সকাল-বিকেল-সন্ধ্যা-রাত্রি এই একটা জিনিস মায়াবী পিশাচের মতো অসমঞ্জকে অনুসরণ করে চলল। ঘটনা পরম্পরা বারবার সেই একই: ‘ঘুমন্ত অবস্থায় মৃত্যু, মৃতদেহ আবিষ্কার, সন্দেহ, পুলিশি তদন্ত, ময়না তদন্ত এবং ফলাফল, যথারীতি স্বাভাবিক মৃত্য।’ ডাক্তারি মতে, হার্টফেল করে মৃত্যু। ব্যস, সব শেষ। সুতরাং, ঘুমোতে যাওয়ার আগে এক গ্লাস জল খাওয়ার যে-অভ্যেস অসমঞ্জের ছিল, সেটা শিগগিরই ছেড়ে দিল ও। আর সেই নাম-ভুলে-যাওয়া জিনিসের নাইট্রেটের নামটা দিন-রাত মনে করার চেষ্টা করতে লাগল।
খবরের কাগজের প্রতিটি পৃষ্ঠা রোজই তন্নতন্ন করে পড়ে অসমঞ্জ—যদি কোনওরকমে একটা সপ্তাহ হার্টফেলের খবর ছাড়াই পার হয়ে যায়। সেরকম হলে একইসঙ্গে ও স্বস্তি পায়, আবার হতাশও হয়।
একদিন ওর নজরে পড়ল, জনৈক প্রৌঢ় বিজ্ঞানী ঘুমের মধ্যে হার্টফেল করে মারা গেছেন। বিজ্ঞানীর স্ত্রী পূর্ণ যুবতী এবং একজন যুবকের সঙ্গে অবৈধ প্রেমে জড়িয়ে ছিল। সুতরাং পুলিশ সন্দেহ করতে শুরু করল। কাঠগড়ায় তুলল বউটিকে। কিন্তু প্রমাণের অভাবে আর ডাক্তারি রিপোর্টের জোরে সে ছাড়া পেয়ে গেল। ঘরে বসে-বসে হাত কামড়াতে লাগল অসমঞ্জ। নাইট্রেট। নাইট্রেট। কীসের যেন নাইট্রেট? আপ্রাণ চেষ্টায় ট্রেনের আগন্তুকের বলা নামটা মনে করতে চাইল ও। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ল না।
এর পরের ঘটনা ঘটল একবারে অসমঞ্জের নিজের পাড়ায়। রামতনু চন্দ্র নামে ষাট বছরের এক বৃদ্ধকে তার বিছানায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। এ ছাড়া তার বিছানার পাশে একটা ছোট টেবিলে আধগ্লাস জলও পাওয়া গেল। বাড়িতে বুড়ো ছাড়া তার এক অল্পবয়েসি ভাইপো থাকত। সে-ই ছিল বুড়োর তিনকুলে একমাত্র আত্মীয়। বুড়ো মারা যেতে ছেলেটাই খবর দিল পুলিশকে। তার জেঠু নাকি এভাবে হার্টফেল করে মারা যেতে পারে না। তার হার্ট নাকি রেসের ঘোড়ার মতো তেজি ছিল ইত্যাদি-ইত্যাদি। কিন্তু পুলিশি তদন্তের রিপোর্ট বেরোল সেই একই। আর জানা গেল, বুড়ো মারা যাওয়ায় তার ভাইপো বুড়োর রেখে যাওয়া প্রায় দেড়লাখ টাকার সম্পত্তির মালিক হয়েছে।
অসমঞ্জ সবই বুঝল, কিন্তু ওর হাত-পা বাঁধা। কোনও প্রমাণ নেই। ও এও বুঝল, কোন দুঃসাহসে ওই ভাইপো নিজেই পুলিশে খবর দিয়েছিল। কারণ, সে আগে থেকেই জানত, পুলিশ কিছুই প্রমাণ করতে পারবে না। তার জেঠুর কপালে ‘হার্টফেল করে স্বাভাবিক মৃত্যু’-ই লেখা আছে।
সেইদিন সন্ধেবেলায় বরাবরের অভ্যেসমতো পায়চারি করতে বেরোল অসমঞ্জ। নিতান্তই কৌতূহল ওকে টেনে নিয়ে গেল রামতনু চন্দ্রের বাড়ির দিকে। বাড়ির বন্ধ জানলাগুলোর দিকে তাকিয়ে ও যখন উঁকিঝুঁকি মারছে, ঠিক তখনই বাগানের দিকের দরজা খুলে একটা লোক বেরিয়ে এল। রাস্তার আলোয় তক্ষুনি তাকে চিনে ফেলল অসমঞ্জ।
‘এই যে—’ ডেকে উঠল ও।
‘আরে, কী ব্যাপার, আপনি?’ লোকটা হালকা চালে বলল, ‘অকুস্থল পরীক্ষা করতে এসেছেন? তা কী পেলেন বলুন?’
‘না, না।—ওসব কিছু না,’ বিব্রত হয়ে বলল অসমঞ্জ, ‘রামতনুবাবুকে আমি চিনতাম না। খুব অদ্ভুতভাবে আবার আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, তাই না?’
‘হ্যাঁ, যা বলেছেন। আপনি বুঝি কাছেই থাকেন?’
‘হ্যাঁ—’ উত্তর দিল অসমঞ্জ। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, এ-কথা না বললেই ভালো হত। ও পালটা প্রশ্ন করল, ‘আপনিও কাছাকাছি থাকেন নাকি?’
‘না, না।’ জবাব দিল লোকটা, ‘আমি এখানে একটু নিজের কাজে এসেছিলাম।’
‘আগেরবার যখন আমাদের দেখা হয়েছিল, তখন আপনি কী কাজে যেন বর্ধমান যাচ্ছিলেন।’
ওরা এখন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করেছে। অসমঞ্জ আনমনাভাবেই নিজের বাড়ির পথ ধরেছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমতা-আমতা করে বলল লোকটা, ‘হ্যাঁ। কাজের ব্যাপারে আমাকে বহু জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়। কখন যে কোথায় আমার ডাক পড়বে তা আমি নিজেও জানি না।’
‘আপনি যখন বর্ধমানে ছিলেন তখনই তো ওখানকার এক ব্যবসায়ী ঘুমের ঘোরে হার্টফেল করে মারা গেল, তাই না? অসতর্কভাবে মন্তব্য ছুড়ে দিল অসমঞ্জ।
হ্যাঁ। বড় আশ্চর্য কোইনসিডেন।’ চকচকে কাচের পিছন থেকে আড়চোখে ওর আপাদমস্তক দেখে নিল লোকটা ‘ওই ব্যবসায়ী বউ তো এখন বিরাট বড়লোক। দেখতে শুনতেও ভালো—স্বামীর চেয়ে বয়েস অনেক কম ছিল।’
ওরা অসমঞ্জের বাড়ির দরজার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
‘এই আমার বাড়ি। আসুন, এক কাপ করে চা খাওয়া যাক।’ প্রস্তাবটা দিয়েই অসমঞ্জের আবার মনে হল কাজটা ও ঠিক করল না।
লোকটা কিন্তু ওর প্রস্তাবে সঙ্গে-সঙ্গে সাড়া দিল। ওরা দুজনে বাড়িতে ঢুকে বসবার ঘরে গুছিয়ে বসল।
অসমঞ্জ সংসারে একা। সুতরাং চা ও নিজেই তৈরি করে নিয়ে এল। তারপর চিনি নাড়তে-নাড়তে বলল, ‘আজকাল ঘুমের ঘোরে হার্টফেল করাটা খুব কমন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ একটু ইতস্তত করে ও আরও বলল, ‘বিশেষ করে ট্রেনে আপনার সঙ্গে ওই বিষয়ে কথা হওয়ার পর থেকে জিনিসটা আমার আকছারই চোখে পড়ছে—’ সপ্রতিভভাবে একটু হাসল ও: ‘জানেন, আমি ভাবছিলাম…কেউ হয়তো আপনার সেই ওষুধটার নাম জেনে ফেলেছে, তারপর…। কী যেন নাম ওষুধটার?’
লোকটা প্রশ্নটাকে কোনওরকম আমল না দিয়ে সরাসরি এড়িয়ে গেল। বলল, ‘না, না। আমি ছাড়া ওই কেমিক্যালটার কথা আর কেউ জানে না। অন্য কী একটা ওষুধের খোঁজ করতে-করতে নেহাতই ঘটনাচক্রে আমি ওই কেমিক্যালটার খবর পেয়ে গিয়েছিলাম। দেশের নানান জায়গায় সবাই একসঙ্গে একই ওষুধ আবিষ্কার করে বসে আছে, এ-কথা বিশ্বাস করা শক্ত। কিন্তু এসব ব্যাপার থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কত সহজে আর নিশ্চিন্তে কাউকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়।’
