টুকরো-টুকরো খবর নরোত্তমের কানে আসতে লাগল। সেগুলো জোড়া দিয়ে ঘটনা প্রবাহের কাঠামো তৈরি করতে লাগলেন তিনি।
এরপরে জানা গেল জিতেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিবাহটি প্রেমঘটিত। কথাটা কানে আসামাত্র অবাক হলেন নরোত্তম। এমনিতে সারাটা দিন ওঁর অলসভাবেই কাটে। সুতরাং ইচ্ছে না থাকলেও সংগ্রহ করা খবরগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করার কাজটা অজান্তেই ঘটে যায়। নরোত্তম বসাককে আরও যে খবরটা অবাক করল সেটা হল জিতেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় স্ত্রী দিল্লির বাসিন্দা। হাজার-দেড়হাজার মাইল দূরের একটা মেয়ের সঙ্গে কী করে জিতেন্দ্রনাথের প্রণয় ঘটল সেটা ভেবে বেশ অবাক হলেন নরোত্তম। অবশ্য এটা ঠিক যে, ব্যাবসার কাজে জিতেন্দ্রনাথকে দিল্লিতে প্রায়ই যেতে হত। কিন্তু মাত্র দু-মাসের মধ্যে পরিচয় প্রণয় বিবাহ…নাঃ, এসব উলটোপালটা ভাবা ঠিক হচ্ছে না। নিজেকে প্রায় ধমকই লাগালেন নরোত্তম। কারও ক্ষেত্রে দু-মাস লাগে, কারও বা দু-দশ বছর। এ জাতীয় জিনিসের আবার নির্দিষ্ট সময় বাঁধা আছে নাকি!
ব্যাবসার কাজে দিল্লি গেলে জিতেন্দ্রনাথ বরাবরই প্রচুর টাকা খরচ করে আসতেন। এ-খবরটা জানতেন একমাত্র জিতেন্দ্রনাথের পারসোনাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট। এই বেহিসেবি খরচের ফলে ওঁর ব্যবসা কিছুটা টলোমলো হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন আর কোনও ভয় নেই। অলকানন্দার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া প্রচুর সম্পত্তি জিতেন্দ্রনাথের টালমাটাল ব্যাবসাকে সুস্থির করবে। তা ছাড়া দিল্লিতে ব্যাবসার কাজ গুটিয়ে নেওয়ায় এখন জিতেন্দ্রনাথকে সেখানে আর ট্যুরে যেতে হয় না ফলে ওদিকটায় অর্থের অপচয় একেবারেই কমে গেছে।
এই খরচগুলো আর কেউ যেমন জানে না, তেমনি নরোত্তমও জানতেন না। জানলে পরে আবার কিছুটা অস্থির ও উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। দুশ্চিন্তা উড়ে এসে জুড়ে বসত মাথায়।
নরোত্তমের নিয়মিত জীবনযাত্রা আবার সুশৃঙ্খল হয়ে পড়ল।
অলকানন্দা রায়ের খুনের ঘটনা একরকম ভুলেই গেছেন নরোত্তম। এখন তিনি গোবিন্দ সমাজপতি, জিতেন্দ্রনাথ রায়, পথিক চট্টোপাধ্যায়—সবাইকেই ভুলে যেতে চান। বিশেষ করে পথিকের ভয়ে তিনি সর্বদা বিব্রত থাকেন। কোনদিন হুট করে না ওঁকে শাসাতে চলে আসেন!
প্রথমটায় নরোত্তম ঠিক করেছিলেন ভোরবেলা চলার পথে পথিক চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির রাস্তাটা এড়িয়ে চলবেন। কিন্তু পথটার সৌন্দর্য এত অপরূপ যে, সে-দৃশ্যকে হারাতে মন চায় না। সুতরাং, নরোত্তম শেষ পর্যন্ত একটা উপায় খুঁজে বের করলেন। তিনি ঠিক করলেন, অনেক বেলার দিকে ওই পথে হাজির হবেন তিনি। তা হল পথিকের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।
এইভাবে রোজকার নিয়মের ছক সামান্য অদলবদল করে নিলেন নরোত্তম।
হঠাৎই একদিন চলার পথে পথিক চট্টোপাধ্যায়কে দেখতে পেলেন। তবে শুধু পথিক নয়, সঙ্গে রয়েছেন জিতেন্দ্রনাথ।
নরোত্তম থমকে দাঁড়ালেন। বুকের ভিতরটা ঢিপঢিপ করতে লাগল। একেবারে জোড়া বাঘের মুখোমুখি। এখুনি কী উলটোদিকে হাঁটা দেবেন। নাকি রাস্তা পেরিয়ে চলে যাবেন অপর ফুটপাথে?
দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে নরোত্তম সিদ্ধান্ত নিতে ব্যস্ত ছিলেন, তবে ওঁর চোখ সামনের খুঁটিনাটি দৃশ্যগুলো অভ্যাসবশে জরিপ করে নিচ্ছিল।
পথিক চট্টোপাধ্যায়ের হাত-পা নাড়া এবং কথাবার্তা বলার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছে তিনি অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত। মাঝে-মাঝে ব্যঙ্গের হাসিও খেলে যাচ্ছে পথিকের ঠোঁটে। যেন জিতেন্দ্রনাথকে বেশ বাগে পেয়েছেন তিনি। ওদিকে জিতেন্দ্রনাথ চোখ ছোট করে ঠোঁট কামড়ে রয়েছেন। পথিকের কোনও কথাই ওঁর কানে ঢুকছে না। যেন অন্য কোনও মতলব ভাঁজছেন।
হঠাৎই নরোত্তম খেয়াল করলেন, তিনি আবার সেই পুরোনো তত্ত্বের ওপরে ভিত্তি করে আকাশকুসুম কল্পনা করতে শুরু করেছেন। ভাবভঙ্গি আচার আচরণ ইত্যাদির নীরব ভাষা আঁচ করতে চেষ্টা করছেন। নাঃ, এসব উদ্ভট কল্পনার কোনও মানেও হয় না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উলটোদিকের পথ ধরলেন নরোত্তম। ভুল, ভুল, সব ভুল! যে-মানুষ কানে শুনতে পায় সে হয়তো বলবে পথিক আর জিতেন্দ্রনাথ কোনও ব্যাবসায়িক আলোচনা করছেন।
বাড়ি ফেরার পথে ক্লান্তভাবে হাঁটছিলেন নরোত্তম। ভাবছিলেন, এবারে ছেলেমেয়ের কাছে ফিরে যাবেন কিনা। কিন্তু সেখানেও কী সুখ কিংবা স্বস্তি আছে!
সুখ-শান্তি ইত্যাদির ব্যাপারে ভাবতে-ভাবতে নরোত্তম বাড়ি পৌঁছে গেলেন। এবং ঠিক করলেন, পরদিন থেকে তিনি পথিকের উলটোদিকের ফুটপাথ ধরে নির্বিঘ্নে চলে যাবেন। ওই পথের আকর্ষণ কিছুতেই ওঁর মতো সৌন্দর্যলোভী বৃদ্ধকে মুক্তি দিচ্ছে না।
নরোত্তমের নতুন পরিকল্পনাতেও খুঁত থেকে গিয়েছিল।
পথিক ও জিতেন্দ্রনাথকে দেখার ঠিক পাঁচদিন পর একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন নরোত্তম। যথারীতি উলটোদিকের ফুটপাথ ধরে ধীরেসুস্থে এগোচ্ছিলেন। পথিক চট্টোপাধ্যায়ের প্রাসাদপ্রতিম অট্টালিকাটি পেরিয়ে যাওয়ার সময় নিছকই কৌতূহলে বাড়িটার দিকে ঘাড় ফেরালেন তিনি। এবং তখনই দৃশ্যটা ওঁর নজরে পড়ল।
দোতলার জানলায় দাঁড়িয়ে পথিক পাগলের মতো হাত নেড়ে নরোত্তম বসাককে ডাকছেন।
না, ঠিক হাত নেড়ে ডাকছেন তা বোধহয় বলা যায় না। পথিক যে কী করছেন তা বলা মুশকিল। না, ভাবভঙ্গি দেখে মানুষের মনের কথা আঁচ করার অপচেষ্টা ছেড়ে দিয়েছেন নরোত্তম।
