বিশ্বনাথ মোবাইল বের করে ওকে ফোন করলেন।
‘হ্যালো, বাইশ। কেমন আছ?’
‘কী ব্যাপার? হারিয়ে গেলেন নাকি?’ তিতলি নয়, ওর অভিমান কথা বলল বলে মনে হল বিশ্বনাথের।
‘গুড মনিং, বাইশ—।’
‘গুড না ছাই! ফোন করতে আর-একটু দেরি হলেই মর্নিংটা ব্যাড হয়ে যেত।’
‘কেন? তুমি তো ফোন করতে পারতে আমাকে—।’
‘পারতাম। কিন্তু সকালের প্রথম ফোনটা আপনার কাছ থেকে পেতে ভালো লাগে।’ হাসল তিতলি: ‘থ্যাংকস ফর দ্য সুইট বাইট লাস্ট নাইট।’
মনে পড়ে গেল কাল রাতের কথা। বিশ্বনাথ একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন। নীল আলোয় যা আকাঙ্ক্ষার মনে হয়েছিল এখন ঝকঝকে রোদে সে-কথা মনে পড়তেই বিব্রত হয়ে পড়লেন হঠাৎ।
তারপর উঠল বিশ্বনাথের লিখে আসা দু-লাইন চিঠিটার কথা। কথা চলল, এবং চলতেই থাকল।
সময় ভুলে গেলেন বিশ্বনাথ। আর তিতলিও।
বিশ্বনাথের মনে পড়ল, বাড়িতে যেদিন ওঁর মোবাইল ফোনের রিং-এর শব্দ আলোক প্রথম শুনতে পেয়েছিল সেদিন ওর মুখের অবস্থাটা কী বিচ্ছিরিই না হয়েছিল। বিশ্বনাথের ঘরে ছুটে এসে গায়ের ওপরে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল ছেলে। অবাক গলায় জিগ্যেস করেছিল, ‘এ কী, বাবা, তুমি মোবাইল ফোন কিনেছ?’
‘হ্যাঁ, কী হয়েছে?’ শান্ত গলায় পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন বিশ্বনাথ।
‘না, অনেক টাকার ব্যাপার…তাই…।’
‘ঘরে যাও। পারমিতা তোমাকে বোধহয় ডাকছে।’
ভিক্টরের মতো গরগর করতে-করতে চলে গিয়েছিল আলোক।
পারমিতার কাছে অনেক খবরই ও পাচ্ছে আজকাল।
বিশ্বনাথ বড্ড বেশি বাড়ির বাইরে-বাইরে কাটাচ্ছেন। নতুন-নতুন জামাকাপড় তৈরি করাচ্ছেন। পারফিউম স্প্রে করছেন। আগে তিন-চারদিন পরপর শেভ করতেন—এখন রোজ করছেন। দু-একদিন ওঁকে ফুল হাতে নিয়ে ঢুকতে দেখেছে পারমিতা।
ছেলে আর বউমার বিস্ময় অবশ্যই টের পান বিশ্বনাথ। কিন্তু তাতে ভ্রূক্ষেপ করেননি। পুরোনো জীবনকে তোয়াক্কা না করাটা এখন ওঁর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে।
তিতলির সঙ্গে, বলতে গেলে রোজই দেখা করেন বিশ্বনাথ। ওর সঙ্গে পথে বেরিয়ে নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ান। তিতলির যেমন খেয়াল হয় সেভাবেই ওদের পা চলে।
একদিন তিতলি বলল, কলকাতার টুরিস্ট স্পটগুলো ঘুরে-ঘুরে দেখবে। ব্যস, অমনই ওদের ট্যুর শুরু হয়ে গেল। পুরো চারদিন লেগেছিল সবগুলো দেখে শেষ করতে।
ওর ছেলেমানুষি দেখে বিশ্বনাথ মজা পান। সেইসঙ্গে ভালোও লাগে। ওর মনের সমস্ত ভাবনা, খামখেয়ালিপনা, এত স্পষ্ট, এত খাঁটি যে, তার তুলনা নেই। মনটা পড়ে নেওয়া যায় খোলা খাতার মতো।
একদিন সন্ধেবেলা ময়দানে হাঁটতে-হাঁটতে তিতলি বলল, ‘হাতে আমার যদি বেশি সময় থাকত তা হলে ভালো হত…।’
‘তার মানে?’ বিশ্বনাথ জিগ্যেস করলেন।
‘মানে বাইশ থেকে বাষট্টিতে পৌঁছতে ইচ্ছে করছে। সবকিছু ছেড়ে চট করে চলে যেতে মন চাইছে না…।’
‘কোথায় চলে যাবে?’
চলতে-চলতে হঠাৎই থমকে দাঁড়াল। আঙুল তুলে আকাশের দিকে দেখাল।
‘এসব পাগলামি ছাড়ো! কে তোমাকে চলে যেতে দিচ্ছে?’
‘কে আটকাবে? আপনি?’
‘যদি বলি হ্যাঁ—আমি।’ বেশ জোর করে বললেন বিশ্বনাথ।
মনমরা হাসল তিতলি: ‘আপনি পারবেন না। ওরা প্রফেশন্যাল। ডেঞ্জারাস।’
‘আর তুমি তো জানো, আমি বোকা এবং ডেঞ্জারাস—।’
তিতলি কোনও জবাব দিল না। ঠোঁটের কোণ দিয়ে হাসল শুধু।
বিশ্বনাথ তিতলির জন্য ভীষণ চিন্তা করছিলেন।
গত দশ-বারোদিন ধরে হুমকি-ফোনের ব্যাপারটা বেশ বেড়ে গেছে। তিতলিও ভয়ে সিঁটিয়ে গেছে যেন। যখন ও মরতে ভয় পেত না তখন ওর কোনও ভয় ছিল না। যেদিন থেকে ওর বাষট্টি হতে ইচ্ছে করছে, একটু-আধটু বাঁচতে ইচ্ছে করছে, সেদিন থেকে ভয় চুঁইয়ে-চুঁইয়ে ঢুকে পড়ছে ওর ভেতরে।
সন্ধে হয়ে আসছে দেখে বিশ্বনাথ বললেন, ‘বাইশ, এবার বাড়ি ফেরা যাক—।’
পশ্চিমের আকাশের দিকে তাকিয়ে তিতলি বলল, ‘এখনও সূর্য অস্ত যায়নি।’
‘দেরি করার কী দরকার!’ বিশ্বনাথের কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। বারবার চারপাশে তাকাচ্ছিলেন।
লাল সূর্যের দিকে চোখ রেখে তিতলি বলল, ‘বাষট্টি, কাল আমরা দূরে কোথাও বেড়াতে যাব।’
‘কোথায়?’
‘কাল ভোরে উঠে যেদিকে যাওয়ার ইচ্ছে হবে সেদিকে…।’
হঠাৎই বিশ্বনাথ দেখলেন, তিনটে লোক মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে। তার মধ্যে একজন একটু বেশি লম্বা।
ভয় চলকে উঠল। অদৃশ্য গিটারের মোটা তার ঝংকার তুলল বিশ্বনাথের বুকের ভেতরে।
মাঠে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরও লোকজন রয়েছে। বিপদে পড়ে চিৎকার করে উঠলে তারা নিশ্চয়ই ছুটে আসবে, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।
বিশ্বনাথ এ-কথা ভাবছিলেন এবং আড়চোখে লোক তিনটের দিকে নজর রাখছিলেন।
তিতলি লাল-হয়ে-যাওয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনাভাবে নানান কথা বলছিল। কিন্তু সব কথা বিশ্বনাথের মাথায় ঢুকছিল না। কারণ, লোক তিনটের দিকে লক্ষ করছিলেন।
হঠাৎই বিশ্বনাথ ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন।
লোক তিনটে মোটেই ওদের দিকে আসছিল না। ওরা হাঁটতে-হাঁটতে একটা গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়াল। সেই গাছ-বরাবর তাকালে দূরের রাস্তায় তিতলির শ্যাওলা রঙের গাড়িটা চোখে পড়ছে। অর্থাৎ, গাড়ির কাছে যেতে হলে লোকগুলোকে ডিঙিয়ে যেতে হবে।
বিশ্বনাথ আরও লক্ষ করলেন, গাছের নীচটায় ছায়া নেমে এসেছে। মাঠের লোকজনও কমে যাচ্ছে দ্রুত।
আর ঝুঁকি নেওয়ার কোনও মানে হয় না। তিতলিকে হাত ধরে টান মারলেন বিশ্বনাথ, ‘বাইশ, চলো, আর দেরি করা ঠিক হবে না।’
