‘না-বোঝার কী আছে! তোমাদের কাছে তো আমার মোবাইল নাম্বার রয়েছে!’
আর কোনও উত্তর নেই। মহেন্দ্র মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ইন্দ্রজিৎ ওঁদের সামনে এসে দাঁড়াল। ওর খুব খারাপ লাগছিল। হয়তো মহেন্দ্রদের এরকম রুক্ষ শাসনের লাগামেই রাখা দরকার, কিন্তু তাই বলে পরানের সামনে, বাইরের গেস্টদের সামনে!
অনিমেষ সরকারকে ভালো করে দেখল ইন্দ্রজিৎ।
মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, চোখে হাই-পাওয়ার চশমা, নাকটা অস্বাভাবিক মোটা, গালে হালকা চাপদাড়ি।
পরনে, নবনীতা যেমনটি বলেছিল, গেরুয়া খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা। হাতে সাধারণ একটা লাঠি। হয়তো চলার সময় ভর দেওয়ার দরকার হয়। লাঠিটা দেখে নতুন বলে মনে হল।
ইন্দ্রজিৎ পরিচয় দিয়ে একগাল হাসতেই অনিমেষ সরকারের মুখের রুক্ষতা কেটে গেল। কপালে ফুটে ওটা বিরক্তির ভাঁজও গেল মিলিয়ে।
‘আসুন, মিস্টার চৌধুরী, আমার ঘরে আসুন। আপনাদের আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি হয়নি তো?’
ইন্দ্রজিৎ বিনীতভাবে জানাল যে, না, হয়নি। তারপর বলল, ‘আপনি ঘরে যান—ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি ওঁদের সঙ্গে দু-মিনিট কথা বলেই যাচ্ছি—’ ইশারা করে দশরথ আর জিনিকে দেখাল ইন্দ্রজিৎ।
‘ওইটা আমার ঘর—মানে, আপাতত ওখানেই আশ্রয় নিয়েছি।’ জিতেন্দ্রনাথের ঘরের লাগোয়া একটা ঘর দেখালেন অনিমেষ। তারপর লাঠিতে ভর দিয়ে সামান্য খুঁড়িয়ে হেঁটে এগোলেন সেই ঘরের দিকে।
পরান ইতস্তত পায়ে ওঁকে অনুসরণ করল।
মহেন্দ্র অপ্রস্তুতভাবে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ‘আমি আসছি’ বলে চলে গেলেন।
ইন্দ্রজিৎ জিনির পাশে সোফায় গিয়ে বসল।
‘জিনি, ভেবেছিলাম দোতলায় গিয়ে ইন্টারোগেট করার সময়েও তোমাকে সঙ্গে থাকতে বলব, তুমি নোট নেবে—কিন্তু তাতে সিচুয়েশানটা এত এমব্যারাসিং হয়ে যেত যে…’ কথা শেষ করল না ইন্দ্রজিৎ।
জিনি মুখ ভার করে বলল, ‘বসে-বসে শুধু বোর হচ্ছি। দশরথদা যত রাজ্যের ডিটেকটিভ গল্প শুনিয়ে আমাকে আরও বোর করে দিচ্ছে।’
দশরথ আমতা-আমতা করে হেসে বলল, ‘ইনভেস্টিগেশানের মূল মন্ত্রটা ওঁকে বোঝাতে চাইছিলাম।’
‘সেটা কী?’ ইন্দ্রজিৎ জানতে চাইল।
দশরথ গম্ভীরভাবে বলল, ‘ইনভেস্টিগেট, ইনভেস্টিগেট, ইনভেস্টিগেট। শুধু তদন্ত করে যাও, তা হলেই ফল মিলবে।’
ইন্দ্রজিৎ হেসে ফেলল। তারপর জিনিকে বলল, ‘কয়েকটা ইমপরট্যান্ট পয়েন্ট খুব তাড়াতাড়ি লিখে নাও। পরে হয়তো মাথা থেকে বেরিয়ে যাবে।’
জিনি নোট-প্যাড আর পেনসিল নিয়ে তৈরি হল।
ইন্দ্রজিৎ সংক্ষেপে গড়গড় করে কিছু তথ্য আর কিছু মন্তব্য বলে গেল। জিনি পেশাদারি ঢঙে সেগুলো শর্টহ্যান্ডে লিখে নিল।
দশরথ কান খাড়া করে ইন্দ্রজিতের কথাগুলো শুনতে লাগল, আর মাঝে-মাঝে বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়তে লাগল।
ডিক্টেশান দেওয়া শেষ হতেই ইন্দ্রজিৎ অনিমেষ সরকারের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
মার্বেল পাথরের মেঝেতে আলোর কুচির নকশা ছড়িয়ে ছিল। তার উৎস খুঁজতে মুখ তুলে ওপরে তাকাল ইন্দ্রজিৎ।
কাট গ্লাসের ঝাড়লণ্ঠন থেকে আলোর টুকরো নানান দিকে ঠিকরে পড়ছে।
অনিমেষ সরকারের ঘরটা মাপে ছোট, তবে ছিমছামভাবে সাজানো। ঘরের এককোণে একটা ছোট টেবিলের ওপরে পাশাপাশি শিব ও কালীর ফটো—তাতে চন্দনের টিপ লাগানো।
খাটের ওপরে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন অনিমেষ। ইন্দ্রজিৎকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন: ‘আসুন, আসুন। ওই চেয়ারটায় বসুন।’
আগে ততটা খেয়াল করেনি, কিন্তু এখন ইন্দ্রজিৎ লক্ষ করল, অনিমেষ সরকারের গলার স্বরটা কেমন যেন ফ্যাঁসফেসে।
ওঁর দেখিয়ে দেওয়া চেয়ারটায় বসল ইন্দ্রজিৎ।
‘বলুন, জিতেনের খোঁজখবরের কোনও হদিশ পাওয়া গেল?’
কপালে ভাঁজ ফেলে ইন্দ্রজিৎ বলল, ‘এখনও পর্যন্ত পাইনি। তবে কতকগুলো ব্যাপারে খুব খটকা লাগছে। কিডন্যাপাররা মুক্তিপণ চাইতে এত দেরি করছে কেন। তারপর, কিডন্যাপিংটা যেভাবে হয়েছে—মানে, বাড়িতে এসে যেভাবে ওরা জিতেন্দ্রনাথকে তুল নিয়ে গেছে, তাতে কাজটা যে খুবই রিস্কি ছিল…। আই মিন, কিডন্যাপাররা হেভি রিস্ক নিয়েছিল। জেনারালি এতটা রিস্ক ওরা নেয় না। কিন্তু নিলই যখন, তা হলে টাকা চাইতে দেরি করছে কেন? যারা এত ডেসপারেট…।’
‘ঠিকই বলেছেন। জাস্টিফায়েড পয়েন্ট। তবে ওরা হয়তো চাইছে, কটা দিন যাক—ব্যাপারটা থিতিয়ে পড়ুক, তারপর…।’
‘কী জানি!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল ইন্দ্রজিৎ: ‘ওসব যাকগে, এবারে আপনার কথা বলুন। এ-বাড়িতে কেমন লাগছে?’
‘ভালো কী করে লাগবে বলুন!’ কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা একটা টি-টেবিলে নামিয়ে রাখলেন অনিমেষ: ‘যার সঙ্গে এতদিন পর দেখা করতে এলাম সে-ই নেই। তার ওপর এরকম বাজে খবর…আমার মনটাই কেমন ডিপ্রেসড হয়ে গেছে।’
‘মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র, নবনীতা ওদের কেমন বুঝছেন?’
‘হুঁঃ!’ প্রবল বিরক্তির একটা শব্দ করলেন অনিমেষ, ‘একেবারে উচ্ছন্নে গেছে! যে-কোনও কারণেই হোক, জিতেন ওদের বড্ড লাই দিয়ে মানুষ করেছে। আমাকে ও পরপর বেশ কয়েকটা চিঠিতে ওর দুঃখের কথা লিখেছিল। লাস্ট চিঠিটা পেয়েছিলাম দিনপনেরো আগে। এই দেখুন—’ খাট ছেড়ে উঠে পড়লেন অনিমেষ। দেওয়ালের সুদৃশ্য হুকে ঝোলানো ওঁর কয়েকটা জামাকাপড়ের কাছে গেলেন। সেগুলোর পকেট হাতড়ে-হাতড়ে একটা ভাঁজ করা চিঠি বের করলেন। সেটা খুলে একবার দেখে নিয়ে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে ইন্দ্রজিতের কাছে এলেন: ‘এটা পড়ে দেখুন, তা হলেই মোটামুটি সব বুঝতে পারবেন…।’
