আর সখারাম বক্সী একেবারে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল এই বসুন্ধরা থেকে। অপরাধের মধ্যে ওর একটা চোখ—ডানচোখ ছিল পাথরের। তাই ও সবসময় কালো চশমা পরে থাকত আর সেটাকে সর্বক্ষণ হাত দিয়ে অ্যাডজাস্ট করত। তারপর কীভাবে বাকি ঘটনা ঘটেছিল, তা বলতে পারি না। তবে সখারাম এক বিয়োগান্ত নাটকের প্রধান বিয়োগান্ত চরিত্রে পরিণত হয়েছিল।
এতসব ভাবনার পর একটু চিন্তিত হলাম। তা হলে কি ওই বালতির পতনজনিত দুর্ঘটনাটা সুপরিকল্পিত? কেউ কি জেনে ফেলেছে আমার আসল পরিচয়? ভাবতে-ভাবতে নিজের অজান্তেই বাঁ-হাত এগিয়ে গেল কানের দিকে।
সুধীর! মাঝপথেই সতর্ক হয়ে হাতকে ফিরিয়ে আনলাম। আবার সেই ভুল! জাহাজে ওঠার পর থেকে এভাবে ক’বার কান চুলকেছি কে জানে। তবে আমার এই মুদ্রাদোষ কুণাল, সখারাম বা সোহনলালের মতো অতটা বিপজ্জনক নয়। কিন্তু তবুও সাবধান হওয়া প্রয়োজন।
এইরকম ভয়ংকর মুদ্রাদোষসম্পন্ন আর-একজন গুণী ব্যক্তি আছেন। এ লাইনে তাঁকে সবাই গুরুদেব বললেও সাক্ষাৎ পরিচয় প্রায় কারও নেই। তিনি কখন, কোথায়, কী বেশে থাকেন তা না জানলেও তাঁর মুদ্রাদোষ তাঁকে চোখে আঙুল দিয়ে চিনিয়ে দেয়। তাঁর এক অদ্ভুত স্বভাব আছে, সেটা হল—দেশলাইয়ের বাক্সে বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে সমান্তরালভাবে তিনি আঁচড় কাটেন। এই মিস্টার এক্সই (এক্সই বলব, কারণ তাঁর সম্বন্ধে কোনও দলের কাছেই কোনও গোপন ফাইল নেই) নাকি কুণাল, সোহনলাল ও সখারামের বিয়োগান্ত নাটকের পরিচালক। এবং ‘অপারেশান’ নামক গুপ্তসমিতির প্রযোজক। সেই সময়ে (এবং সর্বদাই) ওরা আমাদের এক শত্রুরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করছিল।
যা হোক, এই এক্স-এর পেছনে যদি দল আমাকে পাঠাত, তবে আর দেখতে হত না। ছ’-মাসই কাজ সেরে ফেলতাম। দেখিয়ে দিতাম, ‘সুধীর নায়েক ইজ সুধীর নায়েক!’
আবার আবিষ্কার করলাম, আমার বাঁ-হাত আমার কান চুলকোচ্ছে। শালা! রাগে, বিরক্তিতে নিজের কান নিজেই বেশ করে মুলে দিলাম। আবার সেই মুদ্রাদোষ! তবে আর ছদ্মবেশের দরকার কী? বুকে একটা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হয়, দেখুন আপনারা, এই অধমই সুধীর নায়েক। ‘অ্যাসাসিন’ গুপ্তদলের এক্সিকিউশনার! না, এই নাছোড়বান্দা মুদ্রাদোষ আমাকে ছাড়বে না! শত্রুপক্ষের কোনও লোক এই মুদ্রাদোষ লক্ষ করেই হয়তো চিনে ফেলবে নোটন আম্বাস্তার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সুধীর নায়েককে।
হঠাৎ ঘণ্টি বেজে উঠতেই হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত সাড়ে ন’টা। সম্ভবত ডিনারের জন্যেই এই ঘণ্টির সংকেত। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে কেবিনের আলো নিভিয়ে পা বাড়ালাম খাবার ঘরের দিকে। সেখানে গিয়েই আবার দেখব রণেন বর্মাকে। দেখি, পারলে দু-চারটে কথা বলে একটু বাজিয়ে নেব। মানে, মারার আগে ভদ্রলোকের সঙ্গে আমি একটু আলাপ করতে চাই।
দ্বিতীয় দুর্ঘটনা
উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত ডাইনিং রুমে ঢুকতেই প্রত্যেকটি স্ত্রী-পুরুষ মুখ ফিরিয়ে তাকাল আমার দিকে (সুধীর নায়েক যে হ্যান্ডসাম স্মার্ট যুবক, সে-কথা আপনারা দয়া করে ভুলে যাবেন না, প্লিজ!)। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলাম। আমার বাঁ-দিকে এক মোটকা ভদ্রমহিলা আর ডানদিকে একজন অল্পবয়েসি মেয়ে।
মেয়েটির দিকে চেয়ে একটু মুচকি হাসলাম, তারপর তাকালাম খাবার প্লেটের দিকে। খাওয়াটা যদিও আমার মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, তবু ওটা অভিনয়ের অংশ বলে প্লেটের দিকে ঝুঁকে পড়লাম।
হঠাৎ চোখ পড়ল জলের গ্লাসে—সেখানে টলটলে স্বচ্ছ জলের ওপর ভাসছে একটা মুখের প্রতিবিম্ব। চমকে চোখ তুলে তাকালাম। বোকা-বোকা চাউনি নিয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে আছেন রণেন বর্মা।
চোখাচোখি হতেই বর্মাসাহেব কান এঁটো করে হাসলেন: ‘ভালো আছেন?’
প্রত্যুত্তরে হেসে জবাব দিলাম, ‘হ্যাঁ, ভালোই আছি (অবশ্য বালতির ব্যাপারটা বাদ দিলে)। তা আপনি কদ্দূর যাচ্ছেন? (এ ছাড়া আর কীই-বা ছাই জিগ্যেস করব?)
‘কোচিন। আপনি?’ প্রশ্নটা করেই রণেন বর্মা অভদ্রের মতো খেতে শুরু করলেন।
‘আমিও।’
এই বেঁটেখাটো লোকটাকে খুন করতে হবে ভেবে দুঃখ হল। কিন্তু উপায় কী? চিফ নিজের মুখেই বলেছেন, এই রণেন বর্মা লোকটি নাকি আমাদের ‘অ্যাসাসিন’ দলের পথে এক বিপজ্জনক কাঁটা। সুতরাং এই কাঁটা তোলার ভার চিফ আমার হাতেই তুলে দিয়েছেন। এবং একটি বিশেষ স্বাভাবিক দুর্ঘটনার সাহায্যে এই রণেন বর্মাকে মাইনাস করতে হবে।
আমি সাধারণত অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সহজ দুর্ঘটনার সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করি। যেমন ট্রেনে হলে, এই রণেন বর্মা ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে (অবশ্য তাঁকে একটা সামান্য ধাক্কা দিয়ে সাহায্য করতে হত!) মারা যেতেন। এবং এক্ষেত্রে যেহেতু তিনি জাহাজে আছেন, সুতরাং তাঁকে ডেকের রেলিং টপকে সমুদ্রের জলে পড়তেই হবে।
এবার এই উপরোক্ত জলে পড়ার দুর্ঘটনা ঘটানোর তিনটে উপায় আমার হাতে আছে। এক: ভদ্রলোক যখন একা ডেকের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকবেন, তখন আচমকা এক কারাটের প্যাঁচে তাঁকে রেলিং টপকাতে সাহায্য করা।
দুই: তাঁর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে, কথা বলতে-বলতে হঠাৎ ধাক্কা দেওয়া।
আর সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তিন নম্বর উপায় হল, মাঝরাতে রণেন বর্মার ঘরে ঢুকে তাঁকে একটা মরফিয়া ইনজেকশান দেওয়া এবং অজ্ঞান অবস্থায় তাঁকে টেনে এনে জলে ফেলে দেওয়া।
