নতুন ভদ্রলোক মনোযোগের সঙ্গে নরোত্তম বসাকের সব কথা শুনলেন। তারপর উত্তেজিতভাবে কতকগুলো টুকরো কাগজে দ্রুত হাতে কীসব লিখতে লাগলেন। লেখা হয়ে গেলে কাগজগুলো তিনি এগিয়ে দিলেন নরোত্তম বসাকের দিকে। নরোত্তম সেগুলোতে একটার-পর-একটা নজর বোলাতে লাগলেন—যেন পরীক্ষার খাতা দেখছেন। আসলে কাগজগুলো প্রশ্নমালা।
‘সেই লোকটিকে যখন আপনি মহিলাটির ওপরে ঝুঁকে থাকতে দেখেন তখন ক’টা বাজে মনে আছে?’
‘না, মনে নেই। আমার হাতের ঘড়ি ছিল না। তা ছাড়া পথ হারিয়ে কতক্ষণ যে এদিক-ওদিক ঘুরেছি বলতে পারি না।’
‘লোকটাকে মুখ দেখতে পেয়েছিলেন আপনি?’
‘না।’ নরোত্তম জবাব দিলেন, ‘তার পিঠটা ফেরানো ছিল আমার দিকে।’
‘লোকটার আবার দেখলে আপনি চিনতে পারবেন?’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নরোত্তম বসাক। তারপর মৃদু গলায় বলতে লাগলেন, ‘লোকটার ভঙ্গিটাই শুধু আমার মনে আছে। ঠিক কাউকে খুন করার ভঙ্গি—কোন খুনির ভঙ্গি। নৃশংস। ভয়ানক। তার মাথায় কয়েকটা পাকা চুলও ছিল। সেগুলো সূর্যের আলোয় রূপোর তারের মতো চিকচিক করছিল। গায়ে ছিল একটা সাদা জামা—ফুলশার্ট। আর ডানহাতে ছিল একটা সোনার আংটি। সেটা আলো পড়ে ঝিলিক মারছিল।’
পুলিশ অফিসার হতাশা ও ব্যর্থতায় এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন। নাঃ, নরোত্তম দরকারি কোনও সূত্র দিতে পারেননি।
নরোত্তম বললেন, ‘লোকটার ভঙ্গি দেখেই আমি সব বুঝে গেছি। কানে শোনার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমি শুধু সবার নড়াচড়া অঙ্গভঙ্গি খুঁটিয়ে দেখি। ওগুলো দেখে আমি অনেক কিছু বুঝতে পারি। লোকটার শরীর যেভাবে ঝুঁকে ছিল, তাতে সে-ই যে মিসেস রায়ের মার্ডারার এ আমি হলফ করে বলতে পারি।’
অফিসার আবার মাথা নাড়লেন। তারপর কথা বলতে শুরু করলেন। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে একটা কাগজে লিখে নরোত্তমকে ধন্যবাদ জানালেন, নাম ও পুরো ঠিকানা রেখে যেতে অনুরোধ করলেন, প্রয়োজনে পুলিশ যে ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করবে এ-কথাও জানালেন।
নরোত্তম ওঠার আগে অফিসারের নাম জানতে চাইলেন। তখন অফিসার একটু আগে লেখা একটা কাগজ টেনে নিয়ে তারই এক কোনায় লিখে দিলেন: গোবিন্দ সমাজপতি।
নরোত্তম বসাক আপন মনেই বারকয়েক মাথা নেড়ে থানা থেকে বেরিয়ে এলেন। নিজেকে এখন বেশ হালকা লাগছিল।
পরপর কয়েকদিন নিয়ম করে খবরের কাগজ কিনলেন নরোত্তম। না, মিসেস রায়ের খুনের বিষয়ে আর কোনও নতুন খবর বেরোয়নি। তা হলে এই খুনটাও পুলিশ-দপ্তরে ‘আনসলভড’ ফাইলে জায়গা নেবে! নরোত্তম মনে-মনে ভীষণ আপশোস করছিলেন। ওঁর চোখের সামনে গোটা দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল অথচ তিনি কিছুই করতে পারলেন না। এমনকী পুলিশকে যেসব খবর তিনি দিলেন তা থেকেও কোনও সূত্র পেল না ওরা। খবরের কাগজে যখন পুলিশি তদন্তের উল্লেখ নেই তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না যে, পুলিশ আশা জাগানোর মতো কোনও সূত্র পায়নি।
রোজই ভোরবেলা ছক বাঁধা পথে পায়চারি করতে-করতে নরোত্তম জানলার ফ্রেমে আঁটা দৃশ্যটার কথা ভাবেন। আর ভাবেন আজই হয়তো গোবিন্দ সমাজপতি নতুন কোনও সূত্র খোঁজার আশায় ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। কিন্তু কার্যত যখন তা ঘটে না, তখন ভাবেন সমাজপতি হয়তো ওঁর কথাগুলোকে ভীমরতি ধরা বাহাত্তুরে বুড়োর কচকচি ভেবে উড়িয়ে দিয়েছে। কিংবা রোজই হয়তো থানায় এ জাতীয় কিছু উলটোপালটা সাক্ষী গিয়ে হাজির হয়। সুতরাং, গোবিন্দ সমাজপতিকে দোষ দেওয়া যায় না। দরকার পড়লে তিনি নিশ্চয়ই নরোত্তম বসাকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
কেমন যেন অদ্ভুতভাবেই মিসেস রায়কে খুব আপনার জন বলে ভাবতে শুরু করলেন নরোত্তম। একইসঙ্গে ওঁর মনে হতে লাগল, অলকানন্দা রায়ের অকালমৃত্যুর জন্য তিনিই দায়ী। ইস, খুনটা তিনি রুখতে পারলেন না। ওঁর জায়গায় জোয়ান কোনও সুস্থ মানুষ হলে নিশ্চয়ই সেটা আটকাতে পারত। মিসেস রায়কে চেনেন না নরোত্তম, কোনওদিন দেখেনওনি। কিন্তু যখন দেখলেন, তখন ওঁর অন্তিম মুহূর্ত। শ্বাসরোধ করে ওঁর জীবনীশক্তিকে তখন তিলে-তিলে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। মিসেস রায়ের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারলে কিছুটা শান্তি পেতেন নরোত্তম। কিন্তু কার কথাই বা উনি জানেন, একমাত্র ওঁর স্বামী জিতেন্দ্রনাথ রায় ছাড়া। কাগজেই ওঁর স্বামীর নামটা নরোত্তম পড়েছেন। তা ছাড়া এ-অঞ্চলে ওঁর প্রতিপত্তির কথাও শুনেছেন লোকমুখে। সুতরাং জিতেন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করার জন্য নরোত্তম বসাকের মনটা আকুল হয়ে উঠল।
ঠিক দশদিন পরে জিতেন্দ্রনাথ রায়ের আধুনিক ঢঙে তৈরি ঝকঝকে অফিসে নরোত্তম বসাককে দেখা গেল।
পুরু কার্পেটে গোড়ালি ডুবে যাচ্ছে, এয়ার কন্ডিশনারের মিহি গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। মনেই হয় না কোনও আধা-শহরের অফিসবাড়ি। একটা টেবিলের ওপরে সুদৃশ্য টবে সাজানো রজনীগন্ধা ও গোলাপগুচ্ছ। টেবিলের ওপিঠে বসে আছে এক সুন্দরী যুবতী। তার রংচঙে প্রসাধন দেখে মনে হয় কোনও নাটক কিংবা সিনেমায় অভিনয় করার জন্য সে এক পায়ে খাড়া।
নরোত্তম বসাক মেয়েটিকে নিজের নাম বললেন। তারপর জানালেন তিনি জিতেন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গে দেখা করতে চান।
উত্তরে মেয়েটি কী যেন বলল। তখন নরোত্তম বাধ্য হয়ে বললেন যে, তিনি কানে শুনতে পান না। কথাগুলো যদি ও কাগজে লিখে ওঁকে জানায় তা হলে ভালো হয়। মেয়েটি নরোত্তমের সাদা প্যাডের দিকে হাত না বাড়িয়ে নিজের ড্রয়ার থেকে একটা সাদা কাগজ বের করল। তারপর লিখল ‘মিস্টার রায় কারও সঙ্গে দেখা করছেন না।’
