ভেতরের ঘরে টেলিফোন বেজে উঠল।
ইন্দ্রজিৎ প্রায় ছুটে গিয়ে টেলিফোন ধরল।
‘হ্যালো—।’
‘হ্যালো, প্রাইভেট আই ডট কম?’ ভারী গলায় কেউ জানতে চাইল।
‘ইয়েস—।’
‘আমার নাম মহেন্দ্র সেন। সল্ট লেকে থাকি। কাগজে আপনাদের অ্যাড দেখেছি। তাই একটা জরুরি ব্যাপারে ফোন করছি। আমাদের ফ্যামিলির ব্যাপারে একটু আলোচনা ছিল। সেটা আপনাদের অফিসে গিয়ে বলতে চাই। বুঝতেই পারছেন, সিক্রেসিটা খুব ইমপরট্যান্ট।’
‘অবশ্যই, অবশ্যই! আপনি এখনই আমাদের অফিসে চলে আসুন। ঠিকানাটা জানেন তো? পাঁচ নম্বর ম্যাডান স্ট্রিট। দোতলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডানদিকে। আমরা আপনার জন্যে ওয়েট করছি।’
‘আপনি কে কথা বলছেন জানতে পারি কি?’
‘আমি এই কোম্পানির চিফ ডিটেকটিভ—ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী।’
মহেন্দ্র সেন ‘ও. কে.’ বলে লাইন কেটে দিলেন।
ইন্দ্রজিতের বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছিল। হাতের নিভে যাওয়া সিগারেটটা ও টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিল। দু-হাত মুঠো করে ঝাঁকিয়ে উল্লাসের ভঙ্গি করল—ব্যাটসম্যানকে বোল্ড আউট করার পর বোলাররা যেমন করে। তারপর প্রায় নাচতে-নাচতে চলে এল বাইরের ঘরে। উত্তেজিতভাবে বলল, ‘জিনি, দশরথদা—চটপট সবকিছু সাজিয়ে-গুছিয়ে নাও। এক্ষুনি আমাদের প্রথম ক্লায়েন্ট আসছেন! কথা শুনে মনে হল লাখপতি কি কোটিপতি হবে।’ আনন্দে হাতে হাত ঘষল ইন্দ্রজিৎ ‘আমাদের কোম্পানির প্রথম কেস।’
দশরথ একবার চোখ তুলে ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকাল। একবার চোখ বুজল। বোধহয় কাউকে কৃতজ্ঞতা জানাল। তারপর শার্লক হোমসের ফটোটাকে প্রায় গড় হয়ে প্রণাম করার চেষ্টা করল।
জিনি নিজের টেবিলটা চটপটে হাতে গুছিয়ে নিল। কম্পিউটারের কিবোর্ডে খটাখট করে কয়েকটা বোতাম টিপল। তারপর নিজের মেকাপ মেরামত করতে শুরু করল।
দশরথ শার্লক হোমসের ফটোটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে ফেলল। টেবিলটা টিপটিপ করে সাজিয়ে নিল। তারপর নিজের পোশাকটা ঠিকঠাক করে নিয়ে গুছিয়ে বসল।
ইন্দ্রজিৎ ঢুকে গেল ভেতরের ঘরে। নিজের গদিওয়ালা চেয়ারে বসে নতুন একটা সিগারেট ধরাল। তারপর ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর বিষয়ে লেখা একটা মোটা ইংরেজি বই নিয়ে পড়তে শুরু করল।
প্রাইভেট আই ডট কম-এর তিনজনেই প্রথম ক্লায়েন্টের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
সল্ট লেকে চার নম্বর ট্যাঙ্কের কাছে চোখ-ধাঁধানো বাড়ি বলতে একটাই—’সেন কটেজ।’ স্যান্ড স্টোন আর গ্রানাইট দিয়ে আধুনিক ধাঁচে তৈরি তিনতলা বাড়ি। দরজা-জানলায় মেহগনি কাঠ আর টিন্টেড গ্লাস।
ইন্দ্রজিতের রানি-রং মারুতি ভ্যান বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ঠিক বিকেল চারটেয়। গাড়ি থেকে নামল ইন্দ্রজিৎ, জিনি, আর দশরথ।
মারুতি গাড়ির জানলার কাচে, নিজের ছায়া দেখছিল জিনি, মাথার চুল ঠিকঠাক করে নিচ্ছিল। হঠাৎই বাড়িটার দিকে চোখ পড়তে ও একেবারে হতবাক হয়ে গেল। ওর ঠোঁট চিরে আবছাভাবে বেরিয়ে এল: ‘ফ্যানট্যাস্টিক!’
দশরথ হেসে বলল, ‘এই অট্টালিকা যদি কটেজ হয়, স্যার, তা হলে হিমালয়কে আপনি উইয়ের ঢিবি বলতে পারেন।’
ইন্দ্রজিৎ সামান্য মাথা নাড়ল। চোখ থেকে ‘রে বান’ সানগ্লাসটা খুলে পকেটে রাখল। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘দশরথদা, যা-যা বলেছি মনে আছে তো! তুমি চোখ-কান খোলা রাখবে, কোনও কিছু যেন নজর এড়িয়ে না যায়।’ ইন্দ্রজিৎ ঘুরে তাকাল জিনির দিকে: ‘জিনি, আমি যখন সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব, তখন তুমি শর্টহ্যান্ডে নোট নিয়ে যাবে। কোনও কথা যেন বাদ না যায়।’
জিনি তখনও মুগ্ধ চোখে বাড়িটা দেখছিল। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ও বলল, ‘এটা বাড়ি নয়—স্বপ্ন। এরকম একটা স্বপ্নের বাড়িতে এরকম অঘটন ঘটেছে এটা ভাবা যায় না।’
জিনি একটু বেশিরকম স্বপ্ন দেখে—বৈভবের স্বপ্ন। এ-ধরনের স্বপ্ন দেখা বোধহয় ওর শখ।
দশরথ চটপটে গলায় বলল, ‘চলুন, স্যার, আমরা তদন্তে নেমে পড়ি। শুধু-শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই—।’
পাথর বসানো পথ ধরে বাড়ির সদর দরজার দিকে এগোতে-এগোতে ইন্দ্রজিতের কয়েক ঘণ্টা আগের কথা মনে পড়ছিল। যখন মহেন্দ্র সেন ওর ম্যাডান স্ট্রিটের অফিসে এসে হাজির হয়েছিলেন।
মহেন্দ্রকে দেখেই ইন্দ্রজিতের মনে হল, উনি লাখপতি নন—কোটিপতি।
মহেন্দ্রর চেহারা মোটাসোটা, পরনে ধবধবে পাঞ্জাবি আর সরু পাজামা। গা থেকে ভুরভুর করে আতরের গন্ধ বেরোচ্ছে। ডানহাতের চার আঙুলে মোটা-মোটা চারটে সোনার আংটি। তাতে যথাক্রমে হীরা, চুনি ও পান্না বসানো—চার নম্বর পাথরটা ইন্দ্রজিৎ চিনতে পারল না।
মহেন্দ্রর গলায় সোনার ডগ চেন। বাঁহাতের বাহুতে সোনার তাবিজ। তাতেও বড় মাপের তিনটে পাথর।
মহেন্দ্রর বয়স খুব বেশি হলে পঁয়তাল্লিশ হবে। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা—সোনারও হতে পারে। মাথায় শতকরা সত্তরভাগই টাক। থলথলে মুখে ঘাম। দোতলায় সিঁড়ি বেয়ে উঠে সামান্য হাঁফাচ্ছেন।
ইন্দ্রজিতের অফিসে ঢুকেই মহেন্দ্র জরিপ-নজরে সবকিছু মেপে নিচ্ছিলেন। বোধহয় বুঝতে চাইছিলেন প্রাইভেট আই ডট কম ওঁর সমস্যার সমাধান করতে পারবে কি না।
ইন্দ্রজিতের মুখোমুখি চেয়ারে বসে আরামের একটা সংক্ষিপ্ত শব্দ করলেন মহেন্দ্র। তারপর পকেট থেকে পাঁচশো পঞ্চান্নর প্যাকেট বের করলেন—নিজে একটা নিলেন, ইন্দ্রজিৎকেও একটা দিলেন। সুরেলা শব্দ তোলা বিদেশি লাইটার দিয়ে দুজনের সিগারেট ধরালেন।
