‘এসব আপনার কীর্তি, মিস্টার গুপ্ত। সব আপনার কীর্তি।’ অসমঞ্জ প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘সেদিন আপনি আমাকে খুন করতে চেয়েছিলেন।’
‘খুন? বলছেন কী? আপনাকে কেন খুন করতে যাব।’
‘আপনাকে ফাঁসি যেতে হবে।’ ভয়ংকর স্বরে গর্জে উঠল অসমঞ্জ।
চারিদিকে লোকজনের ভিড় বাড়তে শুরু করেছিল। এবার একজন পুলিশ অফিসার ভিড় হটিয়ে সামনে এগিয়ে এল। অসমঞ্জকে ঠেলে সামান্য সরিয়ে দিল। বলল, ‘কী হয়েছে? ঝঞ্ঝাট কীসের?’
শরণ গুপ্ত নিজের রগে আঙুলের টোকা মেরে অসমঞ্জের দিকে দেখিয়ে ইশারা করল। বলল, ‘না, না, কিছু হয়নি। আমি কোর্টে ঢুকেছি বলে এই ভদ্রলোক একটু আপত্তি করেছিলেন। তাতে আমি কার্ড দেখাই। তখন হঠাৎই উনি খেপে গিয়ে আমাকে অ্যাটাক করলেন। দয়া করে ওঁর ওপরে একটু নজর রাখবেন…।’
‘ঠিক বলেছেন…’ একজন পথচারী বলে উঠল।
‘এই লোকটা—এই লোকটা আমাকে খুন করার চেষ্টা করেছে!’ অসমঞ্জ বলল।
পুলিশ অফিসার বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ল। বলল, ‘ঠিক, আছে, আমি দেখছি। কোর্টের ভেতরটা যা গরম তাতে মাথা গরম হওয়াটা তেমন আশ্চর্যের নয়…।’
‘এই লোকটাকে ছাড়বেন না।’ চিৎকার করে উঠল অসমঞ্জ, ‘এই লোকটা—শরণ গুপ্ত—এ জলের গেলাসে বিষ মিশিয়ে বহু লোককে খুন করেছে। আমি ওকে ছাড়ব না।’
পুলিশ অফিসার শরণ গুপ্তের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল। তারপর বলল, ‘আপনি যান, আমি দেখছি—’ অসমঞ্জের কাছে এসে হাত চেপে ধরল অফিসার: ‘শুধু-শুধু কেন মাথা গরম করছেন? ওই ভদ্রলোকের নাম শরণ গুপ্ত নয়। আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে—।’
‘তাই নাকি?’ খানিকটা অবাক হল অসমঞ্জ। বিভ্রান্ত হল। জানতে চাইল, ‘আসল কী নাম ভদ্রলোকের?’
‘ওসব বাদ দিন।’ হাত নেড়ে অফিসার বলল, ‘এবারে ঠান্ডা মাথায় চলুন দেখি।’
ততক্ষণে অন্য একটা ট্যাক্সি ডেকে শরণ গুপ্ত অদৃশ্য হয়ে গেছে।
চারপাশে তাকিয়ে দর্শকদের কৌতুকভরা উজ্জ্বল মুখগুলো দেখল অসমঞ্জ। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, আমারই একটু ভুল হয়েছে। চলুন, থানায় চলুন, সব আপনাকে খুলে বলব…।’
শিথিল পায়ে যখন অসমঞ্জ থানার বাইরে বেরিয়ে গেল, তখন পুলিশ অফিসারটি একজন সার্জেন্টের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী দাস, কী বুঝলে?’
সার্জেন্ট দাস হাসল, বলল, ‘বদ্ধ পাগল। জলের গেলাসে বিষ মিশিয়ে ঘুমের ঘোরে হার্টফেল করিয়ে মারছে। আজব কায়দা বটে!’
‘হুম—’ বলল অফিসার, ‘যাক, লোকটার নাম-ঠিকানা তো রইল—দরকার হলে আরও খোঁজখবর করা যাবে।’
সে-বছর শীতটা খুব জাঁকিয়ে বসল শহরতলির ওপর। নতুন তৈরি হওয়া অভ্যেসমতো আদালতে শুনানি দেখতে গিয়েছিল অসমঞ্জ। শীতের ছুঁচ যেন সরাসরি হাড়ে এসে বিঁধছে। পথের ওপর কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে। আর শান্ত নদীর ওপর কুয়াশার পাহাড় মেঘের মিনারের মতো জমাট বেঁধে স্থির।
কোর্টে তেমন ভিড় হয়নি। পুরোনো আমলের মলিন ঘর। অকালসন্ধ্যার অন্ধকার এড়াতে ঘরের হলদে আলো জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। শীতের প্রকোপ রুখতে সকলেই মুড়িসুরি দিয়ে রয়েছে। একটু দূরের লোককে ঠিকমতো ঠাহর করা যাচ্ছে না। অসমঞ্জের শরীরটা ঠান্ডায় যেন কাহিল হয়ে পড়েছে। সমস্ত হাড়গুলো কনকন করছে। হয়তো এখুনি জ্বর আসবে।
অতিকষ্টে চোখ মেলে কোর্টরুমের এক কোণে একটা চেনা মুখ নজরে পড়ল অসমঞ্জের। আপনা থেকেই ওর হাত চাদরের নীচে, প্যান্টের পকেটে চলে গেল। মোটা শক্তপোক্ত একটা জিনিসের ওপর চেপে বসল হাতের আঙুল। খানিকটা ভরসা পেল ও। শরণ গুপ্তের সঙ্গে রাস্তায় সেদিন গোলমাল হওয়ার পর থেকেই এই অস্ত্রটা ও সবসময় কাছে-কাছে রাখছে। না, রিভলভার নয়—রিভলভার জোগাড় করা মুশকিল, আর অসমঞ্জ সেসব চালাতেও জানে না। তার চেয়ে এই লোহার পাইপের ছোট্ট টুকরোটা অনেক কাজের। সেটাকে ছদ্মবেশ পরানোর জন্য কাপড়ে জড়িয়ে বেশ একটা জুতসই অস্ত্র তৈরি করেছে ও। এটা এখন ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী।
বরাবরের মতোই অনিবার্য রায় শোনানো হল। দর্শকরা ভিড় করে বেরিয়ে আসতে লাগল কোর্টের বাইরে। অসমঞ্জ তাড়াহুড়ো করতে চাইল, কারণ, সেই লোকটাকে ভিড়ে হারিয়ে ফেললে চলবে না। তাই কনুই দিয়ে ভিড় ঠেলে ও এগোতে লাগল।
দরজার বাইরে বেরিয়েই ও শিকারের প্রায় নাগাল পেয়ে গিয়েছিল, কিন্তু একটা মোটাসোটা লোক মাঝপথে এসে গিয়ে সব বানচাল করে দিল। অসমঞ্জ মোটা লোকটার কাঁধে ভর করে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল সামনে।
চারপাশ থেকে বিরক্তিকর অস্ফুট মন্তব্য ভেসে এল। অসমঞ্জের শিকার ঘুরে তাকাল পিছনে। রিমলেস চশমার কাচ চকচক করে উঠল পড়ন্ত আলোয়। কিন্তু অসমঞ্জকে সে চিনতে পারল না। সামনে পা ফেলে এগিয়ে গেল।
অসমঞ্জ চুপিসাড়ে লোকটাকে অনুসরণ করল। লোকটা বেশ চটপট পা ফেলে এগিয়ে চলেছে। একবারের জন্যও পিছনে তাকাচ্ছে না। কুয়াশা আরও ঘন হয়ে উঠেছে। চার-পাঁচ গজ সামনে নজর চলে না।
তৎপর শ্বাপদের মতো তাকে অনুসরণ করে চলল অসমঞ্জ। কোথায় চলেছে লোকটা? বাড়ির পথে? সামনের বড়রাস্তায় বাস ধরবে? কই, না তো। ওই তো সে বাঁক নিচ্ছে ডানদিকের সরু গলিটায়।
কুয়াশায় বলতে গেলে অন্ধ হয়ে গেল অসমঞ্জ। নিছক পায়ের শব্দ শুনে এগিয়ে যেতে লাগল ও। নিস্তব্ধ পথে শুধু দু-জোড়া পায়ের শব্দ কেমন বিচিত্র ফাঁপা প্রতিধ্বনি তুলছে। শিকার ও শিকারি। বহু খুনের বোঝা মাথায় নিয়ে ওই লোকটা এখন সমাজের শত্রু। আইন তাকে সাজা দিতে পারবে না। সুতরাং অসমঞ্জের মতো কোনও দায়িত্বশীল নাগরিককেই সেই ভার নিতে হবে। ভয়ে পিছিয়ে গেলে চলবে না।
