কে এই ভদ্রলোক? নরোত্তম বসাক ভাবলেন। তাঁর জমিদারি ঢঙের বাড়ি, কেতাদুরস্ত বেশবাস, গাড়ি, উদ্ধত চলন-আচরণ ইত্যাদি দেখে মনে হয় ভদ্রলোক বেশ ক্ষমতাশালী, কোনও উঁচু পদে আছেন। কখনও-কখনও নরোত্তম ফুটপাথের ওপরে চলার গতি কমিয়ে দেন—নইলে ওই ভদ্রলোক যখন ঝটিতি সিঁড়ি ভেঙে গাড়ির দিকে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে যান তখন তাঁর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নরোত্তম হয়তো পড়ে যাবেন। সে এক অস্বস্তিকর অবস্থা হবে।
প্রতিদিন ভোরে চলার পথে অন্য যেসব মানুষ নরোত্তম দেখেন তারা প্রত্যেকেই সামান্য হেসে অথবা মাথা নেড়ে ওঁর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করে। রোজ দেখা হতে-হতে পরস্পরের মুখগুলো চেনা হয়ে গেছে পরস্পরের কাছে। এই ঠাটবাটওয়ালা ভদ্রলোকের সঙ্গেও তেমনি। কিন্তু একমাত্র উনিই কোনওরকম সৌজন্য দেওয়া-নেওয়া করেন না নরোত্তমের সঙ্গে। না, তাতে নরোত্তমের দুঃখ অথবা অভিমান নেই। তিনি ভেবেছেন, ভদ্রলোকের অহংকারই হয়তো এই উপেক্ষার কারণ। অবশ্য তাঁর সঙ্গে ঠিকঠাক আলাপ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা ছিল না। কারণ, নরোত্তম কানে একেবারেই শুনতে পান না।
সেদিন সকালে নরোত্তম রোজকার পথের সামান্য অদল-বদল করলেন। প্রথমত সকালটার মধ্যে এক অপরূপ মুগ্ধতা ছিল। তার ওপরে আনচান করা বাতাস আর পুবের আকাশে সিঁদুর রঙের সদ্য-ওঠা সূর্য। খুশি ও উৎফুল্লতায় নিজেকে হারিয়ে ফেললেন নরোত্তম। ফুটপাথ ছেড়ে কাঁচা পথে নেমে পড়লেন। সবুজ ঘাস, ঝোপ ইত্যাদি পেরিয়ে আনমনা হেঁটে চললেন। লুকিয়ে কোথাও শিস দিচ্ছিল একটা বাগিচা বুলবুল। বসাকের বৃদ্ধ পা দুটো ওঁকে যেদিকে খুশি নিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে বহু রাস্তার কাটাকুটি পেরিয়ে, মাঠঘাটের সৌন্দর্যের তারিফ করতে-করতে নরোত্তম কখন যে গাছ-গাছালির জঙ্গলে ঢুকে পড়েছেন সেটা খেয়ালই করেননি।
শরতের এই সকাল মনে ক্রমাগত খুশি ছড়িয়ে দিচ্ছিল। শাল, দেবদারুর পাতায় ঠিকরে পড়ছে সকালের পবিত্র রশ্মি। এ ছাড়াও নানান ফুল-ফলের গাছ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। একটা গাছে ফলন্ত পেয়ারা দেখতে পেলেন বসাক। দেখে খিদে পেল। সবুজ কচি পেয়ারাপাতাগুলো রোদে ঝলমল করছে। অদ্ভুত আকর্ষণে গাছটার কাছে এগিয়ে এলেন। হাত বাড়িয়ে একটা পেয়ারা ছিঁড়ে নিয়ে কামড় বসালেন। সজীব ফলের স্বাদ খিদে আরও বাড়িয়ে দিল। উপোসি মানুষের মতো পেয়ারাটি শেষ করে ফেললেন। বাড়ি থেকে যে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়েছেন সে-কথা যেন ভুলেই গেলেন। একইসঙ্গে ওঁর বয়েস কমে যেতে লাগল দ্রুতগতিতে।
নরোত্তমের মনে হল পলকে বিশ বছরের ছোকরা হয়ে তিনি এক অভিযানে বেরিয়ে পড়েছেন। অথচ আসলে তিনি বাহাত্তুরে বুড়ো, রোজকার মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে আনন্দে পথ ভুলে প্রকৃতির কোলে হারিয়ে গেছেন। নরোত্তম থমকে দাঁড়লেন। না, ক্লান্তিতে নয়, বিস্ময় ও খুশিতে। চারপাশে তাকিয়ে সকালের রোদে গাছগাছালির চকচকে রূপ দেখে অবাক হয়ে গেলেন তিনি। মনে-মনে শরৎ ও বসন্তকালের মধ্যে তুলনাও করতে শুরু করলেন। ওঁর পায়ের তলায় একটা শুকনো ডাল শব্দ করে ভেঙে গেল। নানান পাখির কিচিরমিচির, কাঠবেড়ালির চপল ছুটোছুটি, গাছের পাতায় ছমছম শব্দ, সব কিছুই ঘটে যাচ্ছিল চারপাশে, কিন্তু নরোত্তম কিছুই শুনতে পাচ্ছিলেন না। বয়েস বেড়ে চলার সঙ্গে-সঙ্গে ওঁর শ্রবণ ক্ষমতা কমে এসেছে ধীর অথচ অনিবার্য গতিতে। অবশেষে গত বছরে ওঁর কান পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেছে। ফলে অন্য ইন্দ্রিয়গুলো—চোখ, ত্বক, নাক ইত্যাদি ক্রমে-ক্রমে অনেক বেশি বিচক্ষণ ও ধারালো হয়ে উঠেছে। এখন সেই অবশিষ্ট ইন্দ্রিয়গুলোই সৌন্দর্যের অমৃত ওঁর হৃদয়ের গভীরে একটু-একটু করে পৌঁছে দিচ্ছিল।
নরোত্তম ভাবছিলেন, তিনি লোকালয় থেকে বহু দূরে চলে এসেছেন, জন-মানুষও নেই কাছাকাছি। কিন্তু আর-কয়েক পা এগোতেই অবাক হয়ে গেলেন। কিছুটা দূরে এক বিশাল পাঁচিল, এবং পাঁচিলের মাথায় দু-ফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়া। অর্থাৎ, ঠাট্টা-রসিকতার ব্যাপার নয়, সত্যি-সত্যিই কেউ তার এলাকাটাকে নিরাপদে রাখতে চাইছে। না, এত সর্তকতার পর ‘প্রবেশ নিষেধ’ সাইনবোর্ডটা লাগানোর দরকার পড়ে না, এবং সেটা লাগানোও নেই পাঁচিলের কোথাও। নরোত্তম বসাক পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, বর্ষা অথবা গ্রীষ্মের সময় পাঁচিলটা এখান থেকে নজরে পড়ার কথা নয়। কারণ, পাঁচিলের যে-অংশটুকু দেখা যাচ্ছে গাছ-গাছালির পাতা-ডালপালার ঝাঁক তা নিশ্চয়ই পরিপাটি করে ঢেকে দেবে।
চোখের নজর সামান্য উঁচু করতেই পাঁচিল পেরিয়ে একটা বিশাল অট্টালিকার পিছনদিক দেখা গেল। বাড়িটা এমন নির্জন পাঁচিল ঘেরা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যে, জানলা-দরজায় পরদা টাঙানোর প্রয়োজন বোধ করেননি বাড়ি মালিক। সূর্যের সতেজ আলো ঠিকরে পড়ছে বাড়িটার গা থেকে। এবং সে-আলো ঢুকে পড়েছে প্রতিটি ঘরে। বিশেষ করে দোতলার তিনটে জানলা তো হলদে আলোয় একেবারে ঝলমল করছে। ফলে মাঝের জানলায় দাঁড়ানো পুরুষ ও মহিলাটিকে নরোত্তমের বেশ স্পষ্টই নজরে পড়েছে।
মানুষ দুজন নরোত্তম বসাককে দেখতে পায়নি। ওরা যেন কোনও নির্বাক চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রী, আর তার একমাত্র মুগ্ধ দর্শক নরোত্তম। না, নরোত্তম বসাক এ দুজন মানব-মানবীর গোপনতায় নির্লজ্জভাবে হানা দিতে চাননি। বরং তিনি কিছুটা ভয় পেলেন। কারণ, জানলার ফ্রেমে বাঁধানো দৃশ্যটা অপ্রত্যাশিত।
