সামনে ঝুঁকে পড়ে কুড়ুলের হাতল ধরে প্রকাণ্ড এক হ্যাঁচকা মারল শত্রু। বোধহয় ইচ্ছে ছিল কুড়ুলের দ্বিতীয় আঘাত হানবে বিশ্বনাথকে বুকে। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠল না। কারণ, কুড়ুলের ফলাটা কিছুতেই ছাড়ানো গেল না বিশ্বনাথের পাঁজর থেকে।
বিশ্বনাথের সারাটা শরীর চটচট করছিল। আঁশটে গন্ধ তুফান ছুটিয়ে দিয়েছে চারপাশে। কুড়ুলের কাঠের হাতলটা কোনওরকমে চেপে ধরলেন। তারপর ওঁর আঙুলগুলো কাঁকড়ার দাঁড়া হয়ে হাতল বেয়ে উঠতে লাগল। লম্বা লোকটা তখনও হাতল ধরে টানাটানি করছে। বিশ্বনাথের আঙুল ওর আঙুলের নাগাল পেয়ে গেল।
ব্যস। সঙ্গে-সঙ্গে তিতলিকে নিরাপদ করার তীব্র অভিলাষ বিশ্বনাথকে পেয়ে বসল। লোকটার আঙুল আঁকড়ে ধরে এক হিংস্র টান মারলেন। লোকটা নিমেষের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বিশ্বনাথের বুকের ওপর। বিশ্বনাথ এক মুহূর্তও দেরি না করে লোকটার গাল কামড়ে ধরলেন। সিরাম গ্ল্যান্ডে চাপ দিলেন প্রাণপণে।
হে ভগবান, একে খতম করার পুঁজি যেন থাকে আমার অলৌকিক জীবনে! বিড়বিড় করে বারবার এই প্রার্থনা জানাতে চাইলেন বিশ্বনাথ।
লোকটা এলোপাথাড়ি ছটফটাচ্ছিল। কিন্তু একটু পরেই দম-ফুরিয়ে যাওয়া পুতুলের মতো স্থির হয়ে গেল। টাল খেয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল বিশ্বনাথের গায়ের ওপর থেকে।
বিশ্বনাথের মনটা পালকের মতো হালকা হয়ে গেল। চিত হয়ে শুয়ে কুড়ুলের কালো হাতল আর চাঁদ দেখতে লাগলেন। হাতলটা যেন ওঁর শরীরেরই একটা বিচিত্র প্রত্যঙ্গ—আকাশের দিকে প্রতিবাদে উঁচিয়ে আছে।
ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল হঠাৎই। বিশ্বনাথের জ্বালায় আলতো প্রলেপ লাগাল।
সঙ্গে-সঙ্গে পকেটে মোবাইল ফোন বেজে উঠল আনন্দের সুরে।
অতি কষ্টে ডানহাত পকেটে ঢুকিয়ে বের করে নিলেন ফোনটা। সুইচ টিপে ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বললেন, ‘হ্যালো—।’
‘বাষট্টি, তুমি ঠিক আছ তো? আর ইউ ও. কে.?’ উদ্বেগে পাগল তিতলির গলা।
‘আমি ঠিক আছি।’ কোনওরকমে বললেন বিশ্বনাথ। প্রাণপণে কষ্ট চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেন: ‘আর কোনও ভয় নেই, বাইশ…।’
‘তুমি শিগগির আমার এখানে পালিয়ে এসো। এখানে কেউ তোমাকে কিচ্ছু করতে পারবে না—।’
‘যাচ্ছি।’ বিশ্বনাথের গলা স্তিমিত হয়ে যাচ্ছিল।
‘শিগগির চলে এসো।’ উচ্ছ্বল গলায় বলল তিতলি, ‘আমি তো ওয়েট করছি! আজ রাতে আমার ফ্ল্যাটে তুমি থেকে যাবে—।’
‘যাচ্ছি—।’ আবার বললেন বিশ্বনাথ। বইপত্র পড়ে কিংবা সিনেমা দেখে যেটুকু তিনি জেনেছেন, তাতে কুড়ুলের ঘায়ে ভ্যাম্পায়াররা খতম হয় না। কাঠের বল্লম দিয়ে ফুঁড়ে দিতে হয় তাদের হৃৎপিণ্ড। সুতরাং কোনও ভয় নেই। এক্ষুনি ওর বীভৎস ক্ষতের জায়গাটা অলৌকিক ম্যাজিকে মোলায়েম হয়ে জুড়ে যাবে। তারপর, বিশ্বনাথ উঠে বসবেন। তিতলির…।
কিন্তু গল্পের সঙ্গে, সিনেমার সঙ্গে, ব্যাপারটা মিলছিল না। শরীরটা কাহিল হয়ে আসছিল, হাঁ করে বড়-বড় শ্বাস নিচ্ছিলেন, আর চোখের নজর দ্রুত ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।
বোকার হদ্দ মেয়েটা তখনও ফোনে পাগলের মতো চেঁচাচ্ছিল, ‘বাষট্টি, তুমি আসছ তো? বাষট্টি! বাষট্টি…।’
বিশ্বনাথের শিথিল হাত থেকে মোবাইল ফোনটা খসে পড়ে গেল ঘাসের ওপরে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, ‘যাচ্ছি…।’
অপারেশান দাঁড়কাক
কথায় বলে কাক কাকের মাংস খায় না।
আমিও এতদিন তাই-ই জানতাম। কিন্তু একটা ০.৪৫৭ লুগার অটোমেটিক নিয়ে মহিন রায়ের আবির্ভাবের পর থেকে ওপরের প্রবাদ-বাক্যটা এই অধম ভুলতে বসেছে। লোকটা এমন এলোপাতাড়িভাবে ডাইনে-বাঁয়ে খুন করে যাচ্ছে যে, না দেখলে বিশ্বাস হয় না। আমার ক্লায়েন্ট কমে যাওয়ায় আমি যত না আঘাত পেয়েছি, তার চেয়েও বেশি পেয়েছি ওই ‘খুন’ শব্দটাকে মহিন রায় যাচ্ছেতাইভাবে অপমান করছে বলে।
অর্থাৎ মোদ্দা কথা, এতদিনের পর সতীশ দেবনাথ—অথবা ‘শার্প’ দেবনাথ একজন উন্মাদ প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হয়েছে।
আমি সাধারণত এইসব মোক্ষলাভ করানোর (‘খুন’ শব্দটাকে আমি আবার ঠিক পছন্দ করি না) ব্যাপারে শিল্পীসুলভ মন নিয়ে কাজ করি। ডিটেলের দিকে দিই অখণ্ড গভীর মনোযোগ—যার জন্যে পুলিশ চিরকালই মুখোমুখি হয়েছে এক অদ্ভুত সমস্যার: সেটা হল, খুনের পদ্ধতি তারা কোনওদিনই খুঁজে পায়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে প্রফেশনাল কিলার হিসেবে আমার নামডাক বেড়েছে বই কমেনি।
সুতরাং বুঝতেই পারছেন, একটা নিখুঁত খুনের পেছনে দরকার সময়, অধ্যবসায় ধৈর্য এবং সবার ওপরে বুদ্ধি। অন্য সবকিছুতে আমার চেয়ে ছোট হলেও একটা ব্যাপারে মহিন রায় আমাকে ভীষণভাবে হারিয়ে দিয়েছে।
সে জিনিসটা হল সময়।
একটা নিখুঁত খুনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় সময়। মহিন সময়ের ধার ধারে না—যার ফলে ওর খুনগুলো ঠিক নিখুঁত নয়। যেমন কোনও পাঁচিলের আড়ালে বা ঝোপের ফাঁকে লুকিয়ে থেকে ভিকটিমকে গুলি করে স্রেফ চম্পট দেওয়া—এই টাইপের। না, মহিনকে প্রথম শ্রেণির খুনি বলতে আমি একেবারেই নারাজ। সুতরাং, এই অপরাধের জগতে একমেবাদ্বিতীয়ম নিখুঁত প্রফেশনাল কিলার সতীশ দেবনাথ যেমন চিরকাল দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করে এসেছে, তেমনি আজও করবে। সেখানে মহিন রায়ের মতো একটা থার্ড গ্রেড কিলারের কোনও জায়গা নেই। কারণ সবকিছু সহ্য করলেও খুন-শিল্পের অপমান আমি কিছুতেই সহ্য করব না।
