মহেন্দ্র সেন আলাপ করিয়ে দিলেন।
‘আমার ছোট ভাই, সুরেন—আর বোন, নবনীতা। ইনি ডিটেকটিভ ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী। বাবার কিডন্যাপিং-এর ব্যাপারে আমি ওঁর হেল্প চেয়েছি। তোদের তো আগেই বলেছিলাম…।’
নবনীতা হঠাৎই খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে ওর উদ্ধত শরীরে নানারকম ভাঙচুর হতে লাগল।
অনেকক্ষণ পর হাসি থামিয়ে বেশ কষ্ট করে ও বলল, ‘বড়দা, তোমার এই গুডি-গুডি ইমেজটা এবার ছাড়ো তো! ভেতরে-ভেতরে তো আমাদেরই মতো তেষ্টায় মরে যাচ্ছ। অথচ মুখে একটা বেড়াল-তপস্বীগোছের ভাব ফুটিয়ে রেখেছ। নাঃ, সিনেমা-লাইনটাই তোমার আসল লাইন ছিল। কেন যে ফর নাথিং একটার-পর-একটা নতুন-নতুন বিজনেস ট্রাই করে যাচ্ছ কে জানে!’
‘নীতা! ইন্দ্রজিৎবাবু আমাদের গেস্ট। ওঁর সামনে তুমি কিন্তু লিমিট ছাড়িয়ে যাচ্ছ! বাবা এখন কীরকম কষ্টের মধ্যে কী অবস্থায় আছে কিছুই জানি না। যে করে হোক বাবাকে ফিরিয়ে আনা আমাদের প্রথম কর্তব্য—।’
‘কর্তব্য!’ আবার একদফা কাচের-চুড়ি-ভাঙা হাসি। সে-হাসির মধ্যে শঙ্খচূড়ের বিষ ছিল। তারপর হাসি থামতেই: ‘জানি, বড়দা, আসল কথাটা বলতে তোমার ভদ্রতায় আটকাচ্ছে। ও. কে., আমি বলে দিচ্ছি—’ ইন্দ্রজিতের দিকে ঘুরল নবনীতা: ‘ওয়েল মিস্টার শার্লক হোমস, আসল ঘটনা হল বাবাকে আমাদের খুব তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে আনা দরকার। নইলে টাকার তেষ্টায় আমরা মরে যাব—তিনজনেই—বড়দা, ছোড়দা, এবং আমি। বাবা ছাড়া আমাদের টাকার জোগান দেবে কে! কী ছোড়দা, কিছু ভুল বলছি?’ সুরেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে নবনীতা জানতে চাইল। তারপর আবার ইন্দ্রজিৎকে লক্ষ করে: ‘পুলিশের ওপরে আমাদের কনফিডেন্স নেই—তাই প্রাইভেট ডিটেকটিভ। এবার দেখুন চেষ্টা করে, বাবাকে ফিরিয়ে আনতে পারেন কি না! তবে যা করার চটপট করুন—নইলে আমাদের যা ড্রাই অবস্থা! মরুভূমির চেয়েও খারাপ…।’
ইন্দ্রজিৎ বেশ খুঁটিয়ে নবনীতাকে দেখছিল। জিনিও। তবে ও বোধহয় নবনীতার সাজগোজ লক্ষ করছিল।
নবনীতার ফরসা সুন্দর চেহারা। টানা-টানা চোখ, শ্যাম্পু করা চুল। চোখের কোলে অল্পবিস্তর দ্রুত জীবনযাপনের ছাপ। পরনে দামি চুড়িদার। গলায় সোনার চেন, কানে সাদা পাথর বসানো দুল—বোধহয় হিরেই হবে। এইসব জাতের বড়লোকেরা কখনও নকল গয়না পরে না। শুধু নকল জীবনের পিছনে ছোটে।
‘ম্যাডাম, আপনার সঙ্গে আমি পরে ডিটেইলে কথা বলব। আগে জিতেনবাবুর ঘরটা একবার দেখে নিই।’
ইন্দ্রজিতের কথার উত্তরে সুন্দর করে হাসল নবনীতা। বলল, ‘আপনার সঙ্গে ডি-টে-ই-লে কথা বলতে আমার বেশ ভালো লাগবে। য়ু লুক স্মার্ট। আপনাকে ডিটেকটিভ হিসেবে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। টা-টা…।’ হাত তুলে আঙুল নাড়ল নবনীতা: ‘আমি দোতলায় আছি—দরকার হলেই ডাকবেন। আই উড লাভ টু কাম।’
মহেন্দ্র মুখ-চোখ লাল করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। নবনীতা চলে যাওয়ার পর চাপা গলায় শুধু বললেন, ‘অসভ্য! মডেলিং-এর লাইনে আর কত ভদ্রতা শিখবে! অথচ ওকে নিয়ে মায়ের অনেক আশা ছিল…।’
‘আপনাদের মা-কে দেখছি না—।’ ইন্দ্রজিৎ বলল।
‘আমাদের মা নেই। প্রায় পনেরো বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’
সুরেন্দ্র এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এখন একটু ফাঁক পেয়ে বললেন, ‘আমাকে কি এখন থাকতে হবে, ইন্দ্রজিৎবাবু?
ইন্দ্রজিৎ অবাক হয়ে সুরেন্দ্রর দিকে তাকাল। কারণ, গলার স্বর বেশ মেয়েলি। হয়তো সেইজন্যই কম কথা বলেন।
‘না, আপনি এখন যেতে পারেন—আমি পরে ডেকে নেব।’
সুরেন্দ্র চলে যেতেই মহেন্দ্রকে সঙ্গে করে ঘরের ভেতরে পা রাখল ইন্দ্রজিৎ।
ঘরে ঢুকে প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে সেটা বিশাল মাপের একটা অয়েল পেইন্টিং। টকটকে সিঁদুর পরা এক মাঝবয়েসি মহিলা। ছবিটা মালা-চন্দনে সাজানো।
‘আমার মা—।’ মহেন্দ্র বললেন।
ইন্দ্রজিৎ এবার ঘরটার দিকে মনোযোগ দিল।
বিলাসবহুলভাবে সাজানো প্রকাণ্ড ঘর। ভোমরার শব্দ করে এয়ারকুলার চলছে দেওয়ালে বিদেশি কোয়ার্ৎজ ঘড়ি। পশ্চিমের রোদ একটা কাচের জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে মার্বেল পাথরের মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ঘরের বাঁদিকে ঘেঁষে কারুকাজ করা মেহগনি কাঠের খাট—তাতে ধবধবে সাদা বিছানা।
সেদিকে আনমনাভাবে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে আচমকা মহেন্দ্রর মুখোমুখি ঘুরে দাঁড়াল ইন্দ্রজিৎ: ‘আপনার ছোটবোন যা বলে গেল, সে-কথা কি ঠিক? জিতেনবাবু না থাকায় আপনারা টাকার অভাবে কাহিল হয়ে পড়েছেন?
মহেন্দ্র ইতস্তত করতে লাগলেন।
ইন্দ্রজিৎ এয়ারকুলার অফ করে দিল। একটা জানলার পাল্লা সামান্য খুলে দিল। তারপর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটে বের করে একটা সিগারেট ধরাল। মহেন্দ্রকে অফার করল, কিন্তু তিনি আলতো করে বললেন, ‘এখন না—পরে।’
‘বলুন, নবনীতা কি ঠিক বলেছেন? আমার কাছে লুকোনোর চেষ্টা করবেন না।’ ঘরে এয়ারকুলারের ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও মহেন্দ্র পকেট থেকে রুমাল বের করে কাল্পনিক ঘাম মুছলেন। তারপর খানিকটা সময় নিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ—ঠিকই বলেছে। বেশ কয়েক বছর আগে বাবা একটা এগ্রিমেন্ট করেছিলেন। তাতে আমরা—মানে, আমি, সুরেন্দ্র আর নবনীতা—মাসে মাসে একটা ফিক্সড টাকা পাব। তার বাইরে টাকার দরকার পড়লে সেটা বাবার কাছে চাইতে হবে। সেই এগ্রিমেন্টে আমরা সই করেছিলাম—না-করে উপায় ছিল না।’
