এই তিন নম্বর উপায়টা সর্বশ্রেষ্ঠ মনে হল একটি মাত্র কারণে। তা হল, রণেন বর্মার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা কারও চোখে পড়বে না। আর সেটা যত কম চোখে পড়ে ততই ভালো।
এসব কথা ভাবছি, হঠাৎ পায়ে কীসের ছোঁওয়া পেয়ে আঁতকে লাফিয়ে উঠলাম।
‘কী হল—কী হল?’ বেশি কৌতূহলী হয়ে পড়লেন মোটকা মহিলাটি।
কী যে হল, সেটা দেখতে টেবলক্লথটা সরিয়ে টেবিলের নীচে উঁকি মারলাম। ডাইনিং হলের অন্যান্য যাত্রী তখন মাঝপথে খাওয়া থামিয়ে উৎসুক হয়ে আমার ভয়ার্ত মুখের দিকে চেয়ে আছেন। রণেন বর্মাও তার ব্যতিক্রম নন।
টেবিলের নীচ থেকে একটা মোটাসোটা কালো বেড়াল বেরিয়ে এল। ডাকতে লাগল ‘ম্যাঁও-ম্যাঁও’ করে। তাই দেখে ঘরের সবাই তো হো-হো করে গলা ফাটিয়ে হেসে উঠল।
আমতা-আমতা করে কাষ্ঠহাসি হাসতে চেষ্টা করছি, একজন বেয়ারা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। কানে-কানে বলল, ‘স্যার, ক্যাপ্টেনসাহেব আপনাকে একবার ডাকছেন। যদি একমিনিট সময় করে একটু আসেন—।’
খাওয়ার টেবিল ছেড়ে (খাওয়া তখনও শুরুই করতে পারিনি, এমনই দুর্ভাগ্য!) বেয়ারাটির পেছন-পেছন ডাইনিং হল ছেড়ে বেরোলাম। আন্দাজ করলাম, ক্যাপ্টেনসাহেব হয়তো সেই বালতিজনিত দুর্ঘটনার ব্যাপারটা একটু বিশদভাবে জানতে চান। দেখা যাক!
ক্যাপ্টেনের ঘরে পৌঁছে দেখি, তিনি পেছনে হাত রেখে গম্ভীরভাবে পায়চারি করছেন। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই থমকে দাঁড়ালেন। চোখে সপ্রশ্ন দৃষ্টি নিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘মিস্টার আম্বাস্তা?
বেয়ারাটি আমাকে ছেড়ে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে চলে গেল। ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে ক্যাপ্টেনের প্রশ্নের জবাব দিলাম, ‘ইয়েস, আই অ্যাম নোটন আম্বাস্তা। হোয়াটস দ্য ম্যাটার?’
‘আসুন—বসুন।’ ইঙ্গিতে একটা চেয়ার নির্দেশ করলেন ক্যাপ্টেন। তারপর নিজেও একটা চেয়ারে বসলেন।
‘মিস্টার আম্বাস্তা, আপনার সেই অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারটা আমি একটু ডিটেইলসে শুনতে চাই।’
‘ওহ, ও কিছু নয়।’ ক্যাপ্টেনকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কারণ, ওই দুর্ঘটনাটা নিয়ে যত কম আলোচনা হয়, ততই ভালো।
‘মিস্টার আম্বাস্তা, আপনি ভুলে যাচ্ছেন, ওই অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে আমারই জাহাজে। সুতরাং ব্যাপারটা আমার জানা দরকার।’ ক্যাপ্টেনকে বেশ উত্তেজিত মনে হল।
অতএব আর দ্বিরুক্তি না করে ঘটনাটা তাঁকে আনুপূর্বিক জানালাম।
সব শোনার পর তিনি কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে বসে রইলেন। অবশেষে একসময় মুখ খুললেন, ‘আপনি কি বলতে চাইছেন যে, এই জাহাজে আপনার কোনও শত্রু আছে? এমন কেউ, যে আপনাকে খুন করতে চায়?’
হঠাৎ এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটা ভাবতে শুরু করলাম। শত্রু? কিন্তু আমি যে এই জাহাজে করে যাব, সে-কথা তো আমার দল ছাড়া…আচমকা এক কাচের দেওয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল আমার হৃৎপিণ্ড। তা হলে কি ‘অ্যাসাসিন’ চাইছে আমাকে সরিয়ে দিতে? কিন্তু ওদের সঙ্গে তো কোনও বিশ্বাসঘাতকতা আমি করিনি!
মনকে বারংবার স্তোক দিয়ে ক্যাপ্টেনকে সবিস্ময়ে এবং সবিনয়ে জানালাম, ‘এ আপনি কী বলছেন, মিস্টার ক্যাপ্টেন? না, না,—কে আমাকে খুন করতে চাইবে? আর কেনই-বা চাইবে? ওটা নেহাতই অ্যাক্সিডেন্ট, ক্যাপ্টেন। হয়তো কোনও বালতি ওপরে রাখা ছিল, জাহাজের দোলানিতে হঠাৎ নীচে পড়ে গেছে।’
কিন্তু এত সব বললে কী হবে, ক্যাপ্টেন ছাড়লেন না। আমাকে নিয়ে অকুস্থল পরিদর্শন করলেন। নানান উপদেশ দিলেন। এমনি করে প্রায় আধঘণ্টা পর তাঁর হাত থেকে মুক্তি পেলাম। খিদেয় তখন পেট চোঁ-চোঁ করছে। তাই আর দেরি না করে খাবার ঘরের দিকে এগোলাম।
খাবার ঘরে পা দিয়েই যে-বিচিত্র দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম, তাতে ঘরটাকে খাবার ঘর না বলে পাগলাগারদ বলাই বোধহয় ঠিক হবে। কারণ, ঘরের প্রায় প্রতিটি যাত্রী এখন সার বেঁধে দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখগুলো বোধ হয় ঠিকরে গিয়ে পড়বে টেবিলের ওপরে। যেখানে সাজানো খাবারের প্লেট এবং সেই কালো বেড়ালটা। হ্যাঁ, সেই কালো বেড়ালটা টান-টান হয়ে টেবিলের ওপরে পড়ে আছে। আর, আমার প্লেটের খাবার কিছুটা টেবিলে ছড়ানো।
‘হোয়াটস দ্য ম্যাটার?’ দরজার কাছে কাঠপুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বেয়ারাকে প্রশ্ন করলাম, ‘ব্যাপার কী?’
এমন সময় হেলতে-দুলতে এগিয়ে এলেন সেই মোটকা মহিলাটি ‘মিস্টার আম্বাস্তা, মিস্টার আম্বাস্তা…ওঃ, হরিবল!’
‘কী হয়েছে? মনে হচ্ছে, আপনারা যেন ভয় পেয়েছেন?’
মিহি গলায় আমার ডানপাশ থেকে উত্তর ভেসে এল, ‘কালো বেড়ালটা মরে গেছে। আপনার প্লেটে মুখ দিয়েই মরে গেছে!’
ঘাড় ফেরাতেই চোখ পড়ল রণেন বর্মার কাঁচুমাচু মুখের ওপর। তিনি ঘনঘন ঢোক গিলছেন আর চোখ পিটপিট করছেন।
‘আমার আর কী দোষ, বলুন? বেড়ালটা খাওয়ার জন্যে চেয়ারের ওপর উঠল। আমি ভাবলাম, একটু দিই। দিতে যাচ্ছি, অমনি বেড়ালটা প্লেটের ওপর হুমড়ি খেয়ে লাফিয়ে পড়ল। আর খাবার মুখে দিয়েই ছটফট করে মরে গেল।’
ভদ্রমহিলার কথা পুরোপুরি আমার কানে গেল না। চোখে যেন ঝাপসা দেখতে লাগলাম। হাঁটুজোড়া বিদ্রোহ করে অবশ হয়ে এল। মাথার ভেতর আছড়ে পড়ছে সন্দেহের বিক্ষুব্ধ তরঙ্গ।
দুর্ঘটনা?
হয়তো তাই। ক্যাপ্টেনকে ধন্যবাদ দিতে হবে যে, তিনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। নয়তো ওই বেড়ালটার জায়গায় পড়ে থাকত এই সুধীর নায়েক।
