনে অ্যাটেনশান হয়ে দাঁড়িয়ে।
জোয়ারদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের ডানদিক ঘেঁষে রাখা একটা কম্পিউটারের কয়েকটা বোতাম টিপল। চোখ সরু করে মনিটরে কী দেখল কে জানে! তারপর সাপের মতো কেবল লাগানো একটা মাউথপিসের মতো যন্ত্র কম্পিউটারের পাশ থেকে তুলে নিয়ে বলল, বর্ধন, ওঁকে স্ক্যান করো।
বর্ধন চট করে চলে গেল জোয়ারদারের পাশে। ওর হাত থেকে মাউথপিসটা নিয়ে আমার কাছে এল। তারপর আমার বাঁ-হাতের কবজির ওপর যন্ত্রটা না ছুঁইয়ে বুলিয়ে নিল। জোয়ারদার তখনও ঠান্ডা চোখে কম্পিউটারের পরদার দিকে তাকিয়ে।
এখনকার রেওয়াজ অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের বাঁ-হাতের কবজিতে একটা করে পারসোনাল ইনফরমেশান মাইক্রোচিপ বসানো থাকে। সেটা বাইরে থেকে দেখা যায় না। তবে স্ক্যানার দিয়ে স্ক্যান করলে তার যাবতীয় তথ্য কম্পিউটারের পরদায় ফুটে ওঠে। আমারও উঠল।
জোয়ারদার যেন একটু অবাক হয়েই জিগ্যেস করল, মিস্টার মজুমদার, কিড স্ট্রিট ব্রাঞ্চের স্পার্ম ব্যাঙ্কে সেভেন্টি এইটে আপনার জন্ম?
আমার জন্মতারিখ ২২ জানুয়ারি ২০৭৮ সাল। আর স্পার্ম ব্যাঙ্কে, মানে, ল্যাবরেটরিতে জন্ম হওয়াটা প্রায় ষাট বছর হল স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সুতরাং জোয়ারদারের প্রশ্নের মানে বুঝতে পারলাম না। তবুও শান্তভাবে জবাব দিলাম, হ্যাঁ।
ইন্টারেস্টিং। থুতনিতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল জোয়ারদার। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও যখন দেখল আমি কোনও কথা বললাম না তখন টিভিতে খবর পড়ার মতো নিপ্রাণ ভঙ্গিতে বলল, সেভেন্টি এইটে কিড স্ট্রিটের ব্রাঞ্চে একটা ইনফেকশানের ব্যাপার হয়েছিল। ফলে সে-বছর ওই ব্যাঙ্ক থেকে প্রচুর অ্যাবনরমাল বেবির জন্ম হয়েছিল।
আপনি কি বলতে চান আমি অ্যাবনরম্যাল?
জোয়ারদার ঘাড় কাত করে ভুরু উঁচিয়ে আমাকে দেখল, তারপর চেয়ারে বসে পড়ল ও না, না–আপনি অ্যাবনরমাল হবেন কেন! কিন্তু গত চারমাস ধরে যে-সিরিয়াল কিলার কলকাতার আনাচেকানাচ ঘুরে বেড়াচ্ছে সে যে অ্যাবনরমাল সেটা তো মানবেন।
একটা খুন-পাগল মানুষ অস্বাভাবিক হবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমার মধ্যে তো সেরকম কোনও অস্বাভাবিক ব্যাপার নেই। শুধু মাঝে-মাঝে যা একটু ওই মেয়েগুলোকে খতম করতে ইচ্ছে করে।
সিরিয়াল কিলারের অ্যাবনরমাল হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। জোয়ারদারের কথার উত্তর দিলাম।
হাসল জোয়ারদার, বলল, তা হলে তার জন্ম আটাত্তর সালে হতেও পারে। যখন কিড স্ট্রিটের স্পার্ম ব্যাঙ্কে ওই ইনফেকশানের ব্যাপারটা হয়েছিল…।
আপনি কী বলতে চান স্পষ্ট করে বলুন জোয়ারদারের হাসির ধরনটা আমার মাথার ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল।
সেটা বোধহয় জোয়ারদার বুঝতে পারল। তাই আরও নোংরাভাবে হেসে শক্ত গলায় বলল, আমি যা বলতে চাই বেশ স্পষ্ট করেই বলেছি। অন্তত আপনার না বোঝার কথা নয়। এখন আপনার স্পষ্ট উত্তর দেওয়ার পালা। আপনি শুধু স্বীকার করুন যে, শ্রাবন্তী সেনকে আপনি চিনতেন।
আমি বিদ্রোহী ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। বর্ধন আর বিশ্বাসের দিকে একপলক তাকিয়ে জোয়ারদারকে বললাম, আমি শ্রাবন্তী সেনকে চিনি না। একটু আগেই ওঁদের সে কথা বলেছি। আপনাদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।
বসুন, মিস্টার মজুমদার, অযথা উত্তেজিত হবেন না। হম্বিতম্বি করে একটু-আধটু রাগ দেখালেই আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। আপনি যে মিস সেনকে চিনতেন তার মারাত্মক প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। কলকাতার সিরিয়াল কিলারকে ধরার চেষ্টাটা আমি সেখান থেকেই শুরু করতে চাই। আপনি নিজে থেকে সবকিছু বলে আমাকে সাহায্য করলে আপনারও সুবিধে হবে।
