‘কিন্তু আমাকে যে দেখা করতেই হবে। ভীষণ জরুরি!’ নরোত্তম একান্ত আগ্রহের ঢঙে বললেন।
‘কেন?’ মেয়েটি লিখল।
প্রশ্নটা ছোটই। তবে সেটা লেখা হয়েছে খবরের কাগজের হেডিংয়ের হরফে, আর তাতে দু-দুবার গাঢ় দাগ টেনে আন্ডারলাইন করা হয়েছে।
‘দয়া করে ওঁকে বলুন আমি ওঁর স্ত্রীর খুনের ব্যাপারে কয়েকটা জরুরি কথা জানাতে চাই। খুনটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। বিশ্বাস করুন।’
‘তা হলে পুলিশে যান,’ মেয়েটি আবার লিখল, ‘মিস্টার রায় স্ত্রীর শোকে ভীষণ মুষড়ে পড়েছেন। কারও সঙ্গেই দেখা করছেন না।’
নরোত্তম বসাক বললেন, ‘ওনাকে একবার আমার কথা বলুন। উনি নিশ্চয়ই দেখা করবেন।’
‘মিস্টার রায় এখন অফিসে নেই,’ অধৈর্য ঢঙে মেয়েটি লিখল। কিন্তু লেখা কাগজটা সে এমনভাবে বসাকের দিকে এগিয়ে ধরল যে, তাতে ওর অধৈর্য ভাবটা পাঁচগুণ বেশি প্রকাশ পেল।
‘ঠিক আছে। আমি তা হলে ওঁর জন্যে অপেক্ষাই করছি।’ কথাটা বলে নরোত্তম কাঠের প্যানেল দেওয়া দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেলেন। কালো চামড়ায় মোড়া একটা নরম সোফায় গা ঢেলে দিলেন। সোফায় বসতেই ওঁর শরীরটা যেন ডুবে যেতে লাগল। নরোত্তম লক্ষ করলেন, মেয়েটি ওঁর দিকে কঠিন চোখে চেয়ে আছে। পরক্ষণেই সে হাতের ইশারায় অফিসের সদর দরজাটা দেখাতে লাগল অর্থাৎ; আপনি চলে যান। কিন্তু নরোত্তম সে-ইশারা স্রেফ না দেখার ভান করে নির্বিকারভাবে বসে রইলেন। মেয়েটি তীক্ষ্ন রুক্ষ চোখে অনেকক্ষণ ওঁর দিকে তাকিয়ে রইল কিন্তু বসাক সে দৃষ্টি গ্রাহ্যই করলেন না—অন্তত গ্রাহ্য না করার ভান করলেন। অবশেষে মেয়েটি বিরক্ত এবং হতাশ হয়ে মুখ ফিরিয়ে সামনে রাখা টাইপমেশিনে মনোযোগ দিল।
বসে-বসে উথালপাথাল ভাবতে লাগলেন নরোত্তম। সত্যি-সত্যি তিনি কি দেখা করতে চেয়েছিলেন জিতেন্দ্রনাথের সঙ্গে? কোনও সুস্থ মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলা ওঁর পক্ষে রীতিমতো অস্বস্তিকর। অন্তত ওঁর পক্ষে না হলেও সুস্থ মানুষটির পক্ষে তো বটেই কারণ, নরোত্তম বসাকের কথা তাকে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয় এবং উত্তর দেওয়ার সময় তাদের কষ্ট করে লিখে জানাতে হয় কথাগুলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে ওঁর হঠাৎই মনে হল, মিস্টার রায় হয়তো ভালো করেই জানেন ওঁর স্ত্রীকে কে হত্যা করেছে। স্বামী অফিসে বেরোনোর পর থেকে সারাটা দিন মিসেস রায় একাই কাটাতেন। হয়তো সেই ফাঁকে ওঁর কোনও ভালোবাসার মানুষ জুটে গিয়েছিল। প্রায়ই সে হয়তো মিসেস রায়ের সঙ্গে গোপনে দেখা করতে আসত। দিনে-দিনে সে হয়তো জিতেন্দ্রনাথের প্রতি ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ছিল। অলকানন্দাকে সে আর কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাইছিল না। পরিণতিতে কোনও এক দুর্বল মুহূর্তে ঘটে গেছে ক্রোধ ও উত্তেজনার বিস্ফোরণ। মিসেস রায় নিহত হয়েছেন। সুতরাং নরোত্তম এখন ভালোমন্দ যা-ই বলুন না কেন, তাতে মিস্টার রায়ের দুঃখ শুধু বেড়েই যাবে—কমবে না। পুলিশি তদন্তে শুধু কলঙ্ক-কথা প্রকাশিত হবে।
অতএব জিতেন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে আসার কোনও মানেই হয় না, নরোত্তম মনে-মনে ভাবলেন। এখুনি এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত।
নরোত্তম উঠে দাঁড়ালেন। ভাবলেন, মেয়েটিকে কি বলা উচিত যে, তিনি মিস্টার রায়ের সঙ্গে আর দেখা করতে চান না? নাঃ, বরং চুপচাপ অফিস ছেড়ে চলে যাওয়াই ভালো—হয়তো মেয়েটির নজরই পড়বে না এদিকে।
কিন্তু নরোত্তম ইতস্তত করে দরজার দিকে পা বাড়াতেই জনৈক বিশাল চেহারার পুরুষ দরজায় হাজির হলেন। বলিষ্ঠ দ্রুত পা ফেলে তিনি এগিয়ে গেলেন রিসেপশনিস্ট যুবতীর দিকে। মেয়েটি একগোছা চিঠিপত্র ওঁর হাতে দিল। তারপর ভদ্রলোক একইরকম ব্যস্ততায় একটা পালিশ করা কাঠের দরজার দিকে এগিয়ে চললেন। দরজার ওপরে পেতলের ফলকে লেখা জিতেন্দ্রনাথ রায়।
মেয়েটি হঠাৎ একটুকরো কাগজ হাতে তড়িঘড়ি এগিয়ে গেল তাঁর দিকে। কাগজটায় একপলক নজর বুলিয়েই দুজনে চোখ ফিরিয়ে তাকাল বিব্রত নরোত্তম বসাকের দিকে। নরোত্তমের পায়ের নীচে নরম কার্পেট যেন তলিয়ে যেতে লাগল, বেরোনোর দরজাটা যেন মুহূর্তে সরে গেল বহু-বহু দূরে। তবুও বেশ কষ্ট করে নরোত্তম মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তুললেন, পায়ে-পায়ে এগিয়ে চললেন দরজার দিকে। তারপর একসময় দরজার বাইরে।
রাস্তায় পা দিয়ে নরোত্তমের হঠাৎই খেয়াল হল একটু আগে দেখা পুরুষটির মাথায় কয়েকটা রুপোলি চুল চিকচিক করছিল, আর তার ডানহাতের আঙুলে একটা বড় সোনার আংটি।
ধীরে-ধীরে বাড়ির দিকে রওনা হলেন নরোত্তম। আবহাওয়া আজ ভীষণ সুন্দর, কিন্তু সেসব ওঁর নজরেই পড়ল না। ভীষণ পরিশ্রান্ত ক্লান্ত লাগছিল। চলার পথে একটা ছোট পার্কে বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলেন। ভাবতে লাগলেন নিজের অদ্ভুত ক্রিয়াকলাপের কথা। কী দরকার ছিল মিস্টার রায়ের অফিসে যাওয়ার! কী দরকার ছিল জঙ্গলে পথ হারিয়ে খুনের দৃশ্যটা দেখে ফেলার? নিজের ওপরে ধিক্কার ও বিরক্তি এল নরোত্তমের।
নিজের বোকামির কথা ভাবতে-ভাবতে বাড়ির কাছে পৌঁছলেন এবং পৌঁছেই অবাক হলেন।
একটা কালো অ্যামবাসাডার ওঁর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে।
নরোত্তম যে-জায়গায় বাস করেন সেটা এ-অঞ্চলের খুব বিলাসী এলাকা নয়। এদিকটায় তেমন একটা গাড়ি চোখে পড়ে না। সুতরাং, এই মুহূর্তে, ওঁর বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকাটা নিতান্ত অবাক করে দেওয়া ঘটনা।
