না, পথিক ওঁকে ধমক দিয়ে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন না। বরং সব শুনতে লাগলেন। আর একটানা বলে যেতে লাগলেন নরোত্তম।
কথাগুলো পথিক শুনছিলেন: তবে তেমন একটা মনোযোগ দিচ্ছিলেন না। কিন্তু যে-মুহূর্তে নরোত্তম খুনের ভাবভঙ্গি ইত্যাদি নিয়ে কথা শুরু করলেন তক্ষুনি কাগজ-পেনসিল টেনে নিয়ে পথিক খসখস করে লিখেলেন ‘খুনের ভঙ্গি! হুঁঃ! যতসব গাঁজাখুরি তাপ্পি!’
একজন প্রাক্তন এম.এল.এ-র শব্দচয়নের পছন্দ দেখে নরোত্তম বেশ অবাক এবং আহত হলেন। কিন্তু পথিক তখনও টেবিলে ঝুঁকে পড়ে লিখে চলেছেন: ‘আপনাকে এই শেষবারের মতো বলছি, যদি বাকি জীবনটা ঘানি ঘোরাতে না চান তা হলে জিতেনের ব্যাপারে আর নাক গলাবেন না।’
ব্যস, তৎক্ষণাৎ আসন ছেড়ে কোনওরকম সৌজন্যসূচক বিদায় সম্ভাষণ না জানিয়ে ঝড়ের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন পথিক চট্টোপাধ্যায়। একটু পরেই বাইরে গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার শব্দ শোনা গেল।
তখন সন্ধের আঁচল ধীরে-ধীরে বিছিয়ে পড়ছে পৃথিবীর ওপরে।
সন্ধে গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে একসময় আঁধার নেমে এল। স্থবিরের মতো একইভাবে চেয়ারে বসে রইলেন নরোত্তম। এক বিচিত্র লজ্জা ওঁকে পরতে-পরতে জড়িয়ে ধরতে লাগল।
পথিকের এত রাগারাগি ওঁর পছন্দ হয়নি—কিন্তু বারবার ওর মনে হতে লাগল সেজন্য তিনি নিজেই দায়ী। নিজের চোখে তিনি একটা খুন হতে দেখেছেন, এ-কথাটা কি একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যায়নি! যদি এই খুন নিয়ে কোনও মামলা হয়, তা হলে সে মামলায় ওঁর সাক্ষ্য যে ধোপে টিকবে না তাতে নরোত্তমের কোনও সন্দেহ নেই। ভীমরতি ধরা সত্তর বছরের এক বুড়োর কথার কে কানাকড়ি দাম দেবে! তা ছাড়া, একজন পুরুষ একজন মহিলার ওপরে ঝুঁকে পড়েছে এটা একঝলক দেখেই কি সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, পুরুষটি মহিলাটিকে খুন করছিল? কানে কালা হলেই কি কোনও মানুষ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবভঙ্গি বা অভিব্যক্তি জলের মতন ব্যাখ্যা করে ফেলতে পারে? নরোত্তম এই মুহূর্তে নিজেই নিজের বিপক্ষে রায় দিলেন। সত্যি, কী বোকার মতোই না তিনি ভেবেছেন, কানে কালা হয়ে ওঁর মধ্যে নতুন এক ক্ষমতা জন্ম নিয়েছে।
ভাবতে-ভাবতে সময় যতই কাটতে লাগল নরোত্তম বসাক ততই নিশ্চিত হতে লাগলেন যে, ওঁর সমস্ত অনুমানই আজগুবি, উদ্ভট কল্পনা—যে-লোকটিকে তিনি ভেবেছেন হতাশায় ঝুঁকে আছে সে হয়তো আসলে ঝুঁকে পড়ে পেট চেপে হাসিতে ফেটে পড়ছে। যে-লোকটি ছটফটে উড়ু-উড়ু পা ফেলে হেঁটে চলেছে, নরোত্তম ভাবলেন সে কোনও খুশির খবর দিতে অথবা নিতে চলেছে কারও কাছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, না, লোকটা হয়তো নিজের হতাশা ও দুঃখ ঢেকে ওইরকম লোকদেখানো চালে হেঁটে চলেছে। চলার পথে নরোত্তম যখন কোনও বালককে হাসি মুখে হাতে হাত ঘষতে দেখেন তখন ভাবেন সে বোধহয় নিজের খুশির জগতে আপনমনেই বাহবা কুড়োচ্ছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ছেলেটি হয়তো প্রতিবেশীর পোষা কুকুরটিকে লাঠিপেটা করতে পেরে বেজায় খুশি হয়েছে।
নাঃ, নরোত্তমের শব্দহীন দুনিয়ার যে-যে নিয়ম কানুনগুলো ধীরে-ধীরে তিলে-তিলে গড়ে উঠেছিল সেগুলো আজ পথিকের তিরস্কারে কাচের মিনারের মতো ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়েছে।
চারিদিক কেমন ফাঁকা-ফাঁকা ঠেকল নরোত্তম বসাকের কাছে। একবার মনে হল, তিনি শহরের বাড়িতেই ফিরে যাবেন—ঢের হয়েছে, এখানে আর নয়। অথচ এখানে যে-সুখ ও প্রশান্তি তিনি পেয়ে থাকেন তার তুলনা কোথায়! শুধু একবারই যা—।
হঠাৎই খুশি হয়ে উঠলেন নরোত্তম। পথিক ওঁর অন্তত একটা বিরাট উপকার করেছেন। একটা কাল্পনিক পথ থেকে সরিয়ে এনে ওঁকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন বাস্তবের সঠিক পথে। মানুষের আচার-আচরণ কিংবা ভাবভঙ্গি সবসময়েই বিভ্রান্তিকর। না, এখন আর কোনও সন্দেহ নেই নরোত্তমের মনে।
গোবিন্দ সমাজপতি হয়তো ঠিক এই কারণেই আর কোনও খবর দেননি নরোত্তমকে। তদন্ত করতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছেন সমাজপতি। প্রথম ধাক্কা হয়তো জিতেন্দ্রনাথ, দ্বিতীয় ধাক্কা পথিক, এবং তৃতীয় ধাক্কা নরোত্তমের বৃদ্ধ বয়েস। ছিঃ, ভালোবাসার আলিঙ্গনকে তিনি ভেবেছেন খুনির সর্বনাশা আক্রমণ! কী লজ্জা, কী লজ্জা!
নরোত্তম জোর করে মনটাকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেন অন্য কোনও প্রসঙ্গে। অলকানন্দা রায়ের খুনের ঘটনা ওঁকে আমূল ভুলে যেতে হবে। বরং তার চেয়ে ভাবা যাক চড়ুইপাখি বছরে ক’বার ডিম পাড়ে, কীভাবে লালনপালন করে তার বাচ্চাদের।
আবহাওয়া সেই খুনের দিন থেকেই সেজেগুজে সুন্দর হতে শুরু করেছে। আজকের দিনটা দেখে মনে হয় তার সাজগোজ এখনও শেষ হয়নি। নিয়মিতভাবেই ভোরবেলা বেরিয়ে পড়েন নরোত্তম। তবে ভুল করেও রায়বাংলোর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন না। যে-ভুল একবার হয়ে গেছে তা জেনেশুনে দ্বিতীয়বার করার কোনও মানে হয় না।
মাস-ছয়েক এইভাবেই কেটে গেল। তারপর একটা ঘটনা ঘটল।
জিতেন্দ্রনাথ বিয়ে করলেন দ্বিতীয়বার। একটা মাঝারি মাপের উৎসবও হল। বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন হাজির হলেন উৎসব-বাড়িতে। খুশি হয়তো সকলেই হয়েছেন, তবে নিমন্ত্রিতদের কয়েকজন মন্তব্য করলেন, অলকার মৃত্যুর পর এত সাততাড়াতাড়ি জিতেন্দ্রনাথ বিয়ে না করলেই পারতেন। কিন্তু পথিক চট্টোপাধ্যায় বা অলকানন্দার বাড়ির তরফ থেকে কোনওরকম অনিচ্ছার বা অসন্তুষ্টির ইঙ্গিত পাওয়া গেল না। বরং এই দ্রুত বিবাহের এরকম একটা ব্যাখ্যাও শোনা গেল যে, অলকানন্দাকে জিতেন্দ্রনাথ এত ভালোবাসতেন যে, ওঁর জায়গা একেবারে শূন্য রাখতে তিনি অসহ্য কষ্ট পাচ্ছিলেন। সুতরাং দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারটা জিতেন্দ্রনাথ ও অলকানন্দার গভীর ভালোবাসাকেই সমর্থন করল।
