এদিকে কখন যে ক্যাপ্টেন, জাহাজের ডাক্তার এবং মেট এসে উপস্থিত হয়েছেন, খেয়ালই করিনি। বোধহয় কোনও বেয়ারা গিয়ে তাঁদের খবর দিয়েছে। ডাক্তার তাঁর হাড়জিরজিরে চেহারা নিয়ে আমার প্লেটের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। কিছুক্ষণ শোঁকাশুঁকি করে, আঙুল জিভে ঠেকিয়ে, ক্যাপ্টেনের কানে-কানে কী যেন বললেন, তারপর তাঁরা তিনজনেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। ঘর ছেড়ে বেরোনোর সময় ক্যাপ্টেন আমার পাশে থমকে দাঁড়ালেন ‘মিস্টার আম্বাস্তা, প্লিজ, কাম উইথ আস। আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে।’
চটপট ক্যাপ্টেনকে অনুসরণ করলাম।
ডেকের ওপর এসে পৌঁছতেই ক্যাপ্টেন আমাকে আগের মতোই প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে তুললেন। কোনওরকমে ভাসা-ভাসা ভাবে তাঁর প্রশ্নের জবাব দিলাম। শেষে তিনি বললেন, ইঁদুর মারার জন্যে জাহাজের স্টোরে আর্সেনিক রাখা হয়। সেখান থেকেই কীভাবে যেন আমার প্লেটে আর্সেনিক পড়ে গেছে। রাঁধুনি এবং বেয়ারাদের অসাবধানতার জন্যে তিনি তাদের নিশ্চয়ই সতর্ক করে দেবেন। বিশেষ করে আমার মতো একজন সম্ভ্রান্ত যাত্রীর পক্ষে…ইত্যাদি ইত্যাদি।
কেন জানি না মনে হল, এই ঘটিত দুর্ঘটনাগুলো যেন বড় বেশি স্বাভাবিক। তা হলে কি…কিন্তু চিফ তো আমাকে বিশ্বাসী বলেই মনে করেন। একই প্রশ্নের বৃত্তে ঘুরতে লাগল আমার মন। অশান্ত মন।
তৃতীয় দুর্ঘটনা
খাওয়াদাওয়া সেরে (ক্যাপ্টেনের অনুরোধে এবং নিজের প্রকৃত মনোভাব গোপন রাখার জন্যে বেয়ারার এগিয়ে দেওয়া দ্বিতীয় খাবারের প্লেট সানন্দেই গ্রহণ করেছি)। কেবিনে ফিরে এলাম। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে আবার আগের ব্যবস্থা নিলাম। অর্থাৎ, সুটকেসটাকে অ্যাডেসিভ টেপ দিয়ে দরজার গায়ে ঠেস দিয়ে আটকে দিলাম। তারপর এগিয়ে গিয়ে বেসিনের তলায় হাত চালালাম। কারণ, দুর্ঘটনা যখন এত ঘনঘন ঘটছে, তখন সাবধান থাকা ভালো।
কিন্তু বেসিনের তলায় হাত ঠেকতেই তড়িৎপৃষ্টের মতো চমকে উঠলাম। এ কী! অ্যাডেসিভ টেপ ঠিকই লাগানো আছে, কিন্তু আমার লুগারটা বেসিনের গায়ে আর লাগানো নেই! জনৈক পরোপকারী ব্যক্তি আমাকে সামান্য কৃপা করেছেন।
কী করব ভেবে না পেয়ে শোওয়ার ব্যবস্থা করলাম। ক্রমশ আমি যেন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছি। আমার নিরাপত্তার প্রাচীর ক্রমেই যেন বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া মাটির ঢিবির মতো গলে যাচ্ছে। মনে সাহস ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ঠিক করলাম, আমার যা-ই ঘটে ঘটুক, তবু মরার আগে সুধীর নায়েক তার শেষ অ্যাসাইনমেন্ট সম্পূর্ণ করে যাবে!
ঘরের আলো নিভিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। কেবিনের পোর্টহোল দিয়ে শোঁ-শোঁ শব্দে সামুদ্রিক বাতাস বয়ে আসছে। চাঁদের আলো ঘরের মেঝেতে সৃষ্টি করেছে এক রুপোলি বৃত্ত। গায়ের ওপর কম্বল টেনে দিলাম।
সামান্য তন্দ্রা মতো এসেছে, হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার গায়ের কম্বল এবং গেঞ্জির মাঝে একটা স্তর যেন ধীরে-ধীরে নড়ে বেড়াচ্ছে। আমার কেমন যেন সুড়সুড়ি লাগছে।
খুব হালকা চালে অজানা জিনিসটা এগিয়ে আসতে লাগল আমার বুকের দিকে। কম্বলটা সেই জায়গাটায় সামান্য উঁচু হয়ে নড়তে লাগল।
ভয়ে কাঠ হয়ে পড়ে রইলাম। বুঝলাম, ভুলক্রমে কম্বলসমেত এক অজানা প্রাণীকে গায়ের ওপর চাপা দিয়ে ফেলছি। কী ওটা? সাপ?
শুয়ে-শুয়ে ঘামতে শুরু করলাম। নিজের স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা একেবারে হারিয়ে ফেললাম। নড়তে সাহস পাচ্ছি না, যদি আচমকা কিছু ঘটে যায়, তা হলে?
হঠাৎ মরিয়া হয়ে এক ঝটকায় লাফিয়ে মেঝেতে নামলাম। কম্বল-টম্বল সব ছিটকে পড়ল মেঝেতে। একছুটে সুইচবোর্ডের কাছে গিয়ে অন করে দিলাম আলোর সুইচ।
দেখি ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে আমার হাতের পাঞ্জার মাপের এক টারান্টুলা মাকড়সা। একপাটি জুতো দিয়ে পিটিয়ে ওটাকে শেষ করলাম। ওটার লোমশ কালো দেহ মাটির সঙ্গে থেঁতলে গেল।
অন্ধ ক্রোধে আমি উন্মাদ হয়ে উঠলাম। প্রথম বালতি, তারপর আর্সেনিক, রিভলভার চুরি, অবশেষে এই মাকড়সা। ওফ, দিস ইজ টু মাচ।
চটপট জামাটা গায়ে চড়িয়ে চটিটা পায়ে গলালাম। তারপর সুটকেস সরিয়ে দরজা খুলে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। ক্যাপ্টেনের ঘরে ঢুকেই রাগে ফেটে পড়লাম: ‘নাউ লুক, মিস্টার ক্যাপ্টেন, দিস ইজ টু মাচ!’
ক্যাপ্টেন বসে-বসে ঢুলছিলেন। চকিতে সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘কী—কী হয়েছে, মিস্টার আম্বাস্তা?’
ক্যাপ্টেনকে সংক্ষেপে মাকড়সার ব্যাপারটা জানালাম (রিভলভার প্রসঙ্গের উল্লেখ করব, এমন বোকা আমি নয়)। সব শুনে তিনি দুঃখিতভাবে কয়েকবার মাথা নাড়লেন: ‘ব্যাপারটা কী জানেন? আমাদের স্টোরে প্রচুর পাকা কলা রাখা আছে। আর তারই লোভে সব মাকড়সা এসে ভিড় করে। সেখান থেকেই একটা হয়তো কোনওরকমে…।’
‘ইউ মিন দিস ইজ অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট?’ টেবিলের ওপরে সশব্দে এক চাপড় কষিয়ে চিৎকার করে উঠলাম আমি।
‘সার্টেইনলি।’ বিস্ময়ে ভুরু উঁচিয়ে তাকালেন তিনি ‘হোয়াই ডোন্ট ইউ থিঙ্ক সো?’
চিৎকার করে একটা বিশ্রী জবাব দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সময়মতো নিজেকে সংযত করলাম। ভেবে দেখলাম, টেবিল চাপড়ে বা চিৎকার করে এর কোনও সমাধান হবে না। সুতরাং ঠান্ডা গলায় জবাব দিলাম, ‘ইউ আর রাইট, ক্যাপ্টেন। ব্যাপারটা দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছুই না।’
