একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরান বলল, ‘শনিবার দিনটা বড়বাবুর খুব খারাপ গিয়েছে। টাকার জন্যে একের-পর-এক বিড়ম্বনা। আমি ওই জানলা দিয়ে স-ব দেখেছি। প্রথমে এল ছোড়দি, তারপর ছোড়দা—আর, সবশেষে বড়দা। তিনজনের সঙ্গেই বড়বাবুর রাগারাগি হল। কিন্তু ওই রাগারাগিই সার। ছেলেমেয়ের জন্যে অন্ধ স্নেহ—কী আর করবেন! টাকা-পয়সা সব দিয়ে-থুয়ে শেষ পর্যন্ত মায়ের ওই ফটোর সামনে গিয়ে কান্নাকাটি করতে লাগলেন—’ ইশারা করে মিসেস সেনের অয়েল পেইন্টিংটার দিকে দেখাল পরান: ‘মা চলে গিয়ে বড়বাবু আরও কাবু হয়ে পড়েছেন। মা ছিলেন সত্যিকারের গৃহলক্ষ্মী। …সবই আমাদের কপাল! মা-মরা ছেলেমেয়েগুলোর একটাও মানুষ হল না। অথচ বড়বাবুর কত আশা ছিল!’
শেষ কথা দুটো বলেই জিভ কাটল পরান। অনুনয় করে বলল, ‘আমাকে মাপ করবেন, স্যার। বাড়ির কাজের লোক হয়ে অনেক আস্পর্ধার কথা বলে ফেলেছি। এসব কথা যেন বড়দা-ছোড়দারা জানতে না পারেন। আসলে দোষ তো আমারও নয়। বড়বাবুদের সঙ্গে জীবনের অনেকগুলো বছর জড়িয়ে গেছে। বড়দাদের সব আমিই কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। বড়বাবু আমার সঙ্গে কক্ষনও চাকরের মতো ব্যবহার করতেন না। বরং একা-একা দুঃখ করতেন। বলতেন, পরান, তোর মা-কে আমি কথা দিয়েছিলাম ছেলেমেয়েদের আমি মানুষ করে তুলব। তুই তো জানিস, ওদের জন্যে আমি কী পরিশ্রম করেছি—কত কষ্ট সয়েছি! কিন্তু তার ফল কী হল? শূন্য! আমার বুকটা একেবারে শূন্য হয়ে গেছে রে, পরান, শূন্য হয়ে গেছে…।’
কথাগুলো বলতে-বলতে পরানের চোখে জল এসে গিয়েছিল। পরনের গেঞ্জি দিয়ে চোখ মুছতে লাগল ও।
ইন্দ্রজিতের কাছে পারিবারিক ছবিটা ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছিল। ছেলেমেয়েদের লোভের উৎপাতে অতিষ্ঠ এক স্নেহময় ধনী পিতা। সত্যি, জিতেন্দ্রনাথের জন্য বেশ কষ্ট হয়!
‘শেষদিকটায় বড়বাবু প্রায়ই বলতেন, ওদেরকে শিক্ষা দেওয়া দরকার। উচিত শিক্ষা। যাতে ওরা স্নেহ-ভালোবাসা ভাঙিয়ে আমার কাছ থেকে আর সুযোগ নিতে না পারে। লোভ ওদের শেষ করে দিয়েছে। ওদের কাছে সম্পর্কের আর কোনও দাম নেই।’
কথা শেষ করে হতাশায় মাথা নাড়ল পরান।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ইন্দ্রজিৎ। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে, পরান—তুমি এখন যাও। এসব কথা আর কাউকে বলার দরকার নেই। যদি সে-রকম বুঝি, তা হলে তোমার সঙ্গে পরে আবার কথা বলব।’
পরান উঠে দাঁড়াল। ইন্দ্রজিৎকে নমস্কার করে ধীরে-ধীরে চলে গেল ঘর ছেড়ে।
কবজি উলটে ঘড়ি দেখল ইন্দ্রজিৎ। প্রায় ছ’টা বাজে। ঘরের কোয়ার্ৎজ ওয়াল-ক্লকটা পাঁচ মিনিট ফাস্ট। নাকি ইন্দ্রজিতেরটা পাঁচ মিনিট স্লো।
এমন সময় মহেন্দ্র সেন ঘরে এসে ঢুকলেন। স্মিত হেসে বললেন, ‘মিস্টার চৌধুরী, আসুন, একটু চায়ের ব্যবস্থা করেছি। দরকার হলে চায়ের পর আবার কাজ শুরু করবেন…।’
‘চলুন—’ বলে মহেন্দ্রকে অনুসরণ করে ড্রইং-ডাইনিং স্পেসে এসে হাজির হল ইন্দ্রজিৎ আর জিনি।
এসে দেখল দশরথ চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া শুরু করেছে।
চা খেতে-খেতে ইন্দ্রজিৎ জিতেন্দ্রনাথের একটা ফটো দেখতে চেয়েছিল। মহেন্দ্র উত্তরে বলেছেন, ‘চা শেষ করে আমার ঘরে চলুন—ফটোও দেখাব, আর চিঠিটাও দেখাব।’
সুতরাং জিনি আর দশরথকে সোফায় বসিয়ে রেখে ইন্দ্রজিৎ মহেন্দ্রর সঙ্গে দোতলায় গেলেন। জিনি তখন মুগ্ধ চোখে ঘরে নানান আসবাবপত্র দেখছে। আর দশরথ এমনভাবে ড্রইং-ডাইনিং স্পেসে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেন স্রেফ ঘ্রাণশক্তি দিয়েই সে যাবতীয় রহস্য উদঘাটন করে ফেলবে।
দোতলায় নিজের ঘরের ইন্দ্রজিৎকে বসিয়ে মহেন্দ্র একটা ডেস্কের কাছে গেলেন। একটা ভাঁজ করা চিঠি বের করে ইন্দ্রজিতের হাতে এনে দিলেন।
‘আমাদের লেখা বাবার শেষ চিঠি। হাতের লেখাটা বাবার—আমরা চেক করে দেখেছি।’
ইন্দ্রজিৎ চিঠিটা খুলে দেখল।
কাগজের দু-পিঠে কালো কালি দিয়ে লেখা। বেশ বড় চিঠি।
‘চিঠিটা পড়ে আমাদের মনে হয়েছে, বাবা যেন জানতেন উনি আর বেশিদিন নেই। এটাকে কি আপনি সিক্সথ সেন্স বলবেন?’
‘আপনার কি ধারণা জিতেনবাবু আর বেঁচে নেই?’
‘সে-রকমই তো মনে হচ্ছে। কিডন্যাপাররা যখন আর কোনও সাড়া শব্দ করছে না…।’
ইন্দ্রজিৎ হাসল: ‘যে-হাঁস সোনার ডিম পাড়ে তাকে কখনও কেউ খতম করে! হয়তো অন্য কোনও কারণে কিডন্যাপাররা চুপচাপ রয়েছে। তারপর…সময় এলে…আপনাদের ফোন করবে।’
ইন্দ্রজিৎ এবার চিঠিটা পড়তে শুরু করল। এয়ারকুলারের ঠান্ডা বাতাসে ওর বেশ শীত-শীত করছিল। মহেন্দ্রকে ওটা কমিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল।
চিঠিতে তিন ছেলেমেয়েকেই সম্বোধন করেছেন জিতেন্দ্রনাথ। তারপর লিখেছেন:
‘…পনেরো বছর আগে তোমাদের মা সীমন্তিনী যখন চলে যায় তখন আমি তাঁকে কথা দিয়েছিলাম, তোমাদের মানুষের মতো মানুষ করব। কিন্তু ব্যবসার চাপ, অন্ধ স্নেহ, আর তোমাদের লোভ আমার প্রতিজ্ঞা ছত্রখান করে দিয়েছে। এখন একা, গোপনে, তোমাদের মায়ের ছবির কাছে চোখের জল ফেলা ছাড়া আমার আর কোনও গতি নেই। ভুল আমারই—আমিই তোমাদের ঠিকমতো শাসন করতে পারিনি। আর শাসন করার পক্ষে এখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে।
পিতা হিসেবে আমি ব্যর্থ হয়েছি। তোমাদের মানসিক অত্যাচারে আমি ক্লান্ত। আমার সামনে আর কোনও পথ খোলা নেই। তাই যে-একমাত্র পথ খোলা আছে সেই পথেই আমি যাব। না, না—ভুলেও ভেব না আমি সুইসাইড করার কথা ভাবছি। আমার সেই একটিমাত্র পথ হল একটা নিষ্ঠুর গোপন কথা তোমাদের সামনে তুলে ধরা। এ-কথা জানাতে আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু এখন আর ফেরার কোনও পথ নেই। তোমরাই এই কাজে আমাকে বাধ্য করেছ।
