বাড়ি ফিরে অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করলেন। সকালে বেরোনোর পর থেকে একের পর এক অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে। ঘরের মধ্যে ছটফটেভাবে পায়চারি করতে শুরু করলেন। এই নিরিবিলি বাগানবাড়িতে তিনি একা থাকেন—সঙ্গী শুধু একটা কাজের লোক। প্রতি বছর শহর ছেড়ে এখানে বসবাস করার জন্য চলে আসেন নরোত্তম। থাকেন প্রায় চার-পাঁচ মাস। ছেলেমেয়েকে নিখুঁত সংসারী করে দিয়ে বিপত্নীক নরোত্তম বলতে গেলে একরকম বানপ্রস্থ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু এই নিরুত্তাপ শান্তিময় জীবনে হঠাৎ এক উপদ্রব এসে হাজির হল আজ।
কী করা যায় সেটাই ভাবতে লাগলেন। মেয়েটির খবর কি এর মধ্যেই জানাজানি হয়ে গেছে? আগামীকালের কাগজ খুঁটিয়ে দেখতে হবে। মরণাপন্ন মেয়েটিকে কোনওরকম সাহায্য করতে না পারায় মনে-মনে ভীষণ মুষড়ে পড়লেন নরোত্তম। ওঁর চোখের সামনে ঘটে গেল ঘটনাটা, অথচ তিনি নিরুপায় অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখলেন শুধু!
তখুনি তাঁর পুলিশে খবর দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ঘটনাটা যে-বাড়িতে ঘটেছে তার হদিস যে ওঁর অজানা। পুলিশকে সেখানে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাওয়া নরোত্তমের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বেশ ক’বছর ধরে এখানে এসে থাকছেন বটে, কিন্তু এই অঞ্চলের পথঘাট সবই ওঁর প্রায় অচেনা। নিত্যনৈমিত্তিক ছক বাঁধা পথটুকু ছাড়া আর কিছুই তেমন করে চেনা নেই।
সুতরাং, তখুনি পুলিশের কাছে না গিয়ে বুদ্ধিমানের কাজই হয়েছে। ওরা ওঁকে ভীমরতিগ্রস্ত এক বুড়ো ঠাউরে বসত। এ অঞ্চলের সব ক’টা বাগান-বাড়ির দরজায়-দরজায় ঘুরে তো আর লাশের সন্ধান করতে পারে না পুলিশ! বলতে পারে না, আপনার বাড়ির দোতলার পিছনদিকের একটা ঘরে আজ ভোরবেলায় হয়তো একটা খুন হয়েছে। আমরা সে-বিষয়ে খোঁজখবর করতে এসেছি।
তার চেয়ে অপেক্ষা করাই ভালো। কাল সকালে খবরের কাগজ দেখে তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করা যাবে।
সে-রাতে নরোত্তমের চোখে ঘুম এল না।
পরদিন একটু বেলার দিকে বাজারে রওনা হলেন তিনি। খবরের কাগজ সেখানেই পাওয়া যায়। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া কখনও খবরের কাগজ দেখেন না নরোত্তম। এখানে অবসর কাটাতে এসে দুনিয়ার খবরে ওঁর কোনও প্রয়োজন বা আগ্রহ নেই। কিন্তু আজকের কথা আলাদা।
কাগজওয়ালার কাছে সবরকম দৈনিক কাগজ সাজানো। ন’টা দশের ট্রেনে সব কাগজ পৌঁছয় এখানে। ঝুঁকে পড়ে নিজের প্রিয় কাগজটা তুলে নিলেন। কাগজওয়ালা কিছুটা বিরক্ত হচ্ছিল। নরোত্তম তার নিয়মিত খদ্দের নন। হয়তো বিনিপয়সায় চট করে কাগজের হেডলাইনগুলো পড়ে নিতে চাইছেন। অনেকেই এরকম করে। কিন্তু সে আপত্তি বা প্রতিবাদ করার আগেই মাঝারি মাপের হেডিংটি নজরে পড়ে গেছে নরোত্তমের মহিলা খুন।
নরোত্তম তা হলে সত্যিই নিজের চোখে খুনের দৃশ্যটা দেখেছিলেন।
পকেট থেকে পয়সা বের করে কাগজের দাম মিটিয়ে দিলেন তিনি। কাগজওয়ালা একটু অবাক হয়েই দামটা নিল। নরোত্তম সেদিকে ভ্রূক্ষেপই করলেন না। কাগজটা ভাঁজ করে বগলদাবা করে দ্রুতপায়ে হাঁটা দিলেন বাড়ির দিকে। খুনের খবরটা খুঁটিয়ে পড়ার জন্য যেন আর তর সইছে না। চলতে-চলতেই ওঁর চোখ এপাশ-ওপাশ খুঁজতে লাগল। যদি কোনও যুতসই জায়গা পাওয়া যায়, তা হলে বাড়ি পৌঁছনো পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে হয় না। খবরটা আগেভাগেই পড়ে ফেলা যায়। এমনি করেই ওঁর অনুসন্ধানী নজরে একটা চায়ের দোকান ধরা পড়ল। সুতরাং আর একমুহূর্তও দেরি নয়। নরোত্তম সটান গিয়ে ঢুকে পড়লেন দোকানে। চাটাইয়ের দেওয়াল ঘেঁষে একটা ময়লা বেঞ্চি বেছে নিয়ে বসলেন। এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে খবরের কাগজটা অতি সন্তর্পণে চোখের সামনে মেলে ধরলেন।
বত্রিশ বছর বয়েসি শ্রীমতী অলকানন্দা রায়কে গতকাল ওঁর শোওয়ার ঘরে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেছে। বেলা এগারোটার সময় রাঁধুনি মৃতদেহ আবিষ্কার করে। শোওয়ার ঘরের অবস্থা ছত্রখান ছিল বটে তবে কিছু খোয়া গেছে বলে এ পর্যন্ত জানা যায়নি। দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার কোনও চিহ্নও পাওয়া যায়নি। মৃতার স্বামী প্রখ্যাত ব্যাবসায়ী শ্রীজিতেন্দ্রনাথ রায়কে ওঁর অফিসে দুঃসংবাদটি জানানো হয়। খবরটা শোনামাত্রই তিনি শোকে ভেঙে পড়েন। বাড়িতে শ্রীমতী রায় একাই ছিলেন। সকাল সাড়ে ছ’টায় তাঁর স্বামী কাজে বেরিয়ে যান। তারপর লেখা রয়েছে শ্রীমতী রায়ের পরিকল্পনায় তৈরি বিভিন্ন সমিতির কথা, তাঁর দান-ধ্যানের কথা। বোঝা গেল, শ্রীমতী রায় এ-অঞ্চলে বেশ সুখ্যাত মহিলা ছিলেন।
নরোত্তম ভাবতে লাগলেন, এখন কী করা যায়। বয় চা দিয়ে গিয়েছিল, সেটা টেবিলের ওপরে জুড়িয়ে যাচ্ছিল। ওঁর সেদিকে কোনও খেয়াল ছিল না। শুধু শূন্য দৃষ্টিতে হাতের খবরের কাগজের দিকে তাকিয়েছিলেন।
চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সমস্ত ঘটনাগুলো প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বারবার ভাবতে লাগলেন নরোত্তম। যেন একই ফিলম বারবার দেখছেন। অবশেষে ওঁর মনে হল, এই মুহূর্তে ওঁর পুলিশে যাওয়া উচিত। উচিত পুলিশকে সব খুলে বলা, যাতে তারা অনুসন্ধান করে মিসেস রায়ের হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে পারে।
মনকে বেশি বোঝাতে হল না। নরোত্তম বসাক সঙ্গে-সঙ্গেই রওনা হলেন থানার দিকে। সামনে যে-সেপাইটিকে পেলেন তাকে বললেন, যে, মিসেস রায়ের খুনের ব্যাপারে তিনি একজন অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে চান। আরও জানালেন যে, তিনি কানে শুনতে পান না, এবং একইসঙ্গে প্যাড ও পেনসিল এগিয়ে দিলেন লোকটির দিকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেপাইটির কথা বলা বন্ধ করা গেল না। তার ঠোঁট সমানে নড়তে লাগল, এবং নরোত্তম তার কথা একটিও বুঝতে পারলেন না বটে, কিন্তু লোকটির অঙ্গভঙ্গি নড়াচড়া সব বলে দিল। সেপাইটি হাত উঁচিয়ে তালু দেখাল নরোত্তমকে—অর্থাৎ, ওঁকে অপেক্ষা করতে হবে। তারপর সে উঠে ভেতরে গেল। মিনিটটাক পরে একজন অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। নতুন ভদ্রলোকের ইশারা খুব সহজেই বোধগম্য হল নরোত্তমের—ওঁকে পাশের একটি ঘরে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত করলেন অফিসার।
