পরমুহূর্তেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে যে-লোকটি প্রায় ছুটে এল নরোত্তম বসাকের দিকে তাকে দেখে আরও শতগুণ অবাক হলেন নরোত্তম।
অঙ্গভঙ্গিশাস্ত্রে নরোত্তমের পারদর্শিতা ওঁকে জানিয়ে দিল, আগন্তুক এত উত্তেজিত যে হয়তো ওঁকে আক্রমণ করে বসতে পারে। লোকটা চিৎকার করে কথা বলছে—কারণ, তার ঠোঁট নড়ছে সেই ভঙ্গিতে, একইসঙ্গে সে ক্ষিপ্তভাবে হাত-পা ছুড়ছে।
বসাক লোকটিকে চেনেন।
প্রতিদিন সকালে পায়চারি করতে বেরিয়ে এই লোকটিকেই তিনি ব্যস্তভাবে দরজায় তালা দিয়ে কালো অ্যামবাসাডারে উঠে বসতে দেখেন।
আমি আপনাকে চিনি। রোজই দেখি। কিন্তু কোনওদিন ভাবিনি আপনি আমার বাড়িতে আসবেন। মনে-মনে এই কথাগুলো বলতে চাইলেন নরোত্তম।
মুখে একটাও শব্দও উচ্চারণ করেননি নরোত্তম। শুধু নিজেকে সতর্ক করলেন, এখন না বোকার মতো কোনও কথা বলে বসেন। বিভ্রান্তের মতো এলোমেলোভাবে পকেট হাতড়ে প্যাড ও পেনসিল বের করলেন। সে-দুটো বাড়িয়ে ধরলেন আগন্তুকের দিকে।
আমতা-আমতা করে সংকোচের সুরে বললেন নরোত্তম, ‘ইয়ে…মানে আমি কানে শুনতে পাই না। আপনি কী বলছেন কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার নাম নরোত্তম বসাক। আপনি কি আমাকেই খুঁজছেন? মানে, মনে হচ্ছে কিছু একটা বিপদে পড়েছেন…। কী ব্যাপার? আমি কি কোনওরকম হেলপ করতে পারি?’
লোকটা প্যাড-পেনসিল একরকম ছিনিয়েই নিল নরোত্তমের হাত থেকে। গাড়ির বনেটের ওপরে ভর রেখে কী যেন লিখতে গেল, কিন্তু তখুনি প্যাডটা ফসকে পড়ে গেল ফুটপাথে। সেটা ঝুঁকে পড়ে তাকে তুলতে হল।
ব্যাপার-স্যাপার দেখে নরোত্তম শান্ত গলায় বললেন, ‘আসুন, আমার ঘরে আসুন। বসে ধীরে সুস্থে কথা বলা যাবে।’
লোকটা তাড়াহুড়ো করে কী যেন একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর বসাককে অনুসরণ করে ঘরে ঢুকল।
ছোট একটা টেবিলকে মাঝখানে রেখে দুজনে দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসলেন। একটা জানলা দিয়ে বিকেলের মরা রোদ ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আগন্তুক ক্ষিপ্র হাতে প্যাডের কাগজে পেনসিল চালাতে লাগলেন। মনে হল তার সমস্ত ক্রোধ এবং উত্তেজনা হাত বেয়ে এসে উপচে পড়ছে প্যাডের ওপর। লেখা অক্ষরগুলো মাপে এত বড় যে, একটা পাতায় সাত-আটটা শব্দের বেশি ধরছে না। লেখার শেষে প্রথম পাতাটা ভদ্রলোক গুঁজে দিলেন নরোত্তমের নাকের ডগায়। শব্দগুলো পাঠ করে নরোত্তম একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেছেন।
‘বেহায়ার মতো পরের ব্যাপারে নাক গলানোটা বন্ধ করবেন।’
প্রথম পাতা পড়ার আকস্মিক ধাক্কাটা সামলে উঠতে না উঠতে দ্বিতীয় পাতাটা ঝটিতি এসে গেল নরোত্তম বসাকের চোখের সামনে।
‘জিতেন অলকাকে ভালোবাসত। ওর মৃত্যুতে জিতেন ভীষণ…।’
আর-একটা পাতা এগিয়ে এল।
‘শক পেয়েছে। গত পরশু ও আত্মহত্যা…।’
আবার একটা নতুন পাতা।
‘করার চেষ্টা করেছিল।’
স্লিপের পর স্লিপ আসতে লাগল। ভদ্রলোকের বক্তব্য যেন আর শেষই হতে চায় না।
নরোত্তম এক-একটা পাতা পড়ে ওঠার আগেই নতুন-নতুন পাতা এসে হাজির হতে লাগল। তবে প্রতিটি শব্দেই যে তীব্র ঘৃণা, অভিযোগ, সাফাই, আর শাসানি লুকিয়ে রয়েছে সেটা বুঝতে নরোত্তমের কোনও অসুবিধে হল না।
‘আপনার আজগুবি গপপো পুলিশ আমাদের বলেছে। জিতেন আর অলকার ভালোবাসায় কোনও খাদ ছিল না। অলকার বাড়ির লোকেরা পর্যন্ত জিতেনের নামে পাগল। আমি সম্পর্কে অলকার একরকম মামা হই। তা ছাড়া জিতেন আমার ক্লায়েন্ট। ওদের পরিবারের মুখে কেউ কাদা ছোড়ার চেষ্টা করলে আমাকে তার মোকাবিলা করতেই হবে। আপনার কি মশাই ভীমরতি ধরেছে? আপনি সেদিন যা দেখেছেন তা হল জিতেন অলকাকে আদর করছিল। অফিসে বেরোনোর আগে রোজই তাই করত। সেদিন হঠাৎ আপনি দেখে ফেলেছেন। আপনি এতই নোংরা চরিত্রের লোক যে, এটা নিয়ে জিতেনকে আজ ব্ল্যাকমেল করতে গিয়েছিলেন? রিসেপশনিস্ট মিস সরকার সাক্ষী আছেন। আপনি যদি এ নিয়ে বেশি প্যাঁচ খেলার চেষ্টা করেন তা হলে সোজা ঘানি ঘুরিয়ে ছাড়ব বলে রাখছি। মানহানি—ব্ল্যাকমেল—মিথ্যে সাক্ষী—সবকিছু নিয়ে একেবারে ফাঁসিয়ে দেব।’
প্রতিটি শব্দ যেন এক-একটা গুলির মতো। নরোত্তম বসাক আকস্মিক আঘাতে-আঘাতে রীতিমতো বেসামাল হয়ে পড়লেন। তবু অতি কষ্টে চেয়ারের হাতল ধরে নিজেকে সামলে নিতে চেষ্টা করলেন। আগন্তুক তখন তার লেখা থামিয়েছে, কিন্তু রাগে চোখ-মুখ ফেটে পড়ছে।
‘আপনার নামটা জানতে পারি?’ নরোত্তম প্রশ্ন করলেন ক্ষীণ কণ্ঠে।
লোকটি ঝটপট পেনসিলের আঁচড় টেনে একটি স্লিপ বাড়িয়ে দিল ওঁর দিকে।
পথিক চট্টোপাধ্যায়।
আশ্চর্য হলেন নরোত্তম। কারণ, নামটা ওঁর বেশ জানা। এবং শুধু ওঁর নয়, এ-অঞ্চলের প্রায় সকলেই পথিক চট্টোপাধ্যায়ের নাম জানে। ভদ্রলোক একজন প্রাক্তন এম.এল.এ.। গত ইলেকশানে হেরে গেছেন। তবে বেশ প্রভাবশালী এবং প্রতাপশালী ব্যক্তি।
পথিক চট্টোপাধ্যায়কে দেখে ওঁর সম্পর্কে যেসব মতামত বা অভিমত নরোত্তম খাড়া করেছিলেন সেগুলো সবই প্রায় মিলে গেছে। এই মিলে যাওয়ার ব্যাপারটা বেশ তৃপ্তি দিল। ভদ্রলোকের কথাবার্তায় কেমন একটা আহত অহংকারবোধ ছায়া ফেলেছে। এর কারণ হয়তো এককালে তিনি বহু আলোচিত পুরুষ ছিলেন, এখন গ্রিনরুমই হল ওঁর আবাসস্থল। মঞ্চে ওঁর কোনও ভূমিকা নেই।
নরোত্তম কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বললেন, ‘যদি একটু ধৈর্য ধরে শোনেন তা হলে আপনাকে সব খুলে বলতে পারি মিসেস রায়ের খুনের ব্যাপারে মিছিমিছি সাধ করে আমি নাক গলাইনি—।’
