কথা বলতে-বলতে বিছানায় উঠে বসল নবনীতা। অবাধ্য চুলগুলোকে মাথার এক মনোরম ঝাঁকুনিতে পিঠের দিকে ফেরত পাঠাল। তারপর তেরছা চোখে তাকিয়ে রইল ইন্দ্রজিতের দিকে—যেন একটু আগের প্রশ্নটার জন্য অপেক্ষা করছে।
‘ধর্ম-টর্ম কিংবা দেবতা নিয়ে আমার তেমন একটা চর্চা নেই, ম্যাডাম। আমার কারবার অধর্ম আর শয়তান নিয়ে। বাট আই ডু লাভ ইট।’
‘ও—’ করে অদ্ভুত এক শব্দ করল নবনীতা। বসে-বসেই শরীরটাকে লাট্টুর মতো ঘুরিয়ে পা দুটো বিছানার বাইরে ঝুলিয়ে দিল। ভুরু কপালে তুলে প্রশংসার ঢঙে বলল, ‘স্মার্ট! স্মার্ট! আই ডু লাভ ইট। বিউটি আর ব্রেইন একই শরীরে…উঃ, ভাবা যায় না!’
দেওয়ালে নবনীতার অনেকগুলো ফটোগ্রাফ পোস্টারের মতো করে লাগানো ছিল। তাতে নবনীতাকে নানান পোশাকে দেখা যাচ্ছে। পোশাকগুলোর বেশিরভাগই বিদেশের সি-বিচে মানানসই।
অবশ্য নবনীতার এখনকার পোশাকটাও অনেকটা সেই ধরনের। পোশাকটা ম্যাক্সিগোছের, তবে গোড়ালি পর্যন্ত নয়। হালকা নীল আর সাদা জমিতে সুতোর কাজ করা। কাপড়টা এমনই স্বচ্ছ যে, বোঝা যাচ্ছে নবনীতা অন্তর্বাস পরেছে।
‘বলুন, মিস্টার, ডিটেকটিভ, আমার কাছ থেকে ডিটেইলে কী জানতে চান?’ ঠোঁট উলটে বলল নবনীতা। একটু থেমে তারপর: ‘ওই চেয়ারটায় বসতে পারেন—’ ইশারায় হাততিনেক দূরের একটা চেয়ার দেখাল ‘…অথবা এইখানটায় বসতে পারেন।’ বিছানায় ঠিক ওর পাশটায় আলতো চাপড় মারল নবনীতা। তারপর খিলখিল করে জলতরঙ্গ শুনিয়ে দিল।
ইন্দ্রজিৎ বখে-যাওয়া মেয়েটাকে একপলক দেখল। তারপর চেয়ারটায় গিয়ে বসল।
‘আপনি মডেলিং করেন?’
বিছানায় বসে পা দোলাচ্ছিল নবনীতা। পা দোলানো থেমে গেল: ‘কেন, আপনার আপত্তি আছে?’
হাসল ইন্দ্রজিৎ: ‘কেউ নিজের ইচ্ছায় উচ্ছন্নে গেলে আমার আপত্তি করার কী আছে!’
‘উচ্ছন্নে! কী বলতে চান আপনি! জানেন ফ্যাশান টি-ভি চ্যানেলে আমাকে দেখিয়েছে!’
‘বুঝেছি—আপনি নিজেকে ভীষণ দেখাতে চান। কিন্তু কেউ যদি দেখতে না-চায়?’
রাগে থমথম করছিল নবনীতার মুখ। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত ছুড়ে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, ওকে ইশারায় থামতে বলল ইন্দ্রজিৎ। তারপর: ‘ধীরে, ম্যাডাম, ধীরে। আমি আপনার বড়দা বা ছোড়দা নই। আর, বড়লোক হলেই কি অসভ্য হতে হবে!’
নবনীতার ভেতরটা কিছু একটা করার জন্য নিশপিশ করছিল। ওর চোখে আগুন জ্বলছিল। আক্রোশ-ভরা চোখে ইন্দ্রজিৎকে দেখছিল ও।
‘আপনার বাবাকে কিডন্যাপ করার পেছনে কার হাত আছে বলে মনে হয়?’ শান্ত গলায় জিগ্যেস করল ইন্দ্রজিৎ।
নবনীতা রাগে গুম করে ছিল। কাটা-কাটা জবাব দিল ‘জানি না।’
‘আপনার ছোড়দা বলছিলেন যে, মহেন্দ্রবাবুর হাত থাকলেও থাকতে পারে—।’
‘হুঁঃ! ছোড়দা পুরুষ না কি! শুধু অন্যদের হিংসে করে। নিজের ইমপোটেন্সি ঢাকতে অন্যের নামে কাদা ছেটায়।’
‘অনিমেষবাবু কেমন লোক?’
‘খুব ভালো—’ ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল নবনীতা, ‘শুধু বাবার ঠিক উলটো। ওই লোকটা যে সত্যি-সত্যি সবকিছুর মালিক সেটা ওর কথাবার্তায় বোঝা যায়। এক নম্বরের কঞ্জুস! সবসময় পুজো-আর্চ্চা নিয়ে থাকার ভান করে, গেরুয়া পাঞ্জাবি পরে—বলে, ওটা নাকি খুব পবিত্র রং। আসলে পুরোটাই ঢং।’
ইন্দ্রজিৎ মনে-মনে সবকিছু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল।
অনিমেষ সরকারের ওপরে তিন ভাই-বোনের রাগ থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ, শুনে যতদূর মনে হচ্ছে, কড়া ধাতের কঞ্জুষ মানুষ কখনও স্নেহকাতর পিতার বিকল্প হতে পারে না। সুতরাং জিতেন্দ্রনাথকে ফিরিয়ে আনাটা দারুণ জরুরি। কিন্তু তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন? বিছানার চাদরের ওই রক্তের দাগ বলতে চাইছে কিডন্যাপাররা নিষ্ঠুর, হিংস্র। কিন্তু ওই রক্ত কি সত্যিই জিতেন্দ্রনাথের? নাকি অন্য কারও? ল্যাব রিপোর্ট পাওয়ার আগে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
‘অনিমেষ সরকার কি এ-বাড়িতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছেন?’ ইন্দ্রজিৎ জানতে চাইল।
‘মানিয়ে নেওয়ার আর কী আছে!’ হাত উলটে জবাব দিল নবনীতা, ‘উনিই প্রায় সবকিছুর মালিক। দিব্যি খাচ্ছেন-দাচ্ছেন-ঘুরছেন, এনজয় করছেন—আর আমাদের তেষ্টার ছটফটানি দেখছেন। বিনাপয়সার সার্কাস।’
ইন্দ্রজিৎ বিদায় নিতে যাচ্ছিল—হঠাৎই একতলার ড্রইং-ডাইনিং স্পেস থেকে প্রবল ধমকানির চিৎকার ওর কানে এসে ঢুকল।
ভরাট গলায় কেউ চিৎকার করে বলছে, ‘ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী আমাদের বাড়িতে এসেছেন চারটের সময়—আর এখন প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। অথচ তোমরা কেউ আমাকে খবরটা দেওয়ার দরকার মনে করোনি! মহেন্দ্র, জিতেনের কাছে আগেই শুনেছিলাম তুমি একটু স্টুপিড টাইপের। এখন দেখছি ও ঠিকই বলেছে। কমনসেন্স বলেও তোমার কিছু নেই। তোমার কাছে সেন্সের মানে একটাই: ননসেন্স।’
ইন্দ্রজিৎ বারান্দায় চলে এল। সেখান থেকেই পাখির চোখে দৃশ্যটা দেখতে পেল।
জিনি আর দশরথের সোফার কাছাকাছি একটা জটলা মতন। সেখানে মহেন্দ্র, পরান এবং আরও একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে।
ইন্দ্রজিৎ লক্ষ করল, নবনীতা দরজা ফাঁক করে নীচের তলার ঘটনা দেখতে চেষ্টা করছে।
ইন্দ্রজিৎ তরতর করে সিঁড়ি নামতে লাগল। নামতে-নামতেই কথাবার্তাগুলো ওর কানে আসছিল।
মহেন্দ্র মিনমিন করে বলছিলেন, ‘না…মানে…আপনি বাড়িতে নেই। কী করে খবর দেব ঠিক বুঝতে…।’
