ইন্দ্রজিৎ বেঁটেখাটো বৃদ্ধ মানুষটাকে দেখছিল। কাঁচাপাকা চুল, তোবড়ানো গাল, কালো চওড়া ফ্রেমের চশমা, কপালের বাঁ-দিকে একটা ছোট আঁচিল। বয়েসের ভারে চোখের রং খানিকটা ঘোলাটে হয়ে এলেও তা থেকে চনমনে ভাব উধাও হয়ে যায়নি। তা ছাড়া মাইনে খুব কম শুনেও মানুষটির উৎসাহে বিন্দুমাত্রও ভাটা পড়েনি।
‘আমাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিটেকটিভের পোস্টে নিলে আপনি আর-একটা ব্যাপারে মোস্ট বেনিফিটেড হবেন, স্যার। প্রচুর রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা কাহিনি আমি গুলে খেয়েছি। আর গত পঞ্চাশ বছর ধরে শার্লক হোমস আমার গুরু, আমার দেবতা। আমার এই এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটি আপনার তদন্তের কাজে হেভি হেল্প করবে, স্যার। যেমন ধরুন, দীনেন্দ্রকুমার রায়, পাঁচকড়ি দে থেকে শুরু করে আজকের তপজ্যোতি বর্মন, হরিহর ধর পর্যন্ত সবার লেখাই আমার নখদর্পণে। যখনই দরকার তখনই আমার কাছ থেকে রেডি রেফারেন্স পেয়ে যাবেন। পাঁচকড়ি দে-র ”নীলবসনা সুন্দরী” কি আপনি পড়েছেন, স্যার? সেখানে…।’
দশরথের পাঁচালি শুনতে-শুনতে ইন্দ্রজিতের মাথা ঘুরতে শুরু করেছিল। ও কোনওরকমে বৃদ্ধ মানুষটিকে থামিয়ে বিদায় দিয়েছে। এবং পরে ঠান্ডা মাথায় অনেক বিচার-বিবেচনা করে তাকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠিয়ে দিয়েছে।
প্রাইভেট আই ডট কম-এর অফিস ম্যাডান স্ট্রিটে—দুটি মাঝারি মাপের ঘর নিয়ে আধুনিকভাবে সাজানো।
বাইরের ঘরটা রিসেপশান গোছের। একপাশে বড় টেবিলে পার্সোনাল কম্পিউটার নিয়ে বসে আছে জিনি রায়। ও একইসঙ্গে রিসেপশানিস্ট, টাইপিস্ট এবং ইন্দ্রজিতের সেক্রেটারি। বয়েস বাইশ-চব্বিশ হবে। ফরসা রোগা চেহারা। মুখের তুলনায় চোখ দুটো বেশ বড় মাপের। ঠোঁটে গাঢ় চকোলেট রঙের লিপস্টিক। চোখের পাতার ওপরে হালকা রঙের আস্তর। আর পারফিউমের সুগন্ধ ওকে চাদরের মতো জড়িয়ে রয়েছে।
ভগবান জিনিকে রূপ দিয়েছেন—তবে বুদ্ধির বিনিময়ে। কিন্তু তাতে জিনিস কোনওরকম দুঃখ আছে বলে মনে হয় না। ও সবসময় নিজের সাজগোজ নিয়েই ব্যস্ত। অফিস ছুটির পর ওকে দিয়ে একটি মিনিটও ওভারটাইম করানো যায় না। হাবভাব দেখে মনে হয়, বিশাল বড়লোকের মেয়ে—চাকরি করছে নেহাতই সময় কাটানোর জন্য। কিন্তু আসলে তা নয়।
জিনির মুখোমুখি চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আছে দশরথ। ‘শার্লক হোমস অমনিবাস’ পড়তে-পড়তে ওর বারবার হাই উঠছিল বিনা কাজে এভাবে বসে থাকা যায়! সক্রিয় তদন্তের কোনও সুযোগ নেই। শুধু বিশ্রাম। মাইনেটাই কি সব!
দশরথ বই বন্ধ করে একটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর ল্যামিনেট করে বাঁধানো একটা ফটো দ্বিতীয় ড্রয়ার থেকে বের করল। ফটোটা টেবিলে সুন্দরভাবে দাঁড় করাল।
দশরথের দেবতা শার্লক হোমসের ছবি।
দশরথ ধূপকাঠি-দেশলাই বের করল ড্রয়ার থেকে। তারপর ধূপ জ্বেলে শার্লক হোমসকে আরতি করল বারকয়েক। কষ্ট করে একটা হাই চেপে বলল আপনমনেই, ‘হে শার্লক হোমস, যে করে হোক একটা কেস এনে কোম্পানিটার বউনি করিয়ে দাও, বাবা।’
জিনি একটা ছোট আয়না নিয়ে নিজের মেকাপ ঠিক করায় ব্যস্ত ছিল। একবার আড়চোখে দশরথকে দেখল। তারপর ছোট একটা ‘হুঁঃ’ শব্দ করে নিজের কাজে মন দিল।
দশরথের আরতি শেষ হতে-না-হতেই ভেতরের ঘরের কাচের দরজা খুলে গেল। বাইরের ঘরে এসে দাঁড়াল ইন্দ্রজিৎ। ডানহাতের আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। কপালে ভাঁজ।
জিনির দিকে একপলক তাকিয়ে দশরথের টেবিলের দিকে এগিয়ে এল ইন্দ্রজিৎ, বলল, ‘দশরথদা, আজকের দিনটা গেলে চোদ্দোদিন হবে। চোদ্দোদিন হল অফিস খুলেছি, একটা কেসের খবর নেই! শুধু শো-কেস হয়ে বসে আছি! বাবা প্রথমেই বলেছিল, আমার পয়সা নষ্ট কর ক্ষতি নেই। তবে তোর ওই ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলে নষ্ট করিস না। এখন বোঝো ঠ্যালা—।’
দশরথ সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘চিন্তা করবেন না, স্যার। আজ গুরুকে মন-প্রাণ দিয়ে হেভি ডেকেছি। আজ একটা-না-একটা কেস আসবেই।’ ঘরের ডিজিটাল ক্লকের দিকে একবার তাকিয়ে, ‘এখনও তো বারোটা বাজেনি—।’
‘না, বারোটা বেজে গেছে—আমার কোম্পানির।’ বিরক্তভাবে সিগারেটের টান দিল ইন্দ্রজিৎ, ‘কী করে তোমাদের মাইনে দেব কে জানে!’
জিনি এতক্ষণ সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, ওদের কথাবার্তায় বিন্দুমাত্রও ভ্রূক্ষেপ করেনি। কিন্তু ইন্দ্রজিতের শেষ কথাটা কানে যেতেই চট করে ফিরে তাকাল ওর দিকে। করুণ অথচ আদুরে গলায় বলল, ‘মাইনে হবে না! কী বলছেন, স্যার!’
ইন্দ্রজিৎ তখন স্বপ্ন-দেখার চোখে ঘরের একটা কাচের জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল। আপনমনেই বিড়বিড় করে বলল, ‘আমাদের কোম্পানি দাঁড়াবেই। দরকার শুধু একটা কেস। জাস্ট একটা কেস।’
দশরথ শার্লক হোমসের ফটোর সামনে হাতজোড় করে বলল, ‘প্লিজ, জাস্ট ওয়ান কেস—।’
ইন্দ্রজিৎ সেদিকে আড়চোখে তাকিয়ে বিষণ্ণ হেসে বলল, ‘তোমার গুরুর বাড়ির ঠিকানাটা কী ছিল মনে আছে, দশরথদা?’
‘মনে নেই আবার!’ দাঁত দেখিয়ে একগাল হাসল দশরথ: ‘২২১বি, বেকার স্ট্রিট।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইন্দ্রজিৎ বলল, ‘ঠিক বলেছ। আমরা একেবারে বেকার হয়ে গেলাম। বেকার—স্ট্রিট বেগার।’
দশরথ জ্বলন্ত ধূপকাঠিটা পাশেই একটা জানলার তাকে ধূপদানিতে বসিয়ে দিয়েছিল। ইন্দ্রজিতের শেষ কথাটা শুনেই হাত বাড়িয়ে ধূপদানিটা নিল। আর-একদফা ঘুরিয়ে দিল শার্লক হোমসের ফটোর সামনে। তারপর চোখে-মুখে তীব্র ভক্তি প্রকাশ করে কাঁচুমাচু ভাবে বলল, ‘প্রভু, একটা কেস—জাস্ট একটা। তা হলেই…।’
