‘অফ কোর্স!’
‘আমার মনে হয় এটা দাদার কাজ!’
ইন্দ্রজিৎ চমকে উঠল। সুরেন্দ্রকে এমনিতে দেখে ওর ভিতু মনে হয়েছে। সুরেন্দ্র যে ওঁর দাদার নামে এরকম অভিযোগ করতে পারেন সেটা ও কল্পনাও করেনি। মনে-মনে নিজের কানটা মুলে দিল ইন্দ্রজিৎ। একজন তুখোড় ডিটেকটিভকে সবরকম সম্ভাবনার কথা হিসেবে রাখতে হয়।
‘আপনার এরকম মনে হল কেন?’
‘দাদা নিত্যনতুন বিজনেস দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে। সেজন্যে ওর মাঝে-মাঝেই অনেক টাকার দরকার হয়। এই তো শুনলাম এখন না কি গ্লাসউলের ফ্যাক্টরি খুলবে বলে ভাবছে। আসলে দাদার ব্যবসার কোনও মাথা নেই…।’
ইন্দ্রজিৎ বাধা দিয়ে বলল, ‘যাঁর ব্যবসার মাথা নেই তাঁর কিডন্যাপিং-এ মাথা থাকবে?’
‘খুব থাকবে!’ প্রায় মুখ ভেংচে বললেন, সুরেন্দ্র, ‘হাতে টাকা পাওয়ার জন্যে দাদা মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর ব্যবসার বুদ্ধি না-থাকলে কি কারও মাথায় বদমাইশি বুদ্ধি থাকতে পারে না!’
‘তাই যদি হয়, তা হলে মহেন্দ্রবাবু আমার কাছে গেলেন কেন? এতে তো ওঁরই অসুবিধে হবে—।’
‘সাধ করে কি আর গেছে! আসলে আশপাশের লোকজন পাঁচরকম কথা বলছে, তাই।’
ইন্দ্রজিৎ কিছুক্ষণ চুপ করে কী ভাবল। তারপর আচমকা বলল, ‘আপনি তো লাস্ট শনিবার জিতেনবাবুর সঙ্গে খুব তর্কাতর্কি করেছেন। গানবাজনার দল নিয়ে আপনি কোন বিদেশে যাচ্ছেন?’
সুরেন্দ্রর মুখ থেকে পলকে সব রক্ত সরে গেল।
‘কে বলেছে আপনাকে? নিশ্চয়ই পরানদা!’
সুরেন্দ্রর গলা মেয়েলি হলে কী হবে, ওঁর বুদ্ধির কোনও ঘাটতি নেই। ভাবল ইন্দ্রজিৎ।
‘যে-ই বলুক—ব্যাপারটা তো সত্যি।’
মাথা নীচু করলেন সুরেন্দ্র। কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে তাকালেন ইন্দ্রজিতের দিকে ‘বাবার কালচার বলে কিছু ছিল না। গানবাজনার লেভেলটা বাবা ঠিক বুঝত না।…মা কিন্তু এরকম ছিল না।’
‘আপনার অনেক স্বপ্ন আছে, সুরেন্দ্রবাবু।’ রবীন্দ্রনাথের ছবির দিকে তাকিয়ে বলল ইন্দ্রজিৎ, ‘স্বপ্ন সবারই থাকে—স্বপ্ন থাকাটা দোষের নয়। তবে কথাটা কী জানেন, জিতেনবাবুরও হয়তো কিছু স্বপ্ন ছিল…।’
‘সেটা আমরা তিন ভাই-বোনে চুরমার করে দিয়েছি!’ খানিকটা ক্ষোভের সঙ্গেই বললেন সুরেন্দ্র।
‘ওঁর অনেক দুঃখ-কষ্ট ছিল।’
‘দুঃখ-কষ্ট আমার নেই! আপনি জানেন, আমার এই মেয়েলি গলার জন্যে কত অপমান আমাকে ছোটবেলা থেকে সহ্য করতে হয়েছে—এখনও হয়! আমার ছোটবোন পর্যন্ত আমাকে এ-নিয়ে ব্যঙ্গ করে, খোঁটা দেয়!’
ইন্দ্রজিৎ উঠে দাঁড়াল: ‘নিশ্চয়ই এই দুঃখ-কষ্টের প্রতিবাদে আপনি জিতেনবাবুকে কিডন্যাপ করেননি?’
সুরেন্দ্রর ফরসা মুখে রক্তের ঝলক ঝাপটা মারল। কথা বলতে গিয়ে উত্তেজনায় ওঁর গলা চিরে গেল: ‘বাঃ, চমৎকার! এই না-হলে ডিটেকটিভ! আপনি বরং আমাকে অ্যারেস্ট করুন। অনিমেষকাকা বাড়িতে থাকলে আপনার এই ইনসাল্টের যোগ্য জবাব দিত। আপনার আর নবনীতার মধ্যে কোনও ডিফারেন্স নেই দেখছি!’
সুরেন্দ্রর অভিমান ইন্দ্রজিৎকে ছুঁয়ে গেল। ও বলল, ‘সরি, আমি ঠিক সিরিয়াসলি কথাটা বলিনি। এমনি ঠাট্টা করে বলছিলাম…।’
সুরেন্দ্র একটু স্বাভাবিক হলেন। দাঁত দিয়ে বারদুয়েক ঠোঁট কামড়ালেন। ইন্দ্রজিতের সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন।
‘আচ্ছা, আপনার বাবার বন্ধু অনিমেষ সরকার কি খুব কড়া ধাতের লোক?’
‘হ্যাঁ…বাবার তুলনায় তো বটেই!’
‘জিতেনবাবুর চিঠির কথা তো আপনি সব জানেন!’
‘হ্যাঁ—দাদা সবাইকে ওটা পড়ে শুনিয়েছিলেন।’
‘চিঠির কথা সব সত্যি?’
ইতস্তত করে সুরেন্দ্র বললেন, ‘প্রথমটা তো বিশ্বাস হতে চায়নি। পরে, অনিমেষকাকা আসার পর বুঝলাম, শুধু সত্যি নয়—হাড়ে-হাড়ে সত্যি। টাকা-পয়সা, কোম্পানি—সবকিছুরই কন্ট্রোল অনিমেষকাকার হাতে।’
মনে-মনে হেসে ফেলল ইন্দ্রজিৎ। সবকিছুর কন্ট্রোল হাতে থাকায় অনিমেষবাবুর ‘অনিমেষকাকা’ হয়ে উঠতে আর দেরি হয়নি। এ-দুনিয়ায় লক্ষ্মী বড় শক্তিশালী!
‘আচ্ছা, সুরেন্দ্রবাবু—থ্যাঙ্ক য়ু ফর কোঅপারেশান। পরে দরকার হলে আবার কথা বলব। আপনার ছোটবোনের ঘরটা কোনদিকে?’
অদ্ভুত চোখে ইন্দ্রজিতের দিকে তাকিয়ে বারান্দার শেষ প্রান্তের একটা ঘরের দিকে আঙুল দেখালেন সুরেন্দ্র। তারপর চাপা গলায় বললেন, ‘একটু কেয়ারফুল থাকবেন। খরচের টাকায় টান পড়ায় নীতা খুব চটে আছে। কাল ও অনিমেষকাকার কাছে টাকা চাইতে গিয়েছিল—অনিমেষকাকা স্রেফ ”না” করে দিয়েছেন। নীতা অনিমেষকাকার ওপরে একেবারে ফায়ার হয়ে আছে। বাবা ফিরে না এলে আমাদের এই দম আটকানো অবস্থা কাটবে না।’
সুরেন্দ্র ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ইন্দ্রজিৎকে বিদায় দিলেন।
ইন্দ্রজিৎ মার্বেল পাথরের বারান্দায় পা ফেলে নবনীতার ঘরের দিকে এগোল।
ঘরে ঢুকতেই এয়ারকুলারের ঠান্ডা ছোঁয়া ইন্দ্রজিৎকে জড়িয়ে ধরল। আর একইসঙ্গে হালকা পারফিউমের গন্ধ ওকে আদর করল।
ঘরে কোথাও আলতো মিউজিক বাজছিল—কিন্তু শব্দটা ঠিক কোন দিক থেকে আসছে সেটা ঠাহর করা যাচ্ছিল না।
দরজার পাল্লা ঠেলে ঢোকার সময় নক করেছিল ইন্দ্রজিৎ। আর তখনই বিছানায় শুয়ে থাকা নবনীতা ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে ছিল ইন্দ্রজিতের দিকে। সুন্দর করে হেসে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল: ‘কাম অন ইন, শালর্ক। বড়দা বলছিল আপনার নাম না কি ইন্দ্রজিৎ? তা ইন্দ্রের সঙ্গে কতটা মিল আপনার?’
