‘আপনি তা হলে একজন কম্পাউন্ডার?’ লোকটার কথা থেকে পাওয়া কয়েকটা বিশেষ শব্দের ওপর ভরসা করে অনুমানে ঢিল ছুড়ে দিল অসমঞ্জ।
না, কম্পাউন্ডার ঠিক নই—আমি হলাম গিয়ে সর্বঘটে কাঁঠালি কলা— সব কাজই একটু-আধটু জানি।’ একটু থেমে তারপর: ‘ওঃ, আমার পরিচয়টাই আপনাকে দেওয়া হয়নি।’ হাসল সে: ‘আমার নাম শরণ গুপ্ত—।’
‘আমি অসমঞ্জ দত্ত। দেখছেনই তো—ব্যাচেলার। শিগগিরই যে বিবাহিত হয়ে পড়ব এমন সম্ভাবনা বিশেষ নেই। ছোটখাটো চাকরি করি। আর পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে এই ছোট্ট বাড়িটায় মাথা গুঁজে রয়েছি।’
‘ভালো আছেন মশাই। বিয়ে-থা যখন করেননি তখন ভাগ্যবানই বলতে হবে—’ হাসল শরণ গুপ্ত: ‘নাঃ, আপনার ওই নাইট্রেটের দরকার পড়বে বলে মনে হয় না। যদি ফাটকা আর মেয়েছেলের রোগ থেকে দূরে থাকতে পারেন, তা হলে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, সারা জীবনে ওই অদ্ভুত দাওয়াই আপনার কখনও দরকার হবে না।’
মুখ ফিরিয়ে আড়চোখে হাসল সে। আলো পড়ে চকচকে হয়ে উঠল চশমার কাচ। মুখের ভাঁজগুলো যেন আরও স্পষ্ট হল। ট্রেনের কামরার চেয়ে এখন তাকে আরও বেশি বয়স্ক বলে মনে হচ্ছে।
‘না, সাহায্যের জন্যে আপনার কাছে আমাকে ছুটতে হবে না,’ ঠাট্টার সুরে বলল অসমঞ্জ, ‘তা ছাড়া, আপনাকে দরকার পড়লেই বা খুঁজে পাচ্ছি কোথায়!’
‘আমাকে খুঁজে বের করতে হবে না,’ শরণ গুপ্ত বলল, ‘আমিই আপনাকে খুঁজে নেব। ও আমার অভ্যেস আছে।’ দাঁত দেখিয়ে হাসল সে: ‘আচ্ছা, তা হলে চলি। চায়ের জন্যে ধন্যবাদ। আর কখনও আমাদের দেখা হবে বলে মনে হয় না, তবে ভাগ্য আর নিয়তির কথা কে বলতে পারে, বলুন।’
শরণ গুপ্ত বেরিয়ে গেলে চেয়ারে বসে গা এলিয়ে দিল অসমঞ্জ। টেবিলে রাখা নিজের আধখাওয়া জলের গ্লাসে চুমুক দেওয়ার আগে মনটা একবার খচখচ করে উঠল। মনে পড়ল রামতনু চন্দ্রের কথা।
গ্লাসের জলটা অসমঞ্জের জিভে কেমন যেন বিস্বাদ ঠেকল। জলের রংটাও কি একটু অন্যরকম ঠেকছে? রামতনু চন্দ্রের বাড়িতে কী করছিল শরণ গুপ্ত?
সব মিলিয়ে ব্যাপারটা রহস্যময়। শরণ গুপ্তের আগমন, তারপর ওই…ওই নাইট্রেটের কথা। ইস, কীসের নাইট্রেট যেন? নামটা জিভের ডগায় এসে আটকে যাচ্ছে।
‘আমাকে খুঁজে বের করতে হবে না। আমিই আপনাকে খুঁজে নেব।’ এ-কথা বলে আসলে কী বলতে চাইছে শরণ গুপ্ত? এ তো বড় অদ্ভুত ব্যাপার। সত্যিই কি মারণ-ভোমরার খবর গুপ্ত জানে? নাঃ, পুরো ব্যাপারটা নেহাতই পাগলামো। নইলে কোন বিশ্বাসে সমস্ত গুপ্তকথা সে অসমঞ্জকে বলে দেয়? অসমঞ্জ যদি এখন পুলিশে গিয়ে সব ফাঁস করে দেয় তা হলেই তো শরণ গুপ্ত ফাঁসিতে চড়বে। অসমঞ্জের বেঁচে থাকাটাই এখন তার পক্ষে বিপজ্জনক।
গ্লাসের জলটা।
যতই ভাবতে লাগল ততই সন্দেহটা জোরদার হতে লাগল অসমঞ্জের মনে। গ্লাসের জলটার স্বাদ-বর্ণ-গন্ধ যেন আর স্বাভাবিক নেই। শরণ গুপ্তের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে কি সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল অসমঞ্জ? আর সেই সুযোগে…নাঃ, আর কোনও সন্দেহ নেই। হিসেব অনুযায়ী এখন অসমঞ্জের ঘুম পাওয়ার কথা, তারপর ঘুমের ঘোরে হার্ট অ্যাটাকে…উঁহু, এসবই হয়তো অসমঞ্জের কল্পনা। কিন্তু একটা ঘুম-ঘুম ভাব সত্যিই যেন টের পাচ্ছে ও…।
অসমঞ্জের কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমে উঠল।
মিনিটকুড়ি পরে তেঁতুল আর গরম জল খেয়ে বারচারেক বমি করে অবসন্ন শরীরে বিছানায় গা এলিয়ে দিল অসমঞ্জ। সারা দেহ থরথর করে কাঁপছে। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে ও। নইলে আজকের ঘুমই ওর কালঘুম হত।
শরণ গুপ্তের চিন্তা মন থেকে কিছুতেই তাড়াতে পারছে না অসমঞ্জ। সেই সঙ্গে শরীরের কাঁপুনিটাকেও। মনের দিক থেকে ভীষণ ভেঙে পড়েছে ও। এবার থেকে জল খাওয়ার সময় ও খুব সাবধান হবে। ওর ভয় আর অস্বস্তি আরও তীক্ষ্ন হল।
গ্লাসের বিষাক্ত জলের ঘটনাটা অসমঞ্জকে ভীষণ দুর্বল করে দিল। রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় বারবার চারপাশে সতর্ক চোখে তাকায় ও। অচেনা লোক দেখলে দরজা খোলে না। সবসময়ে যেন একটা আতঙ্ক আশঙ্কা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে ওকে। এমন সময় ঘটল আর-একটা নতুন ঘটনা।
অসমঞ্জের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরের এক এলাকায় একজন শিল্পপতি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেল। যথারীতি ঘুমের ঘোরে। কিন্তু এবারে সামান্য হেরফের আছে। মাঝরাতে ভদ্রলোকের যন্ত্রণার চিৎকার শুনতে পেয়েছে তার স্ত্রী ও মেয়ে। এবং তাদের মতো ব্যাপারটা রীতিমতো অস্বাভাবিক। যদিও ভদ্রলোকের বড়ছেলের মত অন্যরকম। কেন যে অন্যরকম তা অসমঞ্জ এখন ভালোই আন্দাজ করতে পারছে। সুতরাং ব্যাপারটা আদালতে ওঠার পর শুনানি দেখতে সেখানে গেল ও।
রায় বেরোল, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু। তাতে অসমঞ্জ অবাক হল না। কিন্তু কোর্ট ছেড়ে বাইরের রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই একটা দৃশ্য ওকে ভীষণ অবাক করে দিল। আধময়লা চেক শার্ট ও ঢোলা কালো প্যান্ট। খুব চেনা মুখ। শরণ নাইট্রেট গুপ্ত। সে একটা ট্যাক্সি থামিয়ে তাতে উঠতে যাচ্ছে।
পিছন থেকে ছুটে গিয়ে শরণ গুপ্তের ওপরে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল অসমঞ্জ।
‘মিস্টার গুপ্ত।’ হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল ও। সাংঘাতিক জোরে তার কাঁধ খামচে ধরল।
‘কী ব্যাপার, আপনি?’ ঘুরে তাকাল গুপ্ত। চোখে-মুখে বিরক্তি: ‘কোর্টে গিয়েছিলেন নাকি?’ অসমঞ্জের হাতটা কাঁধ থেকে ছাড়িয়ে নিল সে। স্বাভাবিক হয়ে হাসল। তারপর বলল, ‘বলুন স্যার, আপনার জন্যে কী করতে পারি?’
