বিনা কারণেই কাশল অসমঞ্জ, সিটে নড়েচড়ে আরাম করে বসল। হাতের রহস্য উপন্যাসটাকে মুখের কাছে আড়াল করে ধরল। কিন্তু এতে লাভ হল না একটুও। অসমঞ্জের মনে হল, লোকটা যেন ওর কায়দাকানুন সবই ধরে ফেলেছে এবং তাতে বেশ মজা পেয়েছে। ও উশখুশ করতে চাইল, কিন্তু তক্ষুনি আবার ভাবল, এতে হয়তো একরকম লোকটারই জিৎ হবে। সুতরাং নানান ভাবনায় অসমঞ্জ এত বেশি নাজেহাল হয়ে উঠল যে, হাতের বইয়ে মন দেওয়াটা ওর পক্ষে নিছক অসম্ভব হয়ে উঠল।
দিনটা ছুটির দিন। ফলে ট্রেনে এমনিতেই বেশি ভিড় নেই, এবং এই কামরাটার একটা অংশে অসমঞ্জ এবং সেই বিচিত্র ব্যক্তি একা-একা পরস্পরের মুখোমুখি বসে। ইতিমধ্যে গোটাকয়েক স্টেশন পেরিয়ে এলেও তৃতীয় কোনও যাত্রী ওদের সঙ্গে এসে বসেনি। ফলে এক অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা রাজকীয়ভাবে বজায় থেকেছে। অসমঞ্জ ইচ্ছে করলে এই সিট ছেড়ে উঠে পড়তে পারে, চলে যেতে পারে পাশের খুপরিতে। কিন্তু সেটা হবে নিছক হেরে যাওয়া। অতএব ‘নর্তকীর অপমৃত্যু’ চোখের কাছ থেকে নামিয়ে লোকটার সঙ্গে নজর-মোলাকাত করল অসমঞ্জ।
‘একঘেয়ে লাগছে?’ লোকটা জিগ্যেস করল।
‘তা একটু লাগছে—’ কিছুটা স্বস্তি আর অনিচ্ছা নিয়ে উত্তর দিল অসমঞ্জ। তারপর আরও বলল, ‘বই-টই কিছু পড়বেন?’
অ্যাটাচি কেস থেকে ‘তৃতীয় ব্যক্তি’ বইটা বের করে অনেক আশা নিয়ে সামনে বাড়িয়ে দিল ও।
বইটার নাম একপলক দেখে নিয়ে মাথা নাড়ল লোকটা। বলল, ‘নাঃ, ধন্যবাদ…। আসলে ডিটেকটিভ গল্প আমি একেবারেই পড়ি না। ওগুলো এত খেলো…আপনার কী মনে হয়?’
‘হ্যাঁ, মানে, ক্যারেক্টার বিল্ডিং কিংবা ভ্যালুজের ব্যাপার-ট্যাপারগুলো ওসব বইতে খুব একটা ভালো থাকে না। কিন্তু ট্রেনে সময় কাটাতে হলে…।’
অসমঞ্জকে বাধা দিয়ে লোকটা বলে উঠল, ‘না, না, আমি কিন্তু ঠিক তা বলতে চাইনি। ওসব ভ্যালুজ-ট্যালুজের কথা আমি বলছি না। আসলে গল্পের খুনিগুলো এত বোকা যে, ওদের কাণ্ডকারখানা পড়তে গেলে আমার ঘুম পায়।’
‘সে বলতে পারি না, তবে সত্যিকারের খুনিদের চেয়ে ওদের বুদ্ধি, হাতযশ, ঢের-ঢের বেশি।’ অসমঞ্জ উত্তর দিল।
‘সত্যিকারের খুনিদের মধ্যে যারা ধরা পড়ে…। হ্যাঁ, তাদের চেয়ে গল্পের খুনিদের বুদ্ধি বেশি, মানছি—’ অসমঞ্জের কথা শুধরে দিয়ে বলল লোকটা।
‘তবে অনেক খুনি আবার ধরা পড়ার আগে বেশ চালাকির খেলা দেখিয়েছে।’ অসমঞ্জ প্রতিবাদ জানিয়ে বলল, ‘যেমন রংগা, বিল্লা, রমন রাঘব। তারপর বিদেশিদের মধ্যে ক্রিপেন, ইয়র্কশায়ার রিপার—।’
‘হুঃ—ওদের কাজকর্মের ছিরি আর বলবেন না—’ তাচ্ছিল্যের সুরে বলল লোকটা, ‘বাচ্চাছেলের মতো অগোছালো খুনের জন্যে হাজারোরকম সাজসরঞ্জাম চাই, গাদা-গাদা মিথ্যে কথা বলা—যতসব ফালতু ব্যাপার।’
‘যাঃ—কী যে বলেন। আপনি এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন খুন করে পুলিশকে ফাঁকি দেওয়াটা বাদামের খোসা ছাড়ানোর মতো সোজা!’
মিটিমিটি হাসি কিছুটা প্রশস্ত হল। বলল, ‘হতে পারে—কে জানে।’
মন্তব্যের ভাব সম্প্রসারণের অপেক্ষায় রইল অসমঞ্জ, কিন্তু রহস্যময় মানুষটার কাছ থেকে কোনও ব্যাখ্যা ভেসে এল না। সিটে গা এলিয়ে কামরার কাঠের তৈরি ছাদের দিকে তাকিয়ে কী এক গোপন রসিকতায় খুশি-খুশি হয়ে উঠল সে। মনে হল, এই আলোচনাকে সে কোনও গুরুত্বই দিচ্ছে না, এবং এ নিয়ে কথাবার্তা চালানোর আগ্রহ তার ফুরিয়ে গেছে।
অসমঞ্জ হঠাৎই খেয়াল করল, ও লোকটার হাত দুটো খুঁটিয়ে দেখছে। হাতের রং ফরসা, আর আঙুলগুলো অস্বাভাবিকরকম সরু এবং লম্বা। সেগুলো এখন তার হাঁটুর ওপরে হালকা ছন্দে বাজনা বাজাচ্ছে।
অসমঞ্জ অন্যমনস্কভাবে হাতের বইটার পাতা ওলটাল। তারপর আরও একবার বইটা নামিয়ে রেখে বলল, ‘ঠিক আছে, এতই যখন সোজা, বলুন, আপনি হলে কীভাবে খুন করতেন?’
‘আমি?’ প্রতি-প্রশ্ন করল লোকটা। চশমার কাচে আলো পড়ে তার চোখের দৃষ্টি শূন্য মনে হল। কিন্তু গলার স্বরে বোঝা গেল সে যেন মজা পেয়েছে। লোকটা হেসে বলল, ‘আমার কথা আলাদা। খুন করতে গেলে আমাকে দুবার ভাবতে হবে না।’
‘কেন?’
‘কারণ, একটা গোপন কায়দা আমার জানা আছে।’
‘তাই নাকি?’ অস্ফুটে বললেও অসমঞ্জের স্বরে ব্যঙ্গ চাপা রইল না।
‘নিশ্চয়ই। সে আর কঠিন কী!’
‘সেটাই যে ঠিক কায়দা তা জানলেন কেমন করে? আপনি নিশ্চয়ই আর যাচাই করে দেখেননি?’
লোকটা থেমে-থেমে জবাব দিল, ‘যাচাই করে দেখার দরকার নেই। আমার পদ্ধতির মধ্যে এতটুকু ফাঁক কোথাও নেই। সেটাই হল সেই কায়দার আসল মজা।’
‘বলা অনেক সহজ,’ ছোট্ট করে মন্তব্য করল অসমঞ্জ, ‘কিন্তু আপনার সেই নিখুঁত পদ্ধতিটা কী, একটু বলবেন?’
‘কী করে ভাবলেন মুখের কথা ফেলতে না ফেলতেই সেটা আমি আপনাকে শিখিয়ে দেব?’
ধীরে-ধীরে চোখের নজর অসমঞ্জের ওপর নিয়ে এল লোকটা: ‘তা ছাড়া এভাবে শিখিয়ে দেওয়াটা বিপজ্জনক হতে পারে। আপনাকে দেখে অবশ্য নিরীহ বলেই মনে হচ্ছে—কিন্তু বিল্লার চেহারাও নিরীহ ছিল। অন্য লোকদের জীবন-মরণের পাক্কা মালিক হয়ে বসলে তাকে আর বিশ্বাস করা যায় না।’
অবাক হয়ে অসমঞ্জ বলল, ‘যাঃ, কী যে বলেন! কাউকে খুন করার কথা আমি ভাবতে যাব কোন দুঃখে?’
‘ভাববেন…ঠিক ভাববেন,’ লোকটা বলল, ‘পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার মতো নিখুঁত অস্ত্র হাতে পেলে যে-কেউই খুন করার কথা ভাববে। খুনকে ঘিরে আমাদের দেশের আইন এত নিয়মকানুনের ফ্যাঁকড়া লাগিয়ে রেখেছে কেন বলতে পারেন? কারণ খুনটা যে-কেউ করতে পারে, এটা দু-বেলা ভাত খাওয়ার মতোই ন্যাচারাল।’
