ইন্দ্রজিৎ ইন্টারকমে জিনিকে ডেকে নিল। জিনি শর্টহ্যান্ডের খাতা আর পেনসিল নিয়ে তৈরি হয়ে বসল। দশরথ তখন দরজার কাছে কান পেতে দাঁড়িয়ে। তদন্তের কৌতূহল ওকে সিটে বসে থাকতে দেয়নি।
মহেন্দ্র যেন একটু সময় নিয়ে বলতে শুরু করলেন।
‘ইন্দ্রজিৎবাবু, আমার বাবা জিতেন্দ্রনাথ সেন বেশ বড়লোক। মানে, লাস্ট ফিনানশিয়াল ইয়ারে আমরা ইনকাম ট্যাক্স দিয়েছি বারো কোটি টাকা। আমাদের কোম্পানির নাম হয়তো আপনি শুনে থাকবেন—”সেন কেমিক্যাল প্রোডাক্টস”।’
ইন্দ্রজিৎ মাথা নাড়ল—নামটা ও শুনেছে। শুধু ও কেন, পশ্চিমবঙ্গের সবাই হয়তো শুনে থাকবে। ‘সেন কেমিক্যাল প্রোডাক্টস’ দারুণ নামজাদা কোম্পানি।
‘আপনাদের প্রবলেমটা কী হয়েছে একটু বলবেন?’
‘হ্যাঁ—বলছি। ব্যাকগ্রাউন্টটা না-বললে প্রবলেমটার গুরুত্ব বোঝা যাবে না।’ একটু থেমে মহেন্দ্র সেন আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমাদের ফ্যাক্টরি দুটো—গড়িয়ায়, আর সোনারপুরে। বেশ বড় মাপের ফ্যাক্টরিই বলা যায়। বাবা-ই সবকিছু দেখেন—মানে, দেখতেন। তা ছাড়া লোকজন তো আছেই। আমরা খুব একটা সময় দিতে পারি না।’
‘আমরা মানে!’
ছোট করে দুবার কাশলেন মহেন্দ্র। তারপর বললেন, ‘আমরা মানে আমি, আমার ছোটভাই সুরেন্দ্র, আর ছোটবোন নবনীতা। আমরা আমাদের কাজকর্ম, শখ-আহ্লাদ নিয়ে থাকি। সে যাকগে, যা বলছিলাম—।’
মহেন্দ্রকে বাধা দিল ইন্দ্রজিৎ: ‘একটু আগে আপনি বললেন আপনার বাবা সবকিছু দেখেন—মানে, দেখতেন। ”দেখতেন” বলছেন কেন? এখন কি আর উনি দেখেন না?’
‘না—কারণ, পাঁচদিন আগে উনি কিডন্যাপড হয়েছেন।’
‘কিডন্যাপড হয়েছেন!’
‘হ্যাঁ। গত সোমবার ভোররাতে একটা শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমার ঘর দোতলায়। আর বাবা একতলায় বড় একটা ঘরে থাকতেন। আমি সিঁড়ির কাছে আসামাত্রই দেখতে পাই কয়েকটা কালো ছায়া কিছু একটা পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি চিৎকার করে উঠতেই তাদের মধ্যে একজন আমার দিকে রিভলভার তুলে শাসায়। বলে, ”চেঁচালে বা পুলিশে খবর দিলে আপনার বাবাকে খতম করে দেব। পরে আপনাকে ফোন করব। যান, ঘরে চলে যান। গিয়ে চুপটি করে শুয়ে থাকুন। সকালে কেউ জিগ্যেস করলে বলবেন জিতেনবাবু কোম্পানির কাজে ট্যুরে গেছেন। যা-যা বললাম মনে থাকে যেন!
‘আমি ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছিলাম। সেই অবস্থাতেই কোনওরকমে ঘরে ফিরে গেছি।’
‘বাড়ির সবাই খবরটা জেনেছে?’ ইন্দ্রজিৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চারি শুরু করল। শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিল।
‘হ্যাঁ—সকালে সুরেন আর নবনীতা জেনেছে। আর পরানদাও জেনেছে।’
‘পরানদা কে?’
‘বাবার আমলের কাজের লোক। বয়েসে বাবার চেয়েও অনেক বড়। আমাদের কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে।’
‘কিডন্যাপারদের কোনও ফোন এসেছিল? টাকা-পয়সা কিছু চেয়েছে?’
‘হ্যাঁ, সোমবার সকালে ওরা ফোন করেছিল। পুলিশে কিছু জানাতে বারণ করেছে। তবে টাকা-পয়সা এখনও কিছু চায়নি—বলেছে, পরে জানাবে। তারপর থেকে আর কোনও ফোন আসেনি।’
ইন্দ্রজিৎ কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তা করছিল। মহেন্দ্র সেন আশা-ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎই খেয়াল হওয়াতে হাতের নিভে যাওয়া সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে রেখে দিলেন। তারপর বললেন, ‘মিস্টার চৌধুরী, আপনি আজ বিকেলে আমাদের বাড়িতে একবার আসুন। স্পটটা একবার দেখে নিন। তা ছাড়া আমার কতকগুলো পারসোনাল কথাও বলার আছে। আমাকে লেখা বাবার একটা চিঠিও আপনাকে দেখাব। আর তার ওপর রয়েছে অনিমেষ সরকারের সমস্যা। বাবার ছোটবেলার বন্ধু—উনি গত পরশু আমাদের সল্ট লেকের বাড়িতে এসে উঠেছেন। বাবা নেই, অথচ…সে এক বিরাট সমস্যা—।’
‘তার মানে! আবার কীসের সমস্যা?’
‘ব্যাপারগুলো এখানে ঠিক ডিসকাস করা যাবে না। আপনি প্লিজ আমাদের বাড়িতে আসুন—তখন সব খুলে বলব।’
‘আমি একা নয়—আমরা তিনজনে আজ বিকেল চারটের সময় আপনাদের বাড়িতে যাব।’
তাই এসেছে ইন্দ্রজিৎ—সঙ্গে জিনি আর দশরথ।
কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলল। একজন বয়স্ক কাজের লোক। বোধহয় পরান—ভাবল ইন্দ্রজিৎ।
জমকালো ড্রয়িং-কাম-ডাইনিং স্পেসে ওদের আপ্যায়ন করে বসাল পরান।
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই হাজির হলেন মহেন্দ্র। হেসে বললেন, ‘আপনারা এসেছেন—ভীষণ খুশি হয়েছি।’
ইন্দ্রজিৎ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ঘরটা দেখছিল। এরকম ঘর হিন্দি ছবিতেই দেখা যায়। আসবাবপত্রও ঘরের সঙ্গে মানানসই। দূরে, ঘরের শেষ প্রান্ত থেকে, সুন্দর বাঁক নেওয়া সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলার দিকে।
‘আপনারা বসুন—আগে একটু চায়ের ব্যবস্থা করি।’ মহেন্দ্র সৌজন্য করে বললেন।
‘না, মিস্টার সেন। আগে বরং একটু কাজ সেরে নিই।’ ইন্দ্রজিৎ গা-ডুবে-যাওয়া সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল: ‘চলুন, আপনার বাবার ঘরটা আগে দেখি—।’
জিনিকে চোখের ইশারা করে পা বাড়াল ইন্দ্রজিৎ। জিনি ওর শর্টহ্যান্ড খাতা আর পেনসিল নিয়ে ইন্দ্রজিতের ছায়া হয়ে গেল।
মহেন্দ্র ইন্দ্রজিৎদের পথ দেখিয়ে দক্ষিণদিকে নিয়ে গেলেন। সেখানেই জিতেন্দ্রনাথের শোওয়ার ঘর। ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে একজন পুরুষের সঙ্গে চাপা গলায় একান্তে কিছু কথাবার্তা বলছিল। ইন্দ্রজিৎদের দেখে চট করে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলল।
