পুরুষটি মহিলাকে খুন করছে। তার সবল হাত দুটো ধাপে-ধাপে শক্তিশালী হয়ে মহিলার নরম গলায় চেপে বসছে।
নরোত্তম বসাক ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। একটা ঢিল কুড়িয়ে ছুড়ে মারলেন বাড়িটার দিকে। কিন্তু সেটা জানলা তো দূরের কথা, বাড়ি পর্যন্তই পৌঁছল না। তখন উত্তেজিত হয়ে পাঁচিলের কাছে ছুটে গেলেন। বৃদ্ধ শরীরে চেষ্টা করলেন পাঁচিল বেয়ে উঠতে। কিন্তু পাঁচিলের রুক্ষ গায়ে আঁচড়ানোই সার হল। হাত ছড়েও গেল কয়েক জায়গায়।
কোথায়—পাঁচিলের গায়ে দরজাটা কোথায়?
এবারে সেটার খোঁজে পাঁচিল বরাবর ছুটতে শুরু করলেন নরোত্তম। কিন্তু পাঁচিলটা যেন আর শেষ হতে চায় না। ক্রমে নরোত্তম হাঁপিয়ে পড়তে লাগলেন, ওঁকে ঘিরে জঙ্গল গাঢ় হতে লাগল। বাড়িটা যেন হারিয়ে যেতে লাগল দূর থেকে দূরে। ক্লান্ত শ্রান্ত নরোত্তম পথহারা হয়ে গেলেন। ছোটবেলায় অচেনা পথে ঘুরে পথ হারিয়ে ফেললে যেরকম ভয় পেতেন এখনও সেরকম একটা ভয় ওঁকে গ্রাস করতে লাগল।
ঝোপঝাড় ঠেলে পথ করে নিয়ে নরোত্তম এগোতে লাগলেন। ওঁর পাঞ্জাবি-পাজামা ডালপালার খোঁচা খেয়ে ছিঁড়ে গেল। উদভ্রান্ত অবস্থায় ওঁর চোখদুটো শুধু খুঁজে বেড়াচ্ছে পথের ইশারা। বাঁ-পকেটে হাত দিয়ে সর্বক্ষণের সঙ্গী নোটবই ও একজোড়া পেনসিল অনুভব করলেন। যদি কোনও মানুষজনের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় তা হলে তারা হয়তো ওঁর বাড়ি ফেরার পথের হদিস লিখে দিতে পারবে।
পথ হারানোর আতঙ্কে তিনি ভুলেই গেলেন একটু আগে কোন দৃশ্য ওঁর চোখে ধরা পড়েছে। একইসঙ্গে উজ্জ্বল প্রকৃতির রূপসজ্জা ওঁর নজর আর অনুভূতির আড়ালে চলে গেছে। শুধু পথ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাটাই যেন শরীর-মন ছেয়ে আছে।
ইস, যদি নরোত্তম শুনতে পেতেন তা হলে এই গাছপালার জঙ্গল ভেদ করে ওঁর কানে হয়তো পৌঁছে যেত হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলা গাড়ির গর্জন। কিংবা হয়তো কানে আসত কোনও দেহাতি মানুষ বা কাঠুরের কণ্ঠস্বর। যখন শোনার ক্ষমতা ছিল তখন কখনও ভাবেননি কান এতই দামি।
নিজেকে ধীরে-ধীরে সুস্থির করলেন। ভয়টা অল্প-অল্প করে কমতে লাগল। সূর্যের দিকে নজর রেখে দিকনির্ণয় করার চেষ্টা করতে লাগলেন। অবশেষে বহু পরিশ্রমের পর এসে পৌঁছলেন বড় রাস্তায়। ট্রাক, লরি, প্রাইভেট কার শোঁ-শোঁ শব্দে ছুটে যাচ্ছে। দু-একটা ছুটন্ত গাড়ি হাতের ইশারায় থামাতে চাইলেন। কিন্তু এক বৃদ্ধের প্রত্যাশাকে অপমান করে গাড়িগুলো একটুও গতি না কমিয়ে ছুটে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর একটা বাস দেখা গেল। বসাক হাত তুলে ইশারা করতে স্টপেজ না হওয়া সত্ত্বেও থামল বাসটা। প্রায় ছুটে গিয়ে বাসে উঠলেন। পকেট থেকে পয়সা বের করে কন্ডাক্টরকে ভাড়া দেওয়ার সময় লক্ষ করলেন ওঁর শীর্ণ হাতের আরও শীর্ণ আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে। একটু আগে শরতের রমণীয় সকালে যে-ভয়ংকর দৃশ্য দেখেছেন এ হয়তো তারই ফলাফল।
নিজের সঙ্গে ওঁর বিতর্ক শুরু হল। সত্যিই কি তিনি একটা খুন হতে দেখেছেন? ক্ষণিকের সংশয় ও দ্বিধা ঠেলে সরিয়ে নরোত্তম সিদ্ধান্তে এলেন, হ্যাঁ, খুনের দৃশ্যই দেখেছেন তিনি। লোকটা যে মেয়েটির ওপর ঝুঁকে পড়ে তাকে গলা টিপে খুন করছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
মানুষের দেহই তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফ্যালে। কথার চেয়েও শরীরের আচরণ অনেক বেশি করে গোপন মতলবের কথা ঘোষণা করে। অর্থাৎ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। কানে কালা হওয়ার পর থেকেই এই তথ্যটি নরোত্তম আবিষ্কার করেছেন। যতদিন কানে শোনার ক্ষমতা ছিল ততদিন তিনি শুধু মানুষজনের মুখের কথাই শুনেছেন—তাদের শরীরের নড়াচড়া হাবভাব তেমন খুঁটিয়ে লক্ষ করেননি। শ্রবণক্ষমতা হঠাৎ কমে যাওয়ার পরদিন থেকেই তিনি পর্যবেক্ষণে মন দিয়েছেন। তারপর যত দিন গেছে শ্রবণক্ষমতা আরও কমেছে, তবে একই হারে ধারালো হয়েছে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। নরোত্তম এখন জানেন, ঢিলেঢালা শরীর আর মাথা একপাশে ফেরানো থাকলে সেই মানুষ যতই আগ্রহ নিয়ে কথা বলুক না কেন, আসলে তার কোনও মনোযোগ নেই। মাথা যদি সামনে ঈষৎ ঝুঁকে থাকে, দেহ যদি সামান্য হেলে থাকে, তা হলে তার অর্থ আগ্রহ এবং কৌতূহল। আর আলিঙ্গনে আত্মসমর্পণের অর্থ নিশ্চয়ই কাউকে বলে দিতে হবে না!
উচ্চারণ করা শব্দ অনেক সময় মিথ্যে কথা বলতে পারে, কিন্তু শরীর সবসময় সত্যি কথা বলে। হাতের আঙুল থাবার নখের মতো রাগে বেঁকে যায়। নরম ভঙ্গিতে একটা খোলা হাত যখন এগিয়ে আসে তখন সে ভালোবাসা বিনিময় করে। ঝুঁকে পড়া কাঁধ, ঝোঁকানো মাথার অর্থ ব্যর্থতা, হতাশা। শরীর হচ্ছে এমন একটা যন্ত্র যা কোনও মানুষের সত্যিকারের মনোভাব উদ্দেশ্য ইত্যাদি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—তা সে মুখে যা-ই বলুক না কেন।
কান দুটো পুরোপুরি অকেজো হয়ে না পড়লে এসব খুঁটিনাটি লক্ষ করতেন না নরোত্তম। কানের ক্ষমতা নেই বলে এবং মানুষের কথাবার্তায় কোনও প্রতিক্রিয়া আর হয় না। সুতরাং নিতান্ত বাধ্য হয়েই পর্যবেক্ষণ চর্চায় মন দিয়েছেন। ওঁর এই নতুন গুণের খবর অনেকেই জানেন না—জানতে পারেননি। এইসব তথ্যের কথা হয়তো কোনওদিনই জানতে পারতেন না। হয়তো সারা জীবনটাই ওঁর এভাবে কেটে যেত—কিন্তু যায়নি। কানে কালা হওয়ার বিনিময়ে কে-ইবা এই নতুন বিদ্যা অর্জন করতে চায়! নিছক নিয়তি নরোত্তম বসাককে এই জ্ঞান লাভের সুযোগ করে দিয়েছে।
