অল্প-অল্প ঠান্ডা বাতাস এসে পরশ বুলিয়ে দিল অসমঞ্জের চোখে-মুখে। ওরা কি তা হলে নদীর দিকে এগিয়ে চলেছে?
হঠাৎই চারপাশের বাড়ি-ঘর অদৃশ্য হয়ে গিয়ে খানিকটা ফাঁকা জায়গা প্রকাশিত হয়ে পড়ল। কাছেই চোখে পড়ছে বিবর্ণ ঝাপসা একটা রাস্তার আলো। অসমঞ্জের সামনে পায়ের শব্দ থমকাল। নিঃশব্দে এগিয়ে চলা অসমঞ্জ দেখতে পেল লোকটা ঠিক আলোটার নীচেই থমকে দাঁড়িয়েছে। পকেট থেকে একটা নোটবই বের করে কী যেন খুঁটিয়ে দেখছে।
ঠিক পাঁচ পা এগোতেই লোকটার একেবারে ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল অসমঞ্জ। পকেট থেকে বের করে নিল কাপড়ে জড়ানো পাইপের টুকরোটা।
লোকটা মুখ তুলে তাকাল। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। লোহার পাইপটা সর্বশক্তিতে তার মাথায় বসিয়ে দিয়েছে অসমঞ্জ। একবার। দুবার। তিনবার।
দাঁতে দাঁত চেপে অসমঞ্জ বলল, ‘শয়তান, এবার তোকে পেয়েছি।’
অসমঞ্জর আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হল। সর্দি জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল ও। দিনসাতেক পর যখন শরীরে আবার জোর ফিরে পেল, তখন আবহাওয়ার অনেক উন্নতি হয়েছে। তাজা মিষ্টি বাতাস বসন্তের ইঙ্গিত বয়ে নিয়ে আসছে। সুতরাং দুর্বলতা পুরোপুরি না কাটলেও সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল অসমঞ্জ। একটা পাক্ষিক পত্রিকা কিনে পায়ে-পায়ে গিয়ে বসল পাড়ার একটা চায়ের দোকানে। চায়ের কাপ সামনে নিয়ে পত্রিকার পাতায় চোখ বোলাতে লাগল।
হঠাৎই পাশের টেবিলের কথাবার্তার একটা টুকরো কানে এল অসমঞ্জের। ভীষণভাবে চমকে উঠল ও। যে-শব্দটা ওর কানে এসেছে সেটা ‘নাইট্রেট…’।
পাশের টেবিলের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকাল। এক তরুণ ও এক প্রৌঢ়। একজনের কাঁধে ক্যামেরা ও কিটব্যাগ। অন্যজনের হাতে ভাঁজ করা একটা খবরের কাগজ। তরুণ তখন কথা বলছে।
‘…অ্যাকসিডেন্ট, সুইসাইড, মার্ডার, পিকিউলিয়ারভাবে মারা যাওয়ার কেস—এসব মিত্তিরদা যেরকম পারত, আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আমার তো দাদা বেশ অসুবিধেই হচ্ছে।’
প্রৌঢ় বলল, ‘শোনো, চক্রবর্তী, মন দিয়ে চেষ্টা করো। এত অল্পে হাল ছেড়ে দিলে রিপোর্টারদের চলে না। আরে বিজন মিত্তির ছিল বিজন মিত্তির! ওরকম দুঁদে ক্রাইম রিপোর্টার ভারতবর্ষে খুব কম জন্মেছে—।’
‘কী অদ্ভুতভাবেই না মিত্তিরদা মারা গেল। যে-লোকটা ঘুমের ঘোরে হার্টফেল করে সেদিন মারা গিয়েছিল, তার মামলার হিয়ারিং-এর পর মিত্তিরদা যাচ্ছিল লোকটার বিধবা স্ত্রীকে ইনটারভিউ করতে। এমন সময় কেউ পেছন থেকে এসে মিত্তিরদার মাথায় ডান্ডা মারে। হয়তো এ-পাড়ারই কোনও গুন্ডা-টুন্ডা পুরোনো রাগ মিটিয়েছে। পাড়াটা তো বিশেষ ভালো নয়। তা ছাড়া ক্রাইম রিপোর্টিং করতে গিয়ে মিত্তিরদা যেসব রিস্ক নিত—।’
‘মিত্তির দারুণ মজার পাবলিক ছিল। একটু আগেই তোমাকে যা বলছিলাম। ওর সেই ক্যারাসল নাইট্রেট নিয়ে নিখুঁত খুনের গপ্পো। একখানা মাস্টারপিস।’
অসমঞ্জের গোটা শরীর কেঁপে উঠল। এই ‘ক্যারাসল’ শব্দটাই এতদিন ওর সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছে। এক অদ্ভুত আচ্ছন্নভাবে ওর চোখ দুটো কেমন ঝাপসা হয়ে এল। মাথাটা যেন ভীষণভাবে দুলে উঠল।
‘…তোমার দিকে গম্ভীর চোখে তাকিয়ে নিট গপ্পোটা ফেঁদে বসবে…’ প্রৌঢ় সাংবাদিক তখনও বলে চলেছে, ‘তোমার মনেও হবে না যে, ক্যারাসল নাইট্রেট নামে আসলে কোনও বিষ নেই। পুরো কেসটাই ঢপের চপ। বেশিরভাগ সময়ে এই গল্পটা ও শোনাত ট্রেনে—ফাঁকা কামরায় কোনও লোককে একা পেলে। তার ওপর, তার হাতে যদি কোনও ক্রাইম নভেল থাকে তা হলে তো তার আর রক্ষে নেই। বিজন মিত্তিরের ক্যারাসল নাইট্রেটের গপ্পো তাকে শুনতেই হবে। আর, আশ্চর্য কী জানো, চক্রবর্তী? অনেকে ওর ওই গল্প বিশ্বাসও করে ফেলত। একবার তো একটা লোক মিত্তিরকে টাকা অফার করেছিল ওই বিষ—।’
হঠাৎই অস্ফুটে চেঁচিয়ে উঠল তরুণ সাংবাদিক। দ্বিতীয়জনও কথা থামিয়ে চমকে ঘুরে তাকাল।
কারণ, পাশের টেবিলে অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়েছে অসমঞ্জ দত্ত।
রক্তের দাগ ছিল (নভেলেট)
নিজের টেবিলে বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ‘শার্লক হোমস অমনিবাস’ পড়ছিল দশরথ সামন্ত। সারাটা জীবন ধরে সে ছিল তদন্ত-পাগল কনস্টেবল। বছরপাঁচেক হল রিটায়ার করেছে। রিটায়ার করার সময়েও সে প্রায়-কনস্টেবলই ছিল। কারণ, প্রোমোশন সে নেয়নি—নিলে সরাসরি তদন্তের জায়গা থেকে তাকে হয়তো সরে যেতে হত।
চাকরি থেকে রিটায়ার করার পর হঠাৎই একটা ডিটেকটিভ এজেন্সির বিজ্ঞাপন দশরথের চোখে পড়ে। ‘প্রাইভেট আই ডট কম’ নামের ডিটেকটিভ এজেন্সি একজন বয়স্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট চাইছে। তদন্তের অভিজ্ঞতা থাকলে ভালো হয়।
একমুহূর্তও দেরি না-করে দশরথ সেখানে অ্যাপ্লাই করেছিল এবং ইন্টারভিউর ডাক পেয়েছিল।
ইন্টারভিউ নিয়েছিল এজেন্সির মালিক ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী। বছর তিরিশ-বত্তিরিশের টগবগে যুবক। লম্বা ফরসা চেহারা। মুখে কোথায় যেন একটা বেপরোয়া ভাব লুকিয়ে রয়েছে।
ইন্টারভিউর সময় দশরথ কাষ্ঠ হেসে ইন্দ্রজিৎকে বলেছিল, ‘সময়মতো প্রোমোশন নিলে আমি স্যার পুলিশ কমিশনার হয়ে রিটায়ার করতে পারতাম—কিন্তু করিনি। কারণ, ওই যে বললাম, ডায়রেক্ট তদন্তের প্রতি দুর্দান্ত টান। ঠিক যেন সন্তানের প্রতি মায়ের টান! তদন্ত—মানে, ইনভেস্টিগেশান—ছাড়া আমি একটা মোমেন্টও থাকতে পারি না। তদন্ত আমার ধ্যান-জ্ঞান-প্রাণ।’
