‘কিন্তু এ তো আপনার কল্পনা!’ প্রতিবাদ করল অসমঞ্জ।
‘আপনার তাই মনে হচ্ছে? অবশ্য বেশিরভাগ লোকই এই কথা বলবে। কিন্তু তা হলেও আমি তাদের বিশ্বাস করি না। অন্তত যেখানে ক্যারাসল নাইট্রেট যে-কোনও ওষুধের দোকানে কিনতে পাওয়া যায়।’
‘কী নাইট্রেট?’ তীক্ষ্নস্বরে জানতে চাইল অসমঞ্জ।
‘হুঁ—। আপনি ভাবছেন আমি বোধহয় বেফাঁস কিছু বলে ফেললাম। উহুঁ, আসলে ওই জিনিসটার সঙ্গে আরও দু-একটা জিনিস মেশাতে হয়—সবগুলোই যেখানে-সেখানে সস্তায় পাওয়া যায়। মাত্র চল্লিশ টাকা খরচ করলে আপনি এ-দেশের গোটা মন্ত্রিসভাকে সাফ করে দিতে পারেন। অবশ্য সবাইকে একসঙ্গে সরিয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না—সবাই যদি একই দিনে ঘুমের মধ্যে হার্টফেল করে মারা যায় তা হলে লোকে সন্দেহ করতে পারে।’
‘ঘুমের মধ্যে হার্টফেল? কেন?’
‘কারণ ঘটনা এইভাবেই ঘটে। জলের সঙ্গে বিষটা মিশিয়ে দেওয়ার পর সেটা খেয়ে কেউ যদি ঘুমোয় তা হলে সেটাই হবে তার লাস্ট ঘুম। আসলে ঘুমন্ত অবস্থাতেই বিষটা কাজ শুরু করে। এই কেমিক্যাল রিয়্যাকশনটা এত সহজ যে, কোনও পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে না। ফলে ডাক্তাররা ভাবে হার্টফেল।’
অস্বস্তিভরে লোকটাকে দেখল অসমঞ্জ। হাসিটা ওর পছন্দ হল না। কিছুটা উপহার এবং অহঙ্কার মেশানো হাসি।
‘জানেন, এই যে কাগজে প্রায়ই দেখা যায়, ঘুমন্ত অবস্থায় কেউ-না-কেউ হার্টফেল করেছে, ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত…’ একটা সিগারেট পকেট থেকে বের করে তাতে আগুন ধরাল লোকটা। খুব ধীরে আয়েস করে টান দিল ‘এইরকম স্বাভাবিক মৃত্যু সবসময়েই আমাদের নজরে পড়ছে। সুতরাং, খুনের পথ হিসেবে এই পদ্ধতিটা বেছে নেওয়া খুবই স্বাভাবিক—যদি অবশ্য সব ওষুধ ঠিক-ঠিক মতো মিশিয়ে আসল জিনিসটা তৈরি করা যায়। আর সেটা শিখে গেলে তখন লোভহয় বারবার যাচাই করে দেখতে। এ-লোভের হাত থেকে কারও নিস্তার নেই। যদি শুনি যে, এই ওষুধে তৈরির ফরমুলা আপনার জানা আছে, তা হলে আপনার মতো কোনও নিরীহ সাধুপুরুষকেও আমি আর বিশ্বাস করব না।’
লম্বা সরু আঙুলগুলো আবার বাজনা বাজাতে লাগল হাঁটুর ওপরে।
কিছুটা অপমানিত হয়েই শ্লেষের খোঁচা ছুড়ে দিল অসমঞ্জ ‘কিন্তু আপনার বেলা? কাউকেই যদি বিশ্বাস না করবেন তা হলে নিজের বেলায়…।’
‘ঠিকই বলেছেন,’ নির্লজ্জভাবে উত্তর দিল লোকটা, ‘আমি নিজেকেও বিশ্বাস করি না। কিন্তু একবার জেনে যখন ফেলেছি তখন সেটাকে তো আর অজানা করা যায় না! ব্যাপারটা হয়তো ঠিক নয়—কিন্তু আমার তো কিছু করার নেই। তবে জেনে রাখুন, ঘুমের মধ্যে হার্টফেল আমি করছি না। আরে, বর্ধমান এসে গেছে দেখছি। চলি, নামতে হবে—একটু কাজ আছে।’
চটপট উঠে পড়ে জামাকাপড় ঝেড়ে নিল লোকটা। সিগারেটটা মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে পিষে নিভিয়ে দিল। চশমাটা চোখ থেকে খুলে রুমাল বের করে কাচ দুটো মুছে নিল।
ট্রেন ক্রমে গতি কমিয়ে স্টেশনে এসে থামল। চশমা চোখে লাগিয়ে মুচকি হেসে ছোট্ট করে ‘চলি—’ বলল সে। তারপর নেমে পড়ল ট্রেন থেকে।
বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে।
মাথা ঝুঁকিয়ে স্টেশনের চাঞ্চল্য ও কোলাহলকে উপেক্ষা করে দ্রুতপায়ে হাঁটতে শুরু করল লোকটা। জানলা দিয়ে যতদূর দেখা যায় লোকটাকে দেখল অসমঞ্জ।
‘পাগল, না আর কিছু—’ মনে-মনে ভাবল ও, ‘যাক, এবার একটু একা-একা জিরিয়ে নেওয়া যাবে…।’
‘নর্তকীর অপমৃত্যু’-তে আবার ফিরে এল অসমঞ্জ, কিন্তু বারেবারেই ওর মনোযোগ বিগড়ে যেতে লাগল।
ওই বিষটার কী যেন নাম বলল লোকটা? কীসের নাইট্রেট যেন?
শত চেষ্টা করেও নামটা মনে করতে পারল না ও।
পরদিন বিকেলে খবরটা নজরে পড়ল অসমঞ্জের। সকালে ভালো করে কাগজ পড়ে ওঠার সময় পায়নি। বিকেলের দিকে তিন নম্বর পৃষ্ঠার অপাংক্তেয় খবরটায় হঠাৎই চোখ পড়ে গেল ওর। ‘নিদ্রিত অবস্থায়’ শব্দ দুটো প্রথমে ও দেখতে পায়। তখনই ছোট হরফের হেডিংটা ওর মনোযোগ টেনে নেয়। নইলে গোটা খবরটাই হয়তো ওর চোখ এড়িয়ে যেত।
নিদ্রিত অবস্থায় ব্যবসায়ীর মৃত্যু
৭ আগস্ট, বর্ধমান: আজ রাতে কমল বিশ্বাস (৫৫) নামে জনৈক ব্যবসায়ী নিদ্রিত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকগমন করে। ঘটনাটি অস্বাভাবিক ও বিচিত্র সন্দেহ করে ব্যবসায়ীর স্ত্রী সুলেখাদেবী পুলিশের দ্বারস্থ হন। তাঁর বক্তব্য, স্বামীর কাছ থেকে কোনও যন্ত্রণার শব্দ তিনি শোনেননি বা কোনও অস্থিরতা তাঁর চোখে পড়েনি। এ ছাড়া, আগে ভদ্রলোকের কখনও হৃদরোগের লক্ষণ দেখা যায়নি। কিন্তু পুলিশি পরীক্ষায় জানা গেছে, এ-মৃত্যু স্বাভাবিক হৃদরোগে মৃত্যু। যদিও এরকম সাধারণত দেখা যায় না। ভদ্রলোকের পরিবারবর্গ ও তাঁদের পারিবারিক ডাক্তার এ-অভিমত মানতে রাজি হননি, তাঁরা…।
‘এ তো অদ্ভুত কাকতালীয় দেখছি,’ ভাবল অসমঞ্জ, ‘বর্ধমানেই ঘটল ঘটনাটা। ট্রেনে আমার সঙ্গী সেই রহস্যময় ভদ্রলোক খবরটা পেলে হয়তো কৌতূহলী হতেন—যদি অবশ্য উনি এখনও বর্ধমানে থেকে থাকেন।’
যদি একবার কোনও বিশেষ জিনিসের দিকে কারও মনোযোগ পড়ে, তা হলে সেটা ধীরে-ধীরে মাথার ভেতরে গেড়ে বসে। তখন রাস্তাঘাটে খবরের কাগজে শুধু ওই জিনিসটাই চোখে পড়ে সবার আগে। অসমঞ্জেরও ঠিক তাই হল। রাতদিন শুধু ওর চোখে পড়তে লাগল ‘ঘুমের মধ্যে’ হার্টফেল করে মৃত্যুর ঘটনা। ও অবাক হয়ে ভাবল, ‘ভারতবর্ষে এত লোক ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে হার্টফেল করে মারা যায়! আশ্চর্য, আগে তো কখনও খেয়াল করিনি!’
