পথিক নিশ্চয়ই হাত নেড়ে ডাকছেন। হ্যাঁ, কোনও সন্দেহ নেই।
নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে বারবার অবাক হলেন নরোত্তম। তারপর চোখ ছোট করে আরও তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে দেখলেন। কী বলতে চাইছেন পথিক? মাসকয়েক আগে হলেও নরোত্তম বলতেন ভদ্রলোক সাহায্যের আশায় চিৎকার করছেন, আকুল কণ্ঠে ওঁকে ডাকছেন, ওঁর ভঙ্গিটা যেন জলে ডুবে যাওয়া অসহায় মানুষের মতো, যেন খড়কুটো পেলেই আঁকড়ে ধরবেন।
কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, নরোত্তমের পক্ষে বলা সম্ভব নয় পথিক আসলে ঠিক কী বলতে চাইছেন।
পরক্ষণেই পথিকের মুখ বিকৃত হল। উনি কী কোনও বাচ্চাকাচ্চার সঙ্গে মুখভঙ্গি করে ছেলেখেলা করছেন? নিশ্চয়ই তা-ই হবে। কোনও ছোট ছেলে কিংবা মেয়েকে মুখ বেঁকিয়ে হাসানোর চেষ্টা করছেন পথিক। বাঃ, বেশ আমুদে লোক তো! নরোত্তম মজা পেলেন।
পথিক এবার ডানহাত বাড়িয়ে জানলার চৌকাঠ আঁকড়ে ধরেছেন। ঘরের ভেতরে ঝুঁকে পড়েছেন সামান্য। হয়তো ওঁর হাত থেকে কিছু একটা পড়ে গেছে—সেটাই ঝুঁকে পড়ে তুলছেন তিনি।
পলকের জন্য হঠাৎই নরোত্তমের মনে হল পথিক চট্টোপাধ্যায় বিপদে পড়েছেন। একবার ভাবলেন, ছুটে গিয়ে ওঁকে সাহায্য করেন, কিন্তু পথিকের বাড়িতে নিশ্চয়ই লোকজন চাকরবাকর আছে। সেখানে নরোত্তম হুট করে গিয়ে হাজির হলে শেষ পর্যন্ত হয়তো পথিকের কাছেই ধাতানি খেতে হবে। একে তো অলকানন্দা রায়ের খুনের ব্যাপারে জড়িয়ে খুব একচোট নাকাল হতে হয়েছে নরোত্তমকে, তারপর…।
তবু নরোত্তমের মনটা খচখচ করতে লাগল। এ-পথে আর কেউ এলে তিনি তাঁকে বলবেন ব্যাপারটা একটু খোঁজখবর করে দেখতে।
নরোত্তম অপেক্ষা করতে লাগলেন, কিন্তু কেউ এল না। তখন আবার তাকালেন জানলার দিকে।
জানলায় কেউ নেই! জানলার ফ্রেম থেকে পথিক অদৃশ্য হয়ে গেছেন। জানলা এখন শূন্য, হা-হা করছে। সবকিছু আবার ঠিকঠাক হয়ে গেছে।
নরোত্তম বসাকের বেড়ানো একসময় শেষ হল। এরপর সাতদিন তিনি বাড়ি থেকে বেরোলেন না। শরতের একটানা অকালবৃষ্টি ওঁকে ঘরকুনো করে রাখল। কাজের লোকটি প্রয়োজনে বেরিয়ে দোকানপাট সেরে দিল। সুতরাং, স্থানীয় খবরগুলো নরোত্তম পাননি। খবরের কাগজও দেখা হয়নি ওঁর।
সুতরাং, তিনি জানতে পারলেন না পথিক চট্টোপাধ্যায় মারা গেছেন। স্ত্রীকে নিয়ে কন্টিনেন্ট ট্যুরে বেরোবেন বলে ঠিক করেছিলেন পথিক। সেই কারণে কিছুদিন ধরে প্র্যাকটিসে বেরোনোও বন্ধ রেখেছিলেন। ঘটনার, অথবা দুর্ঘটনার, দিন বাড়িতে তিনি একা ছিলেন। স্ত্রী বেরিয়েছিলেন বিশ্বভ্রমণ উপলক্ষ্যে শেষ মুহূর্তে কিছু কেনাকাটা সারতে। পথিক জানতেন যে, ওঁর হার্টের অবস্থা ভালো নয়, কিন্তু দুনিয়া চষে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দে তিনি একটা ভারী ট্রাঙ্ক টেনে সরাতে গিয়েছিলেন।
অত্যাধিক পরিশ্রমে পথিক হার্টফেল করে মারা যান। অথচ যে-ট্যাবলেট খেলে ওঁর প্রাণ বাঁচত সেটা প্রায় হাতের নাগালেই ছিল।
এই দুর্ঘটনায় অত্যন্ত বিস্ময় ও দুঃখ প্রকাশ করে মিসেস চট্টোপাধ্যায়কে আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন প্রখ্যাত ব্যাবসায়ী শ্রীজিতেন্দ্রনাথ রায়।
যে জন জানে
হাওড়া থেকে ট্রেন ছাড়ার পর এই নিয়ে অন্তত বিশবার হাতে ধরা ‘নর্তকীয় অপমৃত্যু’ বইটার পাতা থেকে চোখ সরিয়ে উলটোদিকে বসে থাকা লোকটার দিকে তাকাল অসমঞ্জ।
একটু ভুরু কোঁচকাল ও। এভাবে কেউ যদি এত কাছ থেকে কাউকে খুঁটিয়ে নজরবন্দি করে রাখে তা হলে অস্বস্তি হওয়ারই কথা—তার ওপর লোকটার ঠোঁটে লেগে আছে একচিলতে সবজান্তা বিজ্ঞের হাসি। এই জরিপ এবং অদ্ভুত হাসিতে অসমঞ্জের অস্বস্তি আরও দশগুণ বেড়ে গেল। জোর করে লোকটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বইয়ের পাতায় নজরটাকে স্ক্রু দিয়ে এঁটে দিতে চাইল। লাস্যময়ী নর্তকী লিজা কীভাবে অন্ধকার বলরুমে রহস্যজনকভাবে ছুরির আঘাতে মারা গেল সেই ধাঁধার মধ্যেই জোর করে ডুবিয়ে দিতে চাইল নিজেকে।
কিন্তু গল্পটা একটু বুদ্ধিজীবীদের ঢঙে লেখা। প্রথম দু-তিনটে পরিচ্ছেদ নানান বিক্ষিপ্ত ঘটনার ঘনঘটায় ভরা। তারপর লেখক ধীরে-ধীরে বিশ্লেষণের এক-একটা ধাপে পা রেখে এগিয়ে গেছেন শেষ পরিচ্ছেদের বৈজ্ঞানিক সমাধানে। পড়তে-পড়তে বেখেয়ালে এড়িয়ে গেছে এমন দু-একটা সূত্র মিলিয়ে নিতে দুবার অসমঞ্জকে ফিরে আসতে হল পিছনদিকের পাতায়। ঠিক তারপরই ও টের পেল, নিহত নর্তকীর কথা মোটেই ও আর ভাবছে না—বরং উলটোদিকে বসে থাকা অদ্ভুত লোকটার অদ্ভুত মুখটাই বারবার ভেসে উঠছে ওর চোখের সামনে। বিচিত্র পাবলিক তো, ভাবল ও।
অবশ্য লোকটার চেহারায় আঙুল তুলে দেখানো যায় এমন কোনও বিশেষত্ব নেই। কিন্তু তার চোখের চাউনিটাই ভয় পাইয়ে দিয়েছে অসমঞ্জকে। এই চাউনি যেন চিৎকার করে বলছে, আমি সবার গোপন খবর জানি। পাতলা ঠোঁটের কোণটা সামান্য বেঁকে গিয়ে শক্তভাবে বন্ধ হয়েছে, তার ওপর লোকটা লুকোনো কোনও রসিকতায় তারিয়ে-তারিয়ে মিটিমিটি হাসছে। রিমলেস চশমার কাচের পিছনে চোখ দুটো জ্বলছে অদ্ভুতভাবে—কিন্তু তা হয়তো জানলা দিয়ে ঠিকরে আসা আলোর ছটায়।
লোকটার পেশা আন্দাজ করার চেষ্টা করল অসমঞ্জ। পরনে সাধারণ আধময়লা চেক শার্ট আর কালো ঢোলা প্যান্ট। বয়েস হয়তো চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবে।
