তিতলি বায়নার সুরে হলল, ‘কেন? আর একটু থাকি…।’
‘না।’
তিতলির হাত টেনে নিয়ে এগোতে লাগলেন। লক্ষ করলেন, আকাশের লাল আভা মলিন হয়ে সেখানে ছায়া-ছায়া তুলির আঁচড় পড়েছে। ঘরে ফেরা কাক-চড়ুইয়ের দল ঝাঁকড়া গাছগুলোয় বসে তুমুল হল্লা করছে। রাস্তার ধারে পার্ক করা তিতলির গাড়িটাকে বেশ কষ্ট করে দেখতে পাচ্ছেন।
সেইসঙ্গে এও দেখতে পেলেন, লোক তিনটে বৃত্তচাপের ঢঙে ছড়িয়ে পড়ছে। একটা কালো বাজপাখি যেন ডানা ছড়াচ্ছে।
বিশ্বনাথের আর সন্দেহ রইল না। চট করে চলার দিক পালটালেন। একইসঙ্গে গতিও বাড়ালেন।
তিতলি বারবার জিগ্যেস করছিল, ‘কী হয়েছে?’
বিশ্বনাথ চাপা গলায় বললেন, ‘সুপারি কিলার্স।’
তিতলির গলা দিয়ে একটুকরো ভয়ের শব্দ বেরিয়ে এল।
সঙ্গে-সঙ্গে বিশ্বনাথ বললেন, ‘চুপ! আমি তো আছি!’
‘ওদের সঙ্গে বোধহয় আর্মস আছে…।’
ওকে সাহস দিতে বিশ্বনাথ হাসলেন: ‘আর্মস আমারও আছে—তুমি জানো।’ দাঁতের পাটি ফাঁক করলেন বন্ধ করলেন।
‘আজ রাতে একটা বাইট প্রেজেন্ট করা যাবে?’
কী অদ্ভুত কথা! মেয়েটার কি মতিগতির ঠিক নেই? এই সাংঘাতিক মুহূর্তে নেশার আবদার করছে!
‘ওসব পরে হবে। আগে…।’
বিশ্বনাথ লক্ষ করলেন, লোকগুলো আর দাঁড়িয়ে নেই। দুজন জায়গা বদলে গাড়ির দিকে এগোনোর পথটা আগলাচ্ছে। আর তিন নম্বর লোকটা জোর পায়ে ছুটে আসছে বিশ্বনাথ আর তিতলির দিকে।
‘রান!’ বিশ্বনাথ গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘ছুট লাগাও জলদি—।’
ওরা ছুটতে শুরু করল। কিন্তু কিছুটা দৌড়ে যাওয়ার পরই তিননম্বর লোকটা ওদের ধরে ফেলল। একটা খাটো রড উঁচিয়ে ধরল মাথার ওপরে।
বিশ্বনাথ হাতের এক ঝটকায় তিতলিকে ছিটকে দিলেন ঘাসের ওপরে। আর একইসঙ্গে লোকটার নেমে আসা হাতটা রুখে দিলেন। কিন্তু আঘাতটা পুরোপুরি এড়াতে পারলেন না।
রডটা মাথার পাশে এসে লেগেছিল। তখনই বুঝতে পেরেছেন ওটা লোহার। একটা ভোঁটা যন্ত্রণা মাথায় চারিয়ে গেল। পুরোনো বিশ্বনাথ হলে হয়তো অজ্ঞানই হয়ে যেতেন। নতুন বিশ্বনাথ ব্যথাটা সামলে নিলেন।
লোকটা মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের করেনি। বিশ্বনাথও না।
লোকটাকে দেখলেন।
ছোট-ছোট চুল। পুরু গোঁফ। গাল ভাঙা। দাঁতে রঙিন ছোপ। গলায় সোনালি চেন। পোশাক বলতে চাপা প্যান্ট আর টি-শার্ট।
না, এই লোকটা সেদিন তিতলির ফ্ল্যাটে অ্যাটাক করতে আসেনি। এটা নতুন।
লোকটাকে দেখতে একপলক লাগল। আর ওর গলায় কামড় বসাতে আর এক পলক।
ভিক্টরের মতো অলৌকিক ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বিশ্বনাথ। তারপর হিংস্রভাবে কামড় বসিয়েছেন। কনভার্টেড ভ্যাম্পায়ার যে আসল ভ্যাম্পায়ারের চেয়ে কিছু কম নয়, সেটাই যেন মরিয়া হয়ে প্রমাণ করতে চাইলেন।
এতক্ষণ কথা না-বলা লোকটা এবার গুঙিয়ে উঠল যন্ত্রণায়। ঢলে পড়ে গেল ঘাসের ওপর। কিন্তু বিশ্বনাথ কামড় ছাড়েননি। লোকটার সঙ্গে-সঙ্গে সমান তালে ঝুঁকে পড়েছিলেন। শেষে হুমড়ি খেয়ে রইলেন ওর গলার ওপর।
নোনা। নোনা। নোনা।
গোটা সমুদ্রটা যেন ঢুকে পড়ছিল বিশ্বনাথের মুখের ভেতরে। সেইসঙ্গে যেন সমুদ্রের মাছগুলোও। কারণ, জোরালো আঁশটে গন্ধ টের পাচ্ছিলেন। শুনতে পেলেন, রেণুকণা বলছেন, না, এ কোনও অন্যায় নয়। একটা শয়তানকে মেরে তুমি একটি দুঃখী মেয়েকে বাঁচাচ্ছ। বাঁচাও! বাঁচাও!
তার মানে, শয়তানটাকে মারো, মারো!
বিশ্বনাথ তাই করছিলেন। লোকটা গলা কাটা ছাগলের মতো ছটফট করছিল। আর একইসঙ্গে ওর প্রাণটা ধীরে-ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছিল। ময়দানের ঘাষ ভিজে যাচ্ছিল।
মিনিটখানেক পর লোকটাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দেখলেন, কাছেই তিতলি দাঁড়িয়ে। চোখ বড়-বড় করে বিশ্বনাথের কাণ্ডকারখানা দেখছে।
‘শিগগির ছোটো গাড়ির দিকে! গাড়ি নিয়ে পালাও। কুইক!’
কিন্তু তিতলি বিশ্বনাথের কথা যেন শুনতেই পেল না। বলল, ‘ওই দ্যাখো, ওই দুটো লোক আসছে…।’
‘আসুক। ওদের আমি রুখে দিচ্ছি। বাট ইউ রান লাইক হেল। আমার কথা শোনো, বাইশ, প্লিজ! গাড়ি নিয়ে স্ট্রেট বাড়ি চলে যাও। সিক্রেট পুলিশকে ইনফর্ম করো। তারপর ফ্ল্যাটের দরজা লক করে বসে থাকো। খবরদার, আমার কথা বলবে না কিছুতেই। যাও!’
‘আর তুমি?’ কাঁদতে-কাঁদতে জিগ্যেস করল তিতলি।
‘আমি তোমাকে ফোন করব। তারপর কাল হয়তো তোমার আস্তানায় গিয়ে হাজির হব।’ কথাটা শেষ করে বিশ্বনাথ হাসতে চাইলেন। কিন্তু হাসি এল না। ঠোঁট-মুখ চটচট করছে। থুতনি, গলা বেয়ে আঠালো তরল গড়িয়ে নামছে। হয়তো জামাতেও লেগে গেছে।
ছায়া-ছায়া আঁধারে ঠিক কী যে হচ্ছিল বাকি দুটো লোক সেটা ঠিকমতো ঠাহর করতে পারেনি। তা ছাড়া ওরা গাড়ি আগলাবে না সাহায্যের জন্য ছুটে যাবে, সেটা নিয়েও দোটানায় ছিল। তাই ওদের সিদ্ধান্ত নিতে সময় লেগেছে। এখন ওরা জোরকদমে এগিয়ে আসছে বিশ্বনাথের দিকে।
তিতলি কান্না-ভেজা ভাঙা গলায় বলল, ‘আমি একা যাব না—তুমিও চলো।’
বিশ্বনাথ তিতলিকে রুক্ষভাবে ঠেলে দিয়ে বললেন, ‘তুমি গাড়ি নিয়ে পালাও। আমি এদের ব্যবস্থা করে তারপর…।’
বিশ্বনাথ লম্বা-লম্বা শ্বাস ফেলে হাঁপাচ্ছিলেন। আবার বললেন, ‘বাইশ, লক্ষ্মীটি—আমার এই কথাটা রাখো—প্লিজ। যাও—।’
‘বাষট্টি!’ বলে ডুকরে উঠল তিতলি। তারপর ঘুরপথে ছুট লাগাল গাড়ির দিকে।
লোক দুটো তখন বিশ্বনাথের হাতদশেকের মধ্যে এসে গেছে। সাবধানে সতর্ক পা ফেলে এক পা এক পা করে শিকার ধরতে এগিয়ে আসছে।
