ক্যাপ্টেন আমার জন্যে সহানুভূতি প্রকাশ করলেন। ক্যাবিনেট থেকে হুইস্কির বোতল বের করে আমাকে আহ্বান জানালেন।
কিছু সাধারণ গাল-গল্প এবং দু-পেগ হুইস্কি শেষ করে যখন আমি উঠে দাঁড়ালাম, তখন রাত দেড়টা। জড়ানো গলায় ক্যাপ্টেনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
বাইরের ডেকে আসতেই এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখে আমার বুক আনন্দে নেচে উঠল। অন্ধকার ডেকের এককোনায় রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রীরণেন বর্মা। মরা চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে ডেকের ওপর। আর সেই সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার ঝাপটা। ডেক জনশূন্য, অর্থাৎ নিশ্চিন্ত হয়ে এগোনো যাবে। ক্যাপ্টেন যখন তিন-তিনটে দুর্ঘটনা দেখেছেন, তখন আরও একটা দুর্ঘটনা তাঁকে আমি দেখাতে চাই।
নিঃশব্দ হিংস্র হাসিতে মুখ ভরিয়ে পা টিপে-টিপে রণেন বর্মার দিকে এগোলাম। এরকম সুবর্ণসুযোগ আর হয়তো পাব না।
প্রথমে ধীরে ধীরে…তারপর জোরে…আরও জোরে…শেষে উল্কাগতিতে ছুটে চললাম রণেন বর্মাকে লক্ষ্য করে। চটি খুলে ফেলে দিয়েছি ডেকের ওপর—যাতে কোনওরকম শব্দ না হয়।
তাঁর দশ গজের মধ্যে পৌঁছে আরও হিংস্র হল আমার হাসি। পা দুটো ছুটে চলল আরও জোরে…আরও জোরে…অনুভব করলাম, আমি রণেন বর্মাকে লক্ষ্য করে পাগলের মতো দৌড়চ্ছি…দৌড়চ্ছি…।
চরম দুর্ঘটনা
‘না, না, আপনার কোনও দোষই নেই। কোনও দোষ আপনাকে আমরা দিচ্ছি না।’ কথা বলতে-বলতে একগ্লাস হুইস্কি রণেন বর্মার দিকে এগিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন ‘নিন, এটা খেয়ে নিন। যা মেন্টাল স্ট্রেন গেছে আপনার।’
‘থ্যা—থ্যাঙ্ক ইউ।’ মিহি গলায় জবাব দিলেন রণেন বর্মা। দু-চার ঢোকেই শেষ করে ফেললেন হুইস্কিটুকু। তারপর চোখ বড়-বড় করে বলতে লাগলেন, ‘আমার ঘুম আসছিল না বলে বাইরে ডেকে এককোনায় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলাম। ঠান্ডা হাওয়ায় বেশ একটা ঘুমের আমেজ এসেছিল। হঠাৎ দেখি মিস্টার আম্বাস্তা, তাই তো নাম ছিল ভদ্রলোকের, (ক্যাপ্টেন ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন) আমার দিকে পাগলের মতো ছুটে আসছেন। হাতদুটো সামনের দিকে বাড়িয়ে তিনি আমাকে লক্ষ্য করেই যেন দৌড়ে আসছেন। অন্ধকারে তার সাদা দাঁতের সারি ঝকঝক করছে। সারা মুখে কেমন একটা হিংস্র ভাব। আমি—আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। আর—আর- একগ্লাস হুইস্কি…ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড—
ক্যাপ্টেন বিনা বাক্যব্যয়ে হুইস্কি আর জল দিয়ে তাঁর গেলাস ভরতি করে দিলেন।
‘ধ—ধন্যবাদ। আমি ভয় পেয়ে একলাফে পাশে সরে গেলাম। আর ভদ্রলোক সোজা ডেকের রেলিঙে ধাক্কা খেয়ে এক ডিগবাজিতে জাহাজের বাইরে চলে গেলেন। ঠিক যেন ভূতে পাওয়া লোকের মতো মিস্টার আম্বাস্তা দৌড়ে আসছিলেন। তিনি বাইরে জলে পড়ে যেতেই আমি চিৎকার করে উঠলাম। তারপর…।’
‘হ্যাঁ, তারপর তো আমরা সবই জানি।’ গম্ভীর স্বরে জবাব দিলেন ক্যাপ্টেন, ‘অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ভদ্রলোককে আর উদ্ধার করা গেল না। এ স্যাড বিজনেস। তবে কী জানেন মিস্টার বর্মা, ভদ্রলোকের অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারে একটা অ্যালার্জি ছিল। এই চরম অ্যাক্সিডেন্টটার আগে আরও তিনবার তিনি অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারে আমাদের কাছে রিপোর্ট করেছিলেন। আশ্চর্য! সত্যিই আশ্চর্য!’
আপনমনেই নিজের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করলেন রণেন বর্মা। তারপর দু-পকেট হাতড়ে সম্ভবত দেশলাই খুঁজলেন। শেষে কাঁচুমাচু মুখ করে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকালেন, ‘দে—দেশলাই আছে আপনার কাছে?’
‘হ্যাঁ, এই নিন।’ টেবিলের ওপর খট করে দেশলাইয়ের বাক্সটা ছুড়ে দিলেন ক্যাপ্টেন:’আপনাকে বড্ড আপসেট দেখাচ্ছে, মিস্টার বর্মা। যান, রাত তো অনেক হল—শুয়ে পড়ুন গিয়ে। আপনার দুঃখ পাওয়ার কোনও কারণ নেই। সাহায্যের জন্যে চিৎকার ছাড়া আর কী-ই-বা আপনি করতে পারতেন? আর আপনি ডেকেছিলেন বলেই তবু খোঁজাখুঁজি করা সম্ভব হয়েছে। নয়তো ওটুকুও কি আমরা করতে পারতাম? হয়তো কিছু জানতেই পারতাম না।’ সহানুভূতিতে কোমল হল ক্যাপ্টেনের স্বর।
‘ধ—ধন্যবাদ।’ ফস করে দেশলাই জ্বেলে কাঁপা হাতে সিগারেট ধরালেন রণেন বর্মা। পোড়া কাঠিটা ফেলে দিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর দেশলাইয়ের বাক্সে বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে সমান্তরালভাবে আঁচড় কাটতে-কাটতে বললেন, ‘জানেন ক্যাপ্টেন, এই অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারগুলো আমাকে ভীষণ আপসেট করে। অ্যাক্সিডেন্টের কথা শুনলেই আমার ভীষণ ভয় করে। বিশ্বাস করুন…সত্যি বলছি…।’
যদি খুন বলেন
লোকটাকে আবার একই ভঙ্গিতে দেখা গেল।
রোজ সকালের মতো আজও বেরিয়ে এক বিশাল প্রাসাদের মতো বাড়িটা থেকে। তারপর দরজা বন্ধ করেই রোজকার অভ্যেসে ঘুরে দাঁড়াল, দরজার নবটাকে মোচড় দিয়ে ঠেলে দেখল দরজা ঠিকঠাক বন্ধ হয়েছে কি না।
লোকটার দিকে সরাসরি না তাকিয়েও নরোত্তম বসাক তার প্রতিটি নড়াচড়া অনুভব করতে পারছিলেন। টেলিভিশনের পরদায় কোনও একক অভিনয় খুঁটিয়ে লক্ষ করার মতো সজাগ ছিল ওঁর চোখ।
প্রতিদিন ভোরবেলা নরোত্তম পায়চারি করতে বেরোন। নিতান্ত দুর্যোগ, ঝড়, বৃষ্টি না হলে ওঁর এই দৈনিক অভ্যাসের কোনও হেরফের হয় না। আজও তিনি বেরিয়েছেন সকালের সজীব বাতাসে বুকভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য।
লোকটা এবার সিঁড়ির ধাপ ভেঙে ঝটপট নেমে এল। রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল একটা কালো অ্যামবাসাডার। খাকি রঙের উর্দি পরা ড্রাইভার গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে। লোকটা উঠে বসতেই সেলাম ঠুকল অনায়াস তৎপরতায়।
