দুজনের মধ্যে লম্বা লোকটাকে একটু যেন চেনা মনে হল বিশ্বনাথের। তিতলির ফ্ল্যাটে কি লোকটা এসেছিল? তা হলে তো বিশ্বনাথকে ও চিনবে।
একটা লোকের গলা শোনা গেল, ‘ছামিয়াটা যে ওদিক দিয়ে ছুট লাগাচ্ছে, বস—।’
‘আগে এই ঢ্যামনাটাকে কোতল কর। হারামিটা রামাইয়াকে লুটিয়ে দিয়েছে। আমাদের অপারেশানে বারবার দখল দিচ্ছে। আর ওই ছামিয়া পালাবে কোথায়! ওর তো ওই একটাই ঠেক—।’
কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন বিশ্বনাথ। এক্স-ফ্যাক্টর ওঁকে চমৎকার সাহায্য করছিল। ওঁর বুক থেকে একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল। যাক, তিতলিকে আজ ওরা রেহাই দিচ্ছে। এই একটা দিনই বিশ্বনাথের দরকার। সন্দীপনের এক শালা সিক্রেট পুলিশে আছে। কাল সকালেই ওর সঙ্গে দেখা করে তিতলির ব্যাপারটার একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে। আগেও বিশ্বনাথ সন্দীপনকে এ-ব্যাপারে রেখে-ঢেকে একটু ইশারা দিয়েছেন, কিন্তু ইমার্জেন্সি ভেবে সেরকম তাগাদা করেননি।
লোকদুটো কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল শত্রু পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে। আর তার পায়ের কাছে রামাইয়ার দেহ—অথবা, মৃতদেহ—অসাড় হয়ে পড়ে আছে।
বিশ্বনাথ তিতলির দিকে লক্ষ করছিলেন। দেখলেন, ও গাড়িতে উঠে পড়ল। হেডলাইট জ্বলে উঠল। তারপর হেডলাইট দুটো দুরন্ত গতিতে ছুটতে শুরু করল।
আঃ—!
পরিতৃপ্তির শ্বাস ফেললেন বিশ্বনাথ। এখন আর কাউকে তিনি ভয় পান না। সামনের এই জঘন্য লোকদুটোকেও না।
দুটো লোকের গায়েই ঢোলা শার্ট। প্যান্টের ওপর দিকে ঝোলানো। অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলেও বিশ্বনাথ ওদের দেখতে পাচ্ছিলেন। একজনের বাচ্চা-বাচ্চা লালিপপ মুখ। বাঁ ভুরুর ওপরে কাটা দাগ। গা থেকে ঘামের গন্ধ বেরোচ্ছে।
আর অন্যজন সেই লম্বা লোকটা। শিকারি বাঘের মতো সামান্য ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথম সুযোগেই ক্ষিপ্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
দুটো লোকই কোমরের কাছে হাত গুঁজে রেখেছিল। বোধহয় লুকোনো অস্ত্র হাতে ছুঁয়ে ভরসা খুঁজছিল। আর বিশ্বনাথের দু-পাটি অস্ত্র মুখের ভেতরে খটাখট শব্দ তুলে আক্রমণের জন্য তৈরি হচ্ছিল।
একটা হাত বেরিয়ে এল ঢোলা শার্টের আড়াল থেকে। হাতে ধরা ফুটখানেক লম্বা একটা চওড়া ব্লেডের ছুরি।
বিশ্বনাথ হিসেব কষছিলেন। এই হতচ্ছাড়া দুটোকে যেভাবে হোক আটকাতে হবে। খতম না হোক, অন্তত ঘায়েল করতে হবে। যাতে ওরা বাইশকে আর জ্বালাতে না পারে।
হিসেবের উত্তর অনুযায়ী বিশ্বনাথ ছুরিওয়ালার ছুরি লক্ষ করে ঝাঁপ দিলেন। ভঙ্গিটা এমন, যেন আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন।
সঙ্গে-সঙ্গে ছুরি চলল বাতাসে। বিশ্বনাথের বাঁ-হাতে, কুনুইয়ের ঠিক ওপরে, কেটে বসল ছুরিটা। বিশ্বনাথ লোকটার কান ধরলেন মুঠো করে। এক হ্যাঁচকায় ওকে টেনে নিলেন নিজের কাছে। এবং ওর ডান কাঁধে মরণ কামড় বসালেন।
শুয়োরের বাচ্চাটা বুঝুক ভ্যাম্পায়ারের কামড় কাকে বলে!
বাঁ-হাতে বসানো ছুরির ফলা। ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে। কিন্তু বাষট্টির কোনও তোয়াক্কা নেই। বরং কামড়টা ঠিকঠাক দিতে পেরেছে বলে বেজায় খুশি।
ঠিক সেই মুহূর্তে যন্ত্রণায় ছটফট করা লোকটা এক প্রবল ধাক্কা দিল বিশ্বনাথকে। বিশ্বনাথ ছিটকে পড়লেন বটে, তবে লোকটার কাঁধের খানিকটা মাংস ছিঁড়ে চলে এল দাঁতে।
আঁশটে গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। থু-থু করে সব ফেলে দিলেন। তারপর নজর ফেরালেন লোকদুটোর দিকে। দেখলেন আহত লোকটা টলছে—যে-কোনও মুহূর্তে খসে পড়বে জমিতে।
কিন্তু দু-নম্বর লোকটা কোথায় গেল?
ওই তো! আহত সঙ্গীকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। ঘাসের ওপরে চিত হয়ে পড়ে দেখতে লাগলেন বিশ্বনাথ। ওঁর একটা পা লম্বা হয়ে আছে রামাইয়ার গায়ের ওপরে। আর-একটা পা হিম-ভেজা ঘাসে।
আকাশের দিকে চোখ গেল। অন্ধকার গাঢ় হয়ে চাঁদকে উজ্জ্বল করে দিয়েছে। চাঁদের খাঁজ এবং বাঁকগুলো মুগ্ধ করল বিশ্বনাথকে। যে-বাতাস হঠাৎ বইতে শুরু করেছে তাতে শীতের গন্ধ পাচ্ছিলেন। তবে তার মধ্যে যেন আলতো করে মৃত্যুর পারফিউম মিশিয়ে দিয়েছে কেউ।
ওই তো লম্বা লোকটা! ও একটা দাঁড়িয়ে আছে। ওর শাগরেদ—কাঁধে কামড় খাওয়া লোকটা—নির্ঘাত খসে পড়েছে মাটিতে।
শরীরের সব শক্তি জড়ো করে উঠে বসলেন বিশ্বনাথ। বাঁ-হাতটা অসম্ভব জ্বালা করছে। এবার শেষেরটাকে খতম করার পালা। তা হলেই নিশ্চিন্ত। অন্তত কিছুদিনের জন্য।
লম্বা লোকটা কোমরের কাছ থেকে কী একটা বের করে শূন্যে তুলল।
অস্ত্রটা চিনতে পারলেন বিশ্বনাথ। খাটো হাতলের একটা কুড়ুল। কিন্তু ততক্ষণে অস্ত্রটা বাতাস কেটে শূন্যে বৃত্তচাপ এঁকে ধূমকেতুর মতো ছুটে আসতে শুরু করেছে বিশ্বনাথের দিকে।
কুড়ুলটা বিশ্বনাথের বুকে এসে আছড়ে পড়ল। সংঘর্ষের ভোঁতা শব্দ হল। ফলার অর্ধেকটা গেঁথে গেল ওঁর পাঁজরে। আর উঠে-বসতে-চাওয়া বিশ্বনাথ কুড়ুলের ধাক্কায় সটান চিত হয়ে পড়ে গেলেন।
হেঁচকি তোলার একটা শব্দ বেরিয়ে এসেছিল মুখ থেকে। চেষ্টা করেও বিশ্বনাথ মর্মান্তিক শব্দটা চাপা দিতে পারেননি। একইসঙ্গে বুকের ভেতরে দম বন্ধ হয়ে এল। একটা প্রকাণ্ড পাথর যেন শ্বাসনালীতে আটকে গেছে।
ঝাপসা চোখে লম্বা লোকটার দাঁড়ানো সিল্যুট দেখতে পেলেন। ওর মাথার পাশ দিয়ে উঁকি মারছিল শুক্লপক্ষের চাঁদ।
