আমার যত ধন-সম্পত্তি, গাড়ি-বাড়ি, ফ্যাক্টরি—কোনও কিছুরই মালিকানা আমার একার নয়। আমি শতকরা মাত্র কুড়িভাগের মালিক—বাকি আশিভাগের মালিক আমার ছোটবেলার বন্ধু অনিমেষ সরকার। ওরা আরামবাগের বনেদি বড়লোক। আমার সঙ্গে ওর নিয়মিত টেলিফোনে যোগাযোগ আছে। অনিমেষ যে-কোনও মুহূর্তে এসে দলিলমাফিক ওর অংশ বুঝে নিলে আমার—এবং তোমাদের—অবস্থা হবে পথের ভিখিরির মতো। কিন্তু অনিমেষ আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। ছোটবেলায় আমরা ছিলাম হরিহর-আত্মা। তাই কখনও ও এইসব সম্পত্তিতে ওর অংশ আছে বলে ভাবেনি। ধম-কর্ম পুজো-আচ্চা নিয়েই এখন ও জীবন কাটায়। আর আমি সুখে আছি জানলেই ও সুখী।
সম্প্রতি অনিমেষকে আমি আমার মানসিক দূরবস্থার কথা জানিয়েছি। ও তাতে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। লোভকে ও ঘৃণা করে। লোভীদের আরও বেশি। আমি ওকে চিঠি দিয়ে বলেছি, এখানে এসে ওর সমস্ত সম্পত্তি বুঝে নিয়ে ও যেন আমাকে মুক্তি দেয়। ও উত্তরে আসবে বলে জানিয়েছে। যে-কোনও দিন ও এসে হাজির হতে পারে। ওকে অমান্য বা অসম্মান করার সাহস আমার নেই—আশা করি তোমরাও তা করবে না। অবশ্য ও খুব কড়া ধাতের সাত্ত্বিক মানুষ। অভব্যতা দেখলে ও সঙ্গে-সঙ্গে শাস্তি দিতে পারে। তা ছাড়া এই বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা—সবকিছুরই তো ও আশিভাগের মালিক। ভাবছি, আমার কুড়ি ভাগও ওকে লিখে দিয়ে আমি মুক্তি নেব। তোমরা হয়তো মামলা করতে চাইবে…করে দেখো,অনিমেষ তার কেমন জবাব দেয়। ও কখনও অন্যায়ের কাছে কাবু হতে শেখেনি। ওকে সব দিয়ে দিলে আমি হয়তো পথের ভিখিরি হব, কিন্তু তাতে আমার আপত্তি নেই। তার বদলে অন্তত সুখ-শান্তি তো ফিরে পাব। তাই এখন আমি অনিমেষের আসার অপেক্ষায় দিন গুনছি।
যদি আমার হঠাৎ করে কিছু হয়, তাই তোমাদের সব কথা জানিয়ে রাখলাম।
ইতি—
হতভাগ্য
জিতেন্দ্রনাথ সেন
চিঠিটা বারদুয়েক খুঁটিয়ে পড়ল ইন্দ্রজিৎ। তারপর বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন—উনি যেন জানতেন ওঁর খারাপ কিছু একটা হবে।’
‘হ্যাঁ—সেটাই তো আপনাকে বলছিলাম। চিঠিটা বাবার বেডরুমে একটা টেবিলের ওপরে পেপারওয়েট চাপা দেওয়া ছিল।’
‘আপনার বাবার একটা ফটো দেখাতে পারেন?’
‘একমিনিট। এক্ষুনি নিয়ে আসছি।’ মহেন্দ্র ফটোর জোগাড় করতে চলে গেলেন।
ইন্দ্রজিৎ দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল। সঙ্গে-সঙ্গে কানে এল মিহি গলার কেউ গান গাইছে। সুরেন্দ্র গলা সাধছেন।
শুনে হাসি পেয়ে গেল ইন্দ্রজিতের। গানের জন্য এ-গলা তৈরি হয়নি। এ-গলা তৈরি হয়েছে শুধু দেহকে মাথার সঙ্গে জুড়ে রাখার জন্য। তবে একটা ব্যাপার ইন্দ্রজিতের ভালো লাগল। সুরেন্দ্র একজন নামী গায়িকার গাওয়া গানই প্র্যাকটিস করছেন। অর্থাৎ সুরেন্দ্র গায়ক নয়, গায়িকা হওয়ারই চেষ্টা করছেন।
মহেন্দ্র একটা অ্যালবাম নিয়ে ফিরে এলেন। তার একটা পৃষ্ঠা খুলে ইন্দ্রজিৎকে দেখালেন। বছরতিনেক আগে চারদিনের ফুরসত পেয়ে জিতেন্দ্রনাথ তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে সিঙ্গাপুর বেড়াতে গিয়েছিলেন। ফটোটা সেখানেই তোলা। আলো-ঝলমলে একটা রাস্তায় জিতেন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে। পিছনে দূরে একটা বাড়ির মাথায় গ্লো-সাইনে তৈরি একটা ড্রাগনের ছবি দেখা যাচ্ছে।
জিতেন্দ্রনাথকে খুঁটিয়ে দেখল ইন্দ্রজিৎ।
লম্বা দোহারা চেহারা। মাথায় বিস্তৃত টাক—শুধু দু-কানের পাশে চুলের ঝালর। চোখে চশমা নেই। নিশ্চয়ই কনট্যাক্ট লেন্স পরেছেন। প্যান্ট-শার্ট পরা জিতেন্দ্রনাথকে বেশ সুপুরুষই দেখাচ্ছে। ইন্দ্রজিতের মনে হল, সীমন্তিনী মারা যাওয়ার পর উনি অনায়াসেই বিয়ে করতে পারতেন।
ইন্দ্রজিৎ বলল, ‘এই ফটোটা আর এই চিঠিটা—’ হাতের চিঠিটা দেখাল ইন্দ্রজিৎ, ‘আমি একটু রাখছি। কপি করে কাল বা পরশু আপনাকে ফেরত দেব।’
মহেন্দ্র রাজি হয়ে ঘাড় নাড়লেন। ফটোটা অ্যালবাম থেকে খুলে ইন্দ্রজিতের হাতে দিলেন।
‘আমি এবার আপনার ভাই-বোনের সঙ্গে একটু কথা বলব…তারপর নীচে যাচ্ছি।’
ইঙ্গিতটা ধরতে পেরে মহেন্দ্র নির্লিপ্ত মুখে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন।
ইন্দ্রজিৎ পায়ে-পায়ে সুরেন্দ্রর ঘরে গিয়ে হাজির হল।
সুরেন্দ্রর ঘরের দরজা খোলাই ছিল। এ-ঘরে এসি নেই।
বড় মাপের ঘর। ঘরের দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথ আর লতা মঙ্গেশকারের বাঁধানো ফটো ঝুলছে। এখানে-ওখানে হারমোনিয়াম, তানপুরা, তবলা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। গোটা ঘরটায় কেমন অগোছালো ভাব। শিল্পীর ঘর বোধহয় এরকমই হয়।
ঘরের ডানদিকের দেওয়াল ঘেঁষে একটা শৌখিন শো-কেস। তাতে যত রাজ্যের ক্যাসেট। আর একপাশে শিভাস রিগালের বোতল এবং চারটি নকশা-কাটা কাচের গেলাস। শো-কেসের ওপরে বসানো রয়েছে চার হাজার পি. এম. পি. ও.-র একটি সনি সাউন্ড সিস্টেম। তার স্পিকার দু-দিকের দেওয়ালে বসানো।
সুরেন্দ্র হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছিলেন। ইন্দ্রজিৎকে দেখেই গানবাজনা থামিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সৌজন্যেই হাসি হেসে বললেন, ‘আসুন—।’
মেঝেতে দামি কার্পেট পাতা ছিল। সেখানে ইন্দ্রজিতকে বসতে অনুরোধ করে সুরেন্দ্র নিজেও বসলেন।
‘আমাকে কিছু জিগ্যেস করবেন?’
‘হ্যাঁ।’ মাথার চুলে হাত বুলিয়ে নিয়ে বলল ইন্দ্রজিৎ, ‘আপনার বাবার কিডন্যাপিং সম্পর্কে আপনার কি আইডিয়া?’
একটু ইতস্তত করে সুরেন্দ্র চাপা গলায় বললেন, ‘ওপেনলি বলব?’
