মহেন্দ্র চুপ করে গেলেন। দুটো হাত সামনে জড়ো করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।
ইন্দ্রজিৎ ঘরটা খুঁটিয়ে দেখা শেষ করল। একটা জানলার কাছে গিয়ে বাইরের রাস্তাটা একবার দেখল। তারপর ঘুরে তাকাল মহেন্দ্রর দিকে: ‘আপনার বাবার ওপরে কারও রাগ ছিল?’
‘মনে তো হয় না। তবে বিজনেসের ব্যাপারে কোনও জেলাসির ব্যাপার থাকলেও থাকতে পারে।’
‘হুঁ। আসলে আমি কিডন্যাপিং-এর মোটিভটা বুঝতে চাইছি। কিডন্যাপাররা এখনও টাকা চায়নি বলে আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে।’ আচ্ছা, কিডন্যাপিং-এর সময় কি ধস্তাধস্তি হয়েছিল?’
‘দোতলা থেকে আমি সেরকম কিছু টের পাইনি। তবে আপনাকে বলতে ভুলে গেছি—বাবার বিছানার চাদরে বেশ খানিকটা রক্তের দাগ ছিল।’
‘রক্তের দাগ!’ ইন্দ্রজিতের শরীরটা চাবুকের মতো টান-টান হয়ে গেল: ‘কোথায় সে চাদরটা? দেখি—।’
‘দাঁড়ান, নিয়ে আসছি—।’ বলে মহেন্দ্র চলে গেলেন।
ইন্দ্রজিৎ সিগারেট খেতে-খেতে ভাবছিল। কোটিপতি জিতেন্দ্রনাথের তিন ছেলেমেয়ে। তিনজনেই বোধহয় বড়লোকি চালে আয়েস করতে শিখেছেন। কেউই বিয়ে-থা করেননি। অথচ সবাই খরচ করতে ভালোবাসেন। বাবা কিডন্যাপড হয়েছেন বলে কারওরই তেমন দুশ্চিন্তা নেই। একমাত্র দুশ্চিন্তা খরচের টাকা পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে। নবনীতার কথাগুলো হয়তো রূঢ়, কিন্তু মনে হয় না ও একবর্ণও মিথ্যে বলেছে।
সিগারেটের শেষ-হয়ে-আসা টুকরোটা ইন্দ্রজিৎ জানলা দিয়ে ছুড়ে দিল বাইরে।
এমনসময় মহেন্দ্র চাদর নিয়ে ফিরে এলেন—সঙ্গে দশরথ ও পরান।
দশরথ ইন্দ্রজিতের কাছে এসে চাপা গলায় বলল, ‘স্যার, আমি একটু বাড়ির চারপাশটা ঘুরে দেখছিলাম—মানে, ইনভেস্টিগেট করছিলাম আর কি!’ আড়চোখে সন্দেহ এবং আশঙ্কার নজরে মহেন্দ্রকে কয়েকবার দেখল দশরথ: ‘আপনি একা একটু পরানের সঙ্গে কথা বলুন। ওর কাছে প্রচুর মেটিরিয়াল আছে। ডক্টর পঞ্চানন ঘোষাল তাঁর ”অপরাধ-বিজ্ঞান” বইতে বলেছিলেন, ইনভেস্টিগেশানে বাড়ির কাজের লোকদের রোল খুব ভাইটাল। আমি আপনার হয়ে পরানকে একটু-আধটু কোশ্চেন করছিলাম…।’
ইন্দ্রজিৎ হেসে জিগ্যেস করল, ”অপরাধ-বিজ্ঞান” তুমি পড়েছ, দশরথদা?’
‘হ্যাঁ, মানে, ছোটবেলায় অল্প-অল্প পড়েছিলাম।’
ইন্দ্রজিৎ মহেন্দ্রকে বলল, ‘মিস্টার সেন, চাদরটা দিন—।’
চাদরটা নিয়ে বিছানায় রাখল ইন্দ্রজিৎ। উলটেপালটে রক্তের দাগ লাগা জায়গাটা বের করল।
বেশ বড় একটা রক্তের ছোপ। তার খুব কাছে ছোট মাপের আরও দুটো ছোপ।
ইন্দ্রজিৎ চাদরটা ভাঁজ করে দশরথের হাতে দিল: ‘এটা সাবধানে রাখো, দশরথদা। এটা ল্যাবে পাঠাতে হবে।’
যেন লাখ টাকা দামের একটা শৌখিন কাচের গ্লাস অতি সাবধানে নাড়াচাড়া করছে, এইরকম ভঙ্গিতে চাদরটা গ্রহণ করল দশরথ। ওর কাছে এটা লাখ টাকার সূত্র।
চাদরটার দিকে মুগ্ধ অথচ সাবধানি চোখে তাকিয়ে ও জানতে চাইল, ‘আমি কি এখন যেতে পারি, স্যার?’
‘হ্যাঁ, যাও—জিনির কাছে বোসো গিয়ে।’
দড়ির ওপর পা ফেলে সন্তর্পণে হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গিতে দশরথ চলে গেল।
ইন্দ্রজিৎ মহেন্দ্রকে বলল, ‘আপনি জিতেনবাবুর লেখা একটা চিঠি আমাকে দেখাবেন বলেছিলেন। আর অনিমেষ সরকার নামে একজনের কথা বলছিলেন…অনিমেষবাবু এখন কোথায়? বাড়িতে আছেন?’
‘না, উনি একটু বেরিয়েছেন। এলে আপনাকে খবর দেব।’
‘ঠিক আছে। ও-ব্যাপারে পরে আপনার সঙ্গে কথা বলব। তার আগে পরানের সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।’
অদ্ভুত চোখে পরানের দিকে একপলক তাকিয়ে একটু দ্বিধাগ্রস্তভাবে মহেন্দ্র চলে গেলেন।
জিতেন্দ্রনাথের ঘরের ডানদিকে একটা টেবিল আর তিনটে চেয়ার পাতা ছিল। ইন্দ্রজিৎ সেখানে গিয়ে বসল—পরানকেও বসতে বলল।
লম্বা, রোগা, তোবড়ানো গাল, গালে খোঁচা-খোঁচা সাদা দাড়ি। দেখেই বোঝা যায়, পরানের ওপর দিয়ে বহু ঝড়-জল বয়ে গেছে। ওর বড়-বড় চোখ দুটোয় কেমন এক সতর্ক ছাপ ছিল।
ওর কাছে বাড়ির লোকজন সম্পর্কে জানতে চাইল ইন্দ্রজিৎ।
পরান খানিকক্ষণ ইতস্তত করে তারপর মুখ খুলল। জিতেন্দ্রনাথের তিন ছেলেমেয়ে সম্পর্কে ওর মতন করে বলল।
ছোড়দি সিনেমা-লাইনে কীসব করে। মাঝে-মাঝে টি-ভি.-র বিজ্ঞাপনে ছোড়দিকে দেখায়। দিন-রাত্তির শুধু সাজগোজ করছে আর দুনিয়ার ছেলেবন্ধুর সঙ্গে রাত-বিরেতে বাড়ি ফিরছে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায়। অকে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। প্রত্যেকবারই বড়বাবু টাকা দিয়ে ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট সামলেছে। ছোড়দির ছোট-বড় জ্ঞান নেই। যখন যা মুখে আসে বলে দেয়। বড়বাবুকে দিন-রাত টাকার জন্য বিরক্ত করত। এখন বড়বাবু নেই—তাই জোঁকের মুখে নুন পড়েছে। তা ছাড়া বড়বাবুর বন্ধু অনিমেষবাবু দারুণ কড়া ধাতের মানুষ। এখন ওনার দাপটে তিন ভাই-বোন সবসময় কাঁচুমাচু হয়ে থাকে।
ছোড়দা গানবাজনা নিয়ে থাকে। প্রায়ই বাড়িতে গানবাজনার আসর বসিয়ে কান ঝালাপালা করে দেয়। বড়বাবু অনেকদিন বারণ করেছে, কিন্তু ছোড়দা তাতে কান দেয়নি। বরং নানান জলসার জন্য বড়বাবুর কাছে টাকা চাইত। শুনছিলাম, কী একটা ব্যবস্থা করে নাকি তিরিশজনের দল নিয়ে ফরেনে গানবাজনা করতে যাবে। তার জন্য গত শনিবার বড়বাবুর কাছে টাকা চাইছিল। আর ছোড়দা ছোড়দির চেয়ে বড় হলেও ছোড়দিকে বেশ ভয় পায়।
বড়দা মহেন্দ্র এমনিতে খুব ভদ্র। তবে ব্যবসা করার একটা রোগ আছে। সেই কোন বয়েস থেকেই জেদ ধরেছে বাবার ব্যবসা নয়—সে নিজের হাতে গড়া ব্যবসাকে বড় করে তুলবে। বড়বাবু বহুবার বারণ করেছে, কিন্তু বড়দা নিজের জেদ থেকে সরেনি। অথচ প্রতিবারই নতুন-নতুন ব্যবসা ফাঁদার জন্য বড়বাবুর কাছ থেকে টাকা চাইতেন। বড়বাবু প্রথমটা রাগারাগি করতেন বটে, কিন্তু শেষমেষ টাকা দিয়ে দিতেন। এই তো, গত শনিবারই বড়বাবুর সঙ্গে বড়দার কথা কাটাকাটি হয়ে গেল—ওই টাকা নিয়েই।
