দুটো অচেনা লোক দরজায় দাঁড়িয়ে। একজন বেশ লম্বা, আর-একজন বেঁটে। বেঁটে লোকটার মুখ লেন্স দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বড্ড বেশি নির্লিপ্ত কাঠখোদাই মুখ। বিশ্বনাথের ওকে পছন্দ হল না।
লম্বা লোকটা একপাশে মুখ ঘুরিয়ে কান চুলকোচ্ছিল। তাই ওর মুখটা দেখতে পেলেন না। কিন্তু ওর কান চুলকোনোটা অভিনয় হতে পারে বলে মনে হল।
কী ভেবে ঘরে আলো নিভিয়ে দিলেন বিশ্বনাথ। তারপর ফ্ল্যাটের দরজা খুললেন।
সঙ্গে-সঙ্গে বেঁটে লোকটা একটা লম্বাটে রঙিন কৌটো বিশ্বনাথের মুখের সামনে উঁচিয়ে ধরল। এবং বিশ্বনাথ কিছু বুঝে ওঠার আগেই অ্যাটমাইজারের বোতাম টিপল।
‘স-স-স-স’ শব্দ করে মিহি রেণুর শঙ্কু ঝাঁপিয়ে পড়ল বিশ্বনাথের মুখে।
মিষ্টি গন্ধ পেলেন। বুঝতে পারলেন, স্প্রে করা তরলটা ক্লোরোফর্ম কিংবা ওই জাতীয় কিছু হতে পারে।
তিতলি যেহেতু একা থাকে তাই বেঁটে লোকটা ভেবেছে তিতলিই দরজা খুলবে। ফলে দরজা খোলামাত্রই সময় নষ্ট না করে অ্যাটমাইজারের বোতাম টিপেছে। তিতলি অজ্ঞান হয়ে গেলেই ওরা দুজনে ওকে তুলে নিয়ে যাবে।
বিশ্বনাথ দরজা খোলায় গল্পটা ভেস্তে গেল।
যে-পরিমাণ তরল বেঁটে লোকটা স্প্রে করেছ তাতে কমপক্ষে দুজন মানুষের অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কথা।
কিন্তু সি. ভি. বিশ্বনাথ অজ্ঞান হলেন না। চোখের নিমেষে ডানহাত বাড়িয়ে বেঁটে লোকটার টুঁটি খামচে ধরলেন।
লোকটার হাত থেকে রঙিন কৌটোটা খসে পড়ে গেল। ও চোখ বড় করে হাঁসহাঁস করতে লাগল। দু-হাতে বিশ্বনাথের কবজি চেপে ধরল। প্রাণপণ চেষ্টায় টুঁটির বাঁধন ছাড়াতে চাইল।
কিন্তু কোনও কাজ হল না।
বিশ্বনাথ দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘আমি একটা কামড় দিলে তুমি খতম হয়ে যাবে।’
এ-কথায় ম্যাজিকের মতো কাজ হল।
পিছনের লম্বা লোকটা সবে কী করবে ভাবতে শুরু করেছিল। ও সঙ্গীকে ফেলে রেখে সটান সিঁড়ির দিকে ছুট লাগাল। বিশ্বনাথের হঠাৎই মনে হল, লম্বা লোকটা বোধহয় আগের দিন সংঘর্ষের সময় হাজির ছিল। বিশ্বনাথের কামড়ে কী হতে পারে ও হাড়ে-হাড়ে জানে।
বেঁটে লোকটার অবস্থা তখন মরা নেংটি ইঁদুরের মতো। বিশ্বনাথ ওকে পিছনে ঠেলে দিলেন। চাপা গলায় বললেন, ‘তিতলির গায়ে হাত দিতে গেলে আমাকে ডিঙিয়ে যেতে হবে…।’
বিশ্বনাথের ধাক্কায় লোকটা পড়ে গিয়েছিল। গলায় হাতে বোলাতে-বোলাতে কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল।
বিশ্বনাথ বললেন, ‘তোমাদের সঙ্গে যেন আমার আর দেখা না হয়।’
লোকটা কোনও জবাব না দিয়ে ছুটে পালাল। কিন্তু ওর ছুটটা এক-পা খোঁড়া কুকুরের মতো দেখাল।
বিশ্বনাথ হাঁপাচ্ছিলেন। একটু-আধটু ভয়ও করছিল। এরা যদি সেই সুপারি কিলার হয় তা হলে সহজে হাল ছাড়বে না—ওরা আবার আসবে, এবং তৈরি হয়ে আসবে।
ঘুমপাড়ানি ওষুধের কৌটোটা মেঝেতে পড়ে ছিল। বিশ্বনাথ সেটা কুড়িয়ে নিলেন। তারপর ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে দিলেন।
ড্রইংরুমে সোফায় বসে কৌটোটা টেবিলে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। টেলিফোনের পাশ থেকে কাগজ আর পেন নিয়ে তিতলিকে দু-লাইন নোট লিখলেন:
বাইশ,
একটা বিপদ এসেছিল। রুখেছি। চলে যাচ্ছি। কাল কথা হবে।
বাষট্টি
কাগজটা নিয়ে বেডরুমে গেলেন। ঘুমন্ত তিতলিকে অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন। তারপর কাগজের টুকরোটা রেখে দিলেন ওর হাতের কাছে।
তিতলির ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর এক অদ্ভুত ক্লান্তি টের পেলেন। ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল হঠাৎই। তখনই রেণুকণার গলা পেলেন, ‘সারা সন্ধে যা ধকল গেল! তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ো—।’
বিশ্বনাথ একটু অন্যমনস্ক ছিলেন বোধহয়। তাই রেণুকণার গলা পেয়ে চমকে চারপাশে তাকালেন। তারপরই বুঝতে পারলেন, রেণুকণার কথাগুলো এসেছে ওঁর বুকের ভেতর থেকে।
তিতলিকে গাঢ় আবেগে জড়িয়ে ধরেছেন। ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে আছেন গলা। পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছেন—সেইসঙ্গে তিতলির গন্ধও। বুঝতে পারছিলেন, এই বাইট অন্তত—কিছুতেই শেষ হবে না।
জীবনের টান ভোরবেলায় বিশ্বনাথকে এই স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। যখন জেগে উঠলেন তখনও স্বপ্নটা আদর মাখা চাদরের মতো বিশ্বনাথকে জড়িয়ে ছিল।
বেলা হতেই রোজকার মতো রাস্তায় বেরোলেন বিশ্বনাথ। এটিএম থেকে পেনশনের টাকা তুলতে হবে। তারপর ‘শটস অ্যান্ড কিকস’-এর স্পেশাল সেল-এ একবার ফোন করতে হবে। নিজের জন্য টুকিটাকি কয়েকটা জিনিস কিনতে হবে আর ওষুধ কিনতে হবে। তারপর সন্দীপনের সঙ্গে একবার দেখা করবেন। সি. ভি. জীবনের সুঃখ-দুঃখ নিয়ে কথা বলবেন।
রোদে হাসিখুশি রাস্তায় হাঁটতে-হাঁটতে মনে হল তিতলিকে একটা এসএমএস করা যাক। এখন সওয়া দশটা বাজে—নিশ্চয়ই ঘুম ভেঙেছে ওর।
পকেট থেকে মোবাইল বের করে এসএমএস করলেন বিশ্বনাথ:
বাইশ জেগে ওঠো। তবে না ‘গুড মর্নিং’ বলব।
তাকিয়ে দ্যাখো, একটা দিন আমাদের জীবন থেকে
কমে যাচ্ছে।
বিশ্বনাথ যখন ওষুধের দোকানে তখন এসএমএস-এর উত্তর এল:
বাষট্টি, জেগেছি। গুড মর্নিং বলবেন না?
বিশ্বনাথ ভাবলেন, ওষুধের দোকানে কাজ মিটিয়ে তারপর ওকে ফোন করবেন।
প্রায় দশমিনিট পর দোকান থেকে বেরোতে না বেরোতেই আবার তিতলির এসএমএস:
কী ব্যাপার? হারিয়ে গেলেন নাকি?
বিশ্বনাথ হেসে ফেললেন আপনমনে। কী অল্পেতে ঠোঁট ফোলায় মেয়েটা! আসলে ওর কোনও দোষ নেই। সারা জীবনে কারও কাছ থেকে ও কিছু পায়নি। যা ওর পাওনা ছিল তাও না। না পাওয়ার যন্ত্রণা ওকে অভিমানী করে তুলেছে।
